তেহরানের আকাশে ইউক্রেনের বোয়িং ৭৩৭ বিমানকে ‘ভুলবশত’ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে বিধ্বস্তের কথা স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছে ইরান। গতকাল শনিবার বিমানটির বিধ্বস্ত হওয়ার কারণ হিসেবে ‘মানবীয় ভুলের’ স্বীকারোক্তি দিয়েছে ইরানের কর্র্তৃপক্ষ।
ইরানের সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বিমানটি রেভ্যুলুশনারি গার্ডের স্পর্শকাতর সামরিক স্থাপনার খুব কাছ দিয়ে উড়ছিল এবং মানবীয় ভুলের কারণে এটি বিধ্বস্ত হয়েছে। এর দায় সংশ্লিষ্টদের নিতে হবে।’ দেশটির রেভ্যুলুশনারি গার্ডের অ্যারোস্পেস কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমির আলি হাজিজাদেহ বলেন, ‘এই ঘটনার পূর্ণ দায়িত্ব নিয়েছে ফোর্স’।
এক টুইটবার্তায় ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেন, ‘এই বিপর্যয়কর ভুলের জন্য ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান গভীর দুঃখ প্রকাশ করছে।’ নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করে তিনি এ ঘটনার জন্য দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ টুইটবার্তায় বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের হঠকারিতার কারণে সৃষ্ট সংকটের সময়ে বিপর্যয়মূলক এ মানবিক ভুলের ঘটনাটি ঘটেছে।’
এদিকে ইরানের এ স্বীকারোক্তির প্রতিক্রিয়ায় দেশটির কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা, ক্ষতিপূরণ, তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা ও যারা এ ঘটনার জন্য দায়ী তাদের বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানিয়েছেন ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট ভোলোদিমির জেলেনস্কি।
বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পরপরই বিবৃতি দেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। তিনি বলেছিলেন, ‘ইরানের ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিমানটি ভূপাতিত হয়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য। তবে এটি ভুলবশত ঘটে থাকতে পারে।’ যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনও কানাডার প্রধানমন্ত্রীর সুরেই কথা বলেন।
ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধের টান টান উত্তেজনার মধ্যেই নতুন করে এ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। গত শুক্রবার নিষেধাজ্ঞা আরোপের নির্বাহী আদেশের অনুলিপি হোয়াইট হাউস প্রকাশ করেছে। এতে বিশ্বে সন্ত্রাসের বড় ধরনের মদদদাতা, সামরিক শক্তি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও সেনাদেরকে হুমকির মুখে ফেলাসহ ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তাকারী দেশ হিসেবে ইরানকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় রাখতে বলা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্টিভ মিউচিন বলেছেন, ইরানের বিভিন্ন শিল্প নতুন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়বে। এর মধ্যে আছে নির্মাণ শিল্পসহ, শিল্প উৎপাদন, বস্ত্র, খনি, ইস্পাত ও লোহা শিল্প। বিশ্বে ইরানের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ করাই এ নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য।
গত ৩ জানুয়ারি ইরাকের রাজধানী বাগদাদের স্থানীয় সময় ভোররাতে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় ইরানি জেনারেল কাসেম সুলেইমানি নিহত হওয়ার পর ওই অঞ্চলে প্রবল উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বুধবার ভোররাতে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর দুইটি বিমানঘাঁটিতে পনেরোটির বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। হামলায় ৮০ জন নিহত হয়েছে বলে দাবি করে তেহরান। কিন্তু ওয়াশিংটন জানায়, হামলায় কেউই নিহত হয়নি।
ওই হামলার ঘণ্টা দুয়েক পর তেহরানের ইমাম খোমেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের ছয় মিনিট পর ইউক্রেনীয় উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয়। উড়োজাহাজটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিমান নির্মাতা কোম্পানি বোয়িংয়ের তৈরি। যাত্রীদের অধিকাংশই ছিল ইরান ও কানাডার নাগরিক।
গত বুধবার ভোরে তেহরানের কাছে ১৭৬ আরোহী নিয়ে ওই উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে আসছিল, ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতই এর কারণ। ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বিমান ঘাঁটিতে হামলার পর প্রবল উত্তেজনা চলার সময় প্রাথমিকভাবে অভিযোগটি অস্বীকার করেছিল ইরান। তখন ইরানের কর্মকর্তারা তা ডাহা মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়ে বলছিলেন, যান্ত্রিক ত্রুটিতেই দুর্ঘটনায় পড়ে ওই উড়োজাহাজটি।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক তদন্তের কারণে বাড়তে থাকা চাপের মুখে ও তদন্তে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিমানটির বিধ্বস্ত হওয়ার লক্ষণ লুকানো সম্ভব নয়। এ সবকিছু বিবেচনা করেই হয়তো ইরান বাড়তে থাকা সমালোচনার বিরুদ্ধে লড়াই না করে আগের অবস্থান থেকে সরে এসে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার কথা স্বীকার করে নিয়েছে। পাশাপাশি এ বিধ্বস্তের ঘটনা নিয়ে ইরানের ভেতরেও যে ক্ষোভ ও বিষাদ তৈরি হয়েছে, তাও তাদের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।