বন্ধুরাষ্ট্রের সীমান্ত কেন ঝুঁকিপূর্ণ

কিছু মৃত্যু প্রশ্ন হয়ে ঝুলে থাকে চোখের সামনে। কিছু প্রশ্ন প্রতীক হয়ে ওঠে আরও অনেক প্রশ্নের। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কাঁটাতারে ঝুলে থাকা কিশোরী ফেলানীর গুলিবিদ্ধ লাশ এমনই এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে আছে আজও। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে ফেলানীর মৃত্যুর ৯ বছর পেরুলো এই সপ্তাহেই। ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার চৌধুরীহাট সীমান্ত চৌকির কাছে পরিবারের সঙ্গে ভারত থেকে আসার সময় কাঁটাতার পেরুতে গিয়ে গুলিতে নিহত হয় ফেলানী। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে মৃত্যুর দীর্ঘ মিছিলে সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে আলোচিত নাম ফেলানী খাতুন। বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের একাধিক খ্যাতনামা শিল্পী ফেলানীকে নিয়ে গান গেয়েছেন, তাকে নিয়ে দেশে-বিদেশে নির্মিত হয়েছে কয়েকটি প্রামাণ্যচিত্রও। ব্যাপক প্রতিবাদ-বিক্ষোভ, দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক কিংবা আদালতের দ্বারস্থ হয়েও বিচার পাওয়া যায়নি। ফেলানীসহ আলোচিত সীমান্ত হত্যার একটিরও বিচার হয়নি। এমনকি ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ফেলানী খাতুনের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিলেও ভারতীয় কর্র্তৃপক্ষ সেটাও মানেনি।

ফেলানী হয়তো ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে নিরস্ত্র বাংলাদেশিদের হাজারো মৃত্যুর প্রতীক। কিন্তু ভারত সীমান্তে এমন হত্যাকাণ্ড যে বাংলাদেশিদের জন্য কত ভয়াবহ অভিশাপ, তা বুঝতে হলে সীমান্তবর্তী কৃষক পরিবারগুলোর দিকে তাকাতে হবে। সেখানে এমন অনেক পরিবারই আছে যে পরিবারের একাধিক সদস্য সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। গত বুধবার চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের ওয়াহেদপুর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে দুই বাংলাদেশি নিহত হয়। এদের একজনের নাম সেলিম (৩০)। হতভাগ্য সেলিম সীমান্ত হত্যাকাণ্ডে একই পরিবারে দুই প্রজন্মে দুজনের নিহত হওয়ার প্রতীক হলেন। ১০ বছর আগে একই সীমান্তে একইভাবে বিএসএফের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন সেলিমের বাবা তোবজুল। একই পরিবারে পিতার পর এবার পুত্রের প্রাণ গেল সীমান্ত হত্যায়। নিহতের তালিকায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে নতুন নতুন নাম যুক্ত হতে থাকলেও ভারতীয় সীমান্তে এমন হত্যাকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে না কেন? বৃহৎ প্রতিবেশী ভারত বাংলাদেশের বন্ধুত্বের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। কিন্তু বন্ধুপ্রতিম দুই রাষ্ট্রের সীমান্ত কেন দুনিয়ার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্তগুলোর একটি?

এক দশকেরও বেশি আগে, ২০০৯ সালের ২৩ জুলাই ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘চ্যানেল ফোর’ এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তকে দুনিয়ার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত হিসেবে আখ্যায়িত করে। ‘ইন্ডিয়া’স গ্রেট ওয়াল দ্য ওয়ার্ল্ডস ডেডলিয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার’ শিরোনামের ওই টেলিভিশন প্রতিবেদনটিতে বলা হয়Ñ সীমান্তে হতাহত ব্যক্তিদের সবাই-ই গরু পাচারকারী অথবা চোরাকারবারি নন। এসব অবৈধ কারবারে কেউ কেউ নিশ্চয়ই জড়িত, কিন্তু তার চেয়েও বেশি দুর্ভোগ এবং বিপদের শিকার হচ্ছেন সীমান্ত এলাকার সাধারণ কৃষক এবং তাদের পরিবারগুলো। পরের বছর ২০১০ সালের ৯ ডিসেম্বরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এ ধরনের নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ‘ট্রিগার হ্যাপি’ শিরোনামে একটি বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। তাদের দাবি, এই শতকের প্রথম ১০ বছরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের নির্বিচার গুলিবর্ষণে নিহত হয়েছেন এক হাজারের মতো বাংলাদেশি। অর্থাৎ গড়ে প্রতিবছর ১০০ জন কিংবা প্রতি সাড়ে তিন দিনে একজন করে বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন এভাবে। অন্যদিকে জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বন্ধুপ্রতিম বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের সঙ্গে চিরবৈরী পাকিস্তান-ভারত সীমান্তের একটা তুলনা হাজির করে। এতে দেখা যায় সাম্প্রতিক তিন বছরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ১০২ বাংলাদেশি নিহত হলেও, একই সময়ে পাকিস্তান-ভারত সীমান্তে ৪৬ পাকিস্তানি নিহত হয় যাদের বেশিরভাগই সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য। কিন্তু নিহত বাংলাদেশিরা সবাই ছিলেন নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ।

বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গত বছরের জুলাইয়ে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, ২০০৯ সাল থেকে গত ১০ বছরে বিএসএফের হাতে ২৯৪ জন বাংলাদেশি নিহত হন। কিন্তু দেশ-বিদেশের অনেক মানবাধিকার সংগঠনই এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে একমত নয়, তাদের দাবি প্রকৃত অর্থে নিহতের সংখ্যা আরও বেশি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি ২০১৮ সালে সীমান্ত হত্যায় নিহতের সংখ্যা ৩ জনে নেমে এসেছিল। কিন্তু ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ বলছে এই সংখ্যা ১৪ জন এবং ‘অধিকার’ বলছে এই সংখ্যা ১১ জন। এ তো গেল দেশের কথা। ভারতীয় কর্র্তৃপক্ষ নিহতের সংখ্যা এমনকি সীমান্ত হত্যার সংজ্ঞা নিয়েও ভিন্নমত পোষণ করে। গত বছরের জুনে ঢাকার পিলখানায় বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ে এক বৈঠক হয়। সেখানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএসএফ মহাপরিচালক রজনীকান্ত মিশ্র বলেছিলেন, ‘সীমান্তে হত্যাকাণ্ড হচ্ছে না, অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু হচ্ছে।’ তবে তিনি স্বীকার করে নেন যে, সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে। অথচ এক দশকেরও বেশি আগে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধে সমঝোতায় এসেছিল বাংলাদেশ ও ভারত। প্রশ্ন হলো, জাজ¦ল্যমান এই সংকটকে রাখঢাক করে আর কত মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হবে। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং সরকারকে অবশ্যই প্রতিটি সীমান্ত হত্যাকেই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে এর জোরালো প্রতিবাদ জানাতে হবে।