বোরো ধানের তুলনায় আমন ধানে খরচ কম। সেই আমন ধান চাষ করেও কৃষকের লাভ হচ্ছে না। প্রতি মণে লোকসান গুনতে হচ্ছে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। দেশের অধিকাংশ কৃষকের কাছে নগদ অর্থ থাকে না। ফসল উৎপাদনের সময় তাই তাকে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বাকিতে সার ও কীটনাশক সংগ্রহ করতে হয়। কোনো কোনো কৃষককে সেচের জন্য ডিজেল এবং বীজও কিনতে হয় বাকিতে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক ব্যাংক থেকে কৃষিঋণ গ্রহণের সুযোগ পান না। ঋণের জন্য তাদের মহাজন, আত্মীয়স্বজন ও এনজিওদের দ্বারস্থ হতে হয়। গুনতে হয় চড়া সুদ। আমন মৌসুমে কৃষক বাকিতে সার, বীজ ও কীটনাশকসহ প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ সংগ্রহ করেছিলেন। ধান কাটা শেষ হয়ে আসায় শুরু হয়েছে হালখাতার মৌসুম। কৃষকের বাড়িতে আসতে শুরু করেছে হালখাতার কার্ড। তাই বাধ্য হয়ে তাকে লোকসানে বিক্রি করতে হচ্ছে ধান। গত বোরো মৌসুমেও লোকসান দিয়ে ধান বিক্রি করতে হয়েছিল কৃষককে। লোকসান দিতে দিতে কৃষকের মেরুদন্ড ভেঙে গেছে। থেমে গেছে গ্রামীণ অর্থনীতির ঘূর্ণায়মান চাকা।
কৃষির এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের গতানুগতিক চাষাবাদ পদ্ধতির পরিবর্তন ঘটাতে হবে। আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ ও সময় কমিয়ে কৃষিকে লাভজনক ও আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। কৃষি উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির মূল কারণ হলো কৃষি শ্রমিকের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি। ধান রোপণ ও মাড়াইয়ের সময় কৃষিশ্রমিকের মজুরি অত্যধিক বেড়ে যায়। গত বোরো মৌসুমে প্রতিদিন একজন শ্রমিককে ৮০০ টাকা মজুরি ও তিন বেলা খাবার দিতে হয়। তারপরও সময়মতো পাওয়া যায়নি কৃষিশ্রমিক। শিক্ষার হার বৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের কারণে মানুষ এখন আর
কৃষিশ্রমিকের মতো পরিশ্রমের কাজ করতে চায় না। শহরে ও গ্রামে ব্যাটারিচালিত রিকশা, ভ্যান ও অটোরিকশা চালিয়ে, রাজমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রির কাজ করে কৃষিকাজের চেয়ে বেশি অর্থ উপার্জন করা যায়। এছাড়া গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সংখ্যা। পুকুরে মাছ চাষ, পোলট্রি খামার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ। কৃষিতে প্রত্যাশিত নতুনের আগমন না ঘটায় এ খাতটিতে বাড়ছে বয়স্ক লোকের সংখ্যা। শুধু ধান চাষ কেন, আখ রোপণ, আখ কাটা, পরিষ্কার, আঁটি বাঁধা, আখ পরিবহন প্রভৃতি কাজে কৃষিশ্রমিক পাওয়া যায় না। পেলেও মজুরি দিতে হয় অনেক বেশি। এ কারণে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে আখের আবাদ উঠে যাচ্ছে।
কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি, ফসল সংগ্রহোত্তর অপচয় হ্রাস, শস্যের নিবিড়তা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ নানাভাবে উপকৃত হতে পারেন কৃষক। তবে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা, সাধারণ কৃষকের মধ্যে যন্ত্র ব্যবহারের প্রবণতা বৃদ্ধি না পাওয়া এবং ফসল চাষে যন্ত্রের ব্যবহারের সুবিধা সম্পর্কে প্রচার কম থাকাসহ বিভিন্ন কারণে আধুনিক যন্ত্রনির্ভর কৃষিব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি বাংলাদেশে। ‘খামার যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি ( দ্বিতীয় পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্পের নিবিড় পরিবীক্ষণে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
পরিকল্পনা বিভাগের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) এবং কৃষি অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ড. শামসুল আলম বলেন, মৌসুমের সময় কৃষিশ্রমিক পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে। সে ক্ষেত্রে রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ও হারভেস্টারসহ সব ধরনের যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানোর বিকল্প নেই। এর মাধ্যমে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমিয়ে টেকসই কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। কৃষি মন্ত্রণালয় ২০১২ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য এ প্রকল্পটি গ্রহণ করে। এটি বাস্তবায়নে ব্যয় হয় ৩৩৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে তা যাচাই করতেই করা হয় নিবিড় পরিবীক্ষণ। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্পটি গ্রহণের আগে, ২০১২ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে খামার যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে উৎপাদন বেড়েছে এবং খরচ কমেছে বলে ২ হাজার কৃষকের মধ্যে ৯৭ দশমিক ৪০ শতাংশই অভিমত প্রকাশ করেন। ৯৮ দশমিক ৩০ শতাংশ কৃষক বলেন, যন্ত্রপাতি ব্যবহারে শস্য সংগ্রহোত্তর অপচয় সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন ২০ শতাংশ কমেছে। অধিকাংশ কৃষকই জানান, আগে ফসলের গড় নিবিড়তা ছিল ১৯০ দশমিক ১৪, কিন্তু যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে ২০১৭-১৮ সালে নিবিড়তা বেড়ে দাঁড়ায় ২০৪ দশমিক ৬৮। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৯০ দশমিক ৬০ শতাংশ কৃষক বলেন, প্রকল্পের কার্যক্রমের ফলে এলাকায় কর্মসংস্থান বেড়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্ম পাওয়ার অ্যান্ড মেশিনারি বিভাগের এক গবেষণায় বলা হয়, জমি চাষে এখন প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি যন্ত্রের ব্যবহার হলেও ফসল রোপণ ও কর্তন কাজে সেভাবে কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে না। মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ জমিতে ফসল রোপণ কাজে ব্যবহার হচ্ছে কৃষিযন্ত্রের। অন্যদিকে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ জমিতে ফসল কর্তন কাজে ব্যবহার হচ্ছে যন্ত্রের। ফসল উৎপাদনের খরচ কমাতে এ দুটি খাতেই বেশি করে যন্ত্রের ব্যবহার হওয়া উচিত। যন্ত্রের ব্যবহার না থাকায় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন কৃষক। কৃষকের উৎপাদন খরচ কমাতে রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ও হারভেস্টার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। চার সারিবিশিষ্ট রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের এক মেশিনেই ঘণ্টায় ২ দশমিক ৫ বিঘা জমিতে চারা রোপণ করা যায়। অন্যদিকে জিপিএস প্রযুক্তি সুবিধাসম্পন্ন হারভেস্টার দিয়ে একই সঙ্গে প্রতি ঘণ্টায় ১ দশমিক ৫ থেকে ২ একর জমির ধান কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই ও বস্তাবন্দি করা যায়। হারভেস্টারের মাধ্যমে খরচের পরিমাণ ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এবং সময় ৭০ থেকে ৮২ শতাংশ বাঁচানো সম্ভব।
আমাদের দেশে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের প্রধান অন্তরায় প্রান্তিক কৃষকের কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের অনুপযোগী ছোট কৃষিজমি, যেখানে মানসম্মত কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যায় না। দেশের প্রান্তিক কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবেও অসচ্ছল, তাদের উচ্চমূল্যে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ের সামর্থ্য নেই। এছাড়া ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু বিশ্বজুড়ে যে আধুনিক কৃষিব্যবস্থার প্রসার ঘটেছে তার মূলে রয়েছে যান্ত্রিকীকরণ। চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কৃষি কাজে রোবট, ড্রোন, সেন্সর ও কৃত্রিম বুদ্ধিচালিত যন্ত্রের ব্যবহার ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। তাই কৃষিতে ব্যয় কমিয়ে উৎপাদন বাড়াতে হলে যান্ত্রিকীকরণের কোনো বিকল্প নেই। কম্বাইন হারভেস্টার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ খরচ কমায়, ৭০ থেকে ৮২ শতাংশ সময় বাঁচায় এবং ৭৫ শতাংশ কম শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। এ মেশিন ব্যবহার করে ঘণ্টায় এক একর জমির ধান বা গম কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই ও বস্তাবন্দি করা যায়। প্রচলিত নিয়মে এক একর জমির ফসল কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই ও বস্তাবন্দি করতে খরচ পড়ে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। সেখানে কম্বাইন হারভেস্টারে মাত্র ১০ থেকে ১২ লিটার ডিজেলে এই কাজ করা সম্ভব, যার দাম মাত্র ৬৫০ থেকে ৭৮০ টাকা। সরকার যে প্রণোদনা দিচ্ছে সেটা ট্রাক্টরের ক্ষেত্রে দেওয়া হচ্ছে না। ধান কাটা ও ধান মাড়াই যন্ত্রে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু চাষের মূল যন্ত্র ট্রাক্টরের অভাবে কৃষক যদি চাষই করতে না পারেন তাহলে কাটার প্রশ্ন আসবে কোথা থেকে? তাই ট্রাক্টরের প্রণোদনা দেওয়া উচিত।
২০০০ সালে কৃষিতে মানুষের অংশগ্রহণ ছিল ৬০ শতাংশ। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪০ শতাংশে। তার অর্থ কৃষি থেকে মানুষ ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে। এতে কৃষিশ্রমিকের সংকট তৈরি হচ্ছে। ৪০ শতাংশ শ্রমিক কমে যাওয়ার ফলে ধান কাটা বা ফসল তোলা খরচ বেড়ে গেছে। ফলে কথা উঠেছে কৃষির যান্ত্রিকীকরণের। কৃষির বর্তমান সংকট সমাধানে যান্ত্রিকীকরণের কোনো বিকল্প নেই। এর ফলে কৃষি উৎপাদনের খরচ কমে যাবে। উৎপাদনশীলতা বেড়ে যাবে এবং কৃষি হবে প্রতিযোগিতাপূর্ণ।
লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি),
নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস লিমিটেড, নাটোর
netairoy18@yahoo.com