ছদ্মবেশী চাকরিপ্রত্যাশী সুরাইয়া রহমান মেঘলার (২২) সঙ্গে মুঠোফোনে পরিচয় হয় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কর্মরত হাফিজ মাওলানা আবদুল মজিদের (৩৮)। মেঘলা নিজের বেকারত্ব ও অসহায়ত্বের কথা বলে মজিদের কোম্পানিতে চাকরি চায়। গত ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে মেঘলা প্রথম ফোন করে মজিদকে। পরিচয়ের সপ্তাহ না পেরোতেই ২ জানুয়ারি মজিদ সুনামগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসেন অফিসের প্রয়োজনে। ঢাকায় আসার কথা জানতে পেরে মেঘলা তার সঙ্গে দেখা করতে চায়। দুপুর দেড়টার দিকে রাজধানীর মালিবাগে আবুলের হোটেলের সামনে আসতে বলে মজিদকে। সেখানে আসার পর মেঘলা তার বাসায় গিয়ে চা খেয়ে যেতে বলে। মালিবাগের পশ্চিম চৌধুরীপাড়ার হাজীপাড়া বাসার একটি ফ্ল্যাটে ডেকে নেয় মজিদকে। ওই ফ্ল্যাটে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে থাকা আরও কয়েকজন জোরপূর্বক মজিদের পরিধেয় বস্ত্র খুলে ফেলে। মেঘলাও নগ্ন হয়ে দাঁড়ায় মজিদের পাশে। সে সময় ধারণ করা হয় স্থিরচিত্রসহ ভিডিও। পরে সেই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে তার পরিবারের কাছে চাওয়া হয় ১০ লাখ টাকা।
এ ঘটনায় তার পরিবার র্যাব-৩ ক্যাম্পে একটি লিখিত অভিযোগ করে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে র্যাব গোয়েন্দা নজরদারি ও প্রযুক্তির সহায়তায় ওই রাত ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে অপহরণকারী চক্রের সদস্য সৈয়দ রাসেল (২৬) ও মো. তারেক হোসেনকে (৩৪) আটক করে। তাদের দেওয়া তথ্যমতে মালিবাগের ওই বাসায় অভিযান চালানো হয়। র্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে অপহরণকারী চক্রের অন্যান্য সদস্য পালিয়ে যায়। তবে বাসা থেকে মজিদকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় গতকাল পর্যন্ত মেঘলা গ্রেপ্তার হয়নি। ভুক্তভোগী মজিদ বাদী হয়ে রাজধানীর হাতিরঝিল থানায় একটি অপহরণ মামলা করেছেন।
র্যাব জানায়, ৬-৭ জনের একটি চক্র, যেখানে এমন নারী সদস্যও রয়েছে, তারা এভাবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে কৌশলে বাসায় নিয়ে জোরপূর্বক অশ্লীল ভিডিও বানিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তারা অশ্লীল ভিডিওগুলো ডিলিট না করে সংরক্ষণ করে রাখে এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে ফোন করে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে।
র্যাবের সহকারী পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চক্রের সাতজনের একটি গ্রুপকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এমন আরও বেশ কিছু গ্রুপ রয়েছে বলে জানা গেছে। তারাও ওই বাসায় একই ধরনের কাজ করে। চারতলা বাসার দ্বিতীয় তলায় তারা এই কাজ চালাত। বাসার ভেতরে ক্যামেরা লাগানোর ব্যবস্থা রয়েছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে ফাঁদে ফেলে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। ওই বাসাতেই একাধিক চক্র ফাঁদ পাতার বিষয়টি প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি। অন্য চক্রগুলোকেও ধরার চেষ্টা চলছে।’
তিনি বলেন, এই চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন কৌশলে কাজ করে। মুঠোফোনে পরিচয় হওয়ার পর কখনো চা খাওয়ার দাওয়াত দেয়। আবার কখনো প্রেমের ফাঁদ পেতে ওই বাসায় নিয়ে আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে। চক্রটি কয়েক বছর ধরে এই কাজ করছে। সাংবাদিকতার ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার করে চক্রটি। এদের মধ্যে সুদর্শন তারেক নামের এক যুবক মেয়ে পটিয়ে ওই বাসায় নিয়ে আসত। আর মেঘলা ছেলেদের সঙ্গে কখনো প্রেমের ফাঁদ আবার কখনো চাকরি চেয়ে সুসম্পর্ক গড়ে বাসায় নিয়ে আসত। যারা তাদের ফাঁদে পড়েছে তারা লোকলজ্জার ভয়ে বিষয়টি চেপে গেছে। গ্রেপ্তারদের মুঠোফোন থেকে বেশ কিছু এমন ভিডিও পাওয়া গেছে। কিছু তারা ডিলিট করেছে সেগুলো উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
র্যাবের অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাসান নামের গাড়ির ড্রাইভার স্ত্রীকে নিয়ে রাজধানীর মালিবাগের পশ্চিম চৌধুরীপাড়ার হাজীপাড়ায় একটি চারতলা ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেয়। তবে সে কখনো ওই বাসায় থাকে না।