প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বা ঘটনাবলি নিয়ে গণমাধ্যমে নিয়মিত আলোচনা হলেও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আলোচনা বেশ কম। আমার মনে হয় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে ব্যবসা বা বিজ্ঞাপনের সংযোগ থাকায় আর্থিক সংকটে নিমজ্জিত দেশের বেশিরভাগ মিডিয়া হাউসগুলো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে ইদানীং খুব একটি নাড়াচাড়া করতে চায় না।    

অথচ দেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিগুণ। ছাত্র সংখ্যাও নেহাত কম নয়। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে মিডিয়ায় নিয়মিত আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। আমরা দেখছি প্রায় শ’খানেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও খুব কম বিশ্ববিদ্যালয়েই দীর্ঘমেয়াদে পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকে বেছে নেওয়ার উপযুক্ত পরিবেশ আছে, সেখানে গবেষণার সুযোগও সীমিত।

সব দেশের ব্যাপারে না জানলেও কিছু দেশের ক্ষেত্রে আমি লক্ষ করেছি যে সেসব দেশে অনেক শিক্ষাবিদ একত্রিত হয়ে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলেন। কিন্তু আমাদের দেশে মূলত একক কোনো ধনী পরিবার বা সুপরিচিত ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের ছত্রছায়ায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গড়ে উঠেছে। সরকারি নিয়ম অনুসারে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রাস্টি বোর্ড থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেও সেখানে প্রাধান্য থাকে প্রতিষ্ঠাতা বা তার পরিবারের সদস্যদের বা তার স্বজনদের। তত্ত্বগতভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান না হওয়ার কথা থাকলেও বাংলাদেশে ‘অমুক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক অমুকজন’ এরকম ধারণা সাধারণ্যে বেশ পরিচিত।

অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা থাকলেও ট্রাস্টিরা যে বিভিন্নভাবে সুবিধা নেন তা গণমাধ্যমে এসেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশও (টিআইবি) কয়েক বছর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দুর্নীতি নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল। সবচেয়ে বড় কথা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কিছুদিন পরপর ঘোষণা দিয়ে কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে জনগণকে সতর্ক করে দেয়। এক্ষেত্রে হাস্যকর ব্যাপার হলো, এদের একসময় তারা নিজেরাই অনুমতি দিয়েছিল।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের পরিপ্রেক্ষিতে ইউজিসি যদি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জনস্বার্থে কিছু সরাসরি ও খোলাখুলি পরামর্শ দিত তাহলে আমারা খুশি হতাম। এর প্রথমটিই হতে পারত সরকারি শিক্ষকদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা বন্ধের নির্দেশ দান। প্রয়োজনে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ও দক্ষ শিক্ষকদের বেতনভাতা বৃদ্ধি করা হোক, শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যয় বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হোক। কিন্তু  প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্বের স্বার্থে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার প্রবণতা বন্ধ করা উচিত। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব বেশি শিক্ষক হয়তো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন না, কিন্তু কয়েকজনের জন্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্যারিয়ার ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাবলিক, প্রাইভেট উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

একটি স্কুল বা কলেজে শিক্ষকদের চাকরির নিরাপত্তা থাকলেও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের চাকরির কোনো নিরাপত্তা নেই।  প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ যখন তখন যেকোনো শিক্ষককে ছাঁটাই বা চাকরি ত্যাগে বাধ্য করতে পারেন। কারণ তারা জানেন কাউকে চাকরিচ্যুতিতে কোনো সমস্যা নেই, হাতের কাছেই রয়েছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞ শিক্ষক। তাদের ডেকে এনে কাজ চালিয়ে দেওয়া যাবে যা অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চাকরিকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

এ প্রসঙ্গে আমরা ইউজিসির কাছে দাবি জানাতে চাই যে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে কিছু দিকনির্দেশনা জরুরি। যেমন শিক্ষকদের কোর্স লোড কতটুকু হবে, তাদের মর্যাদা ও নিরাপত্তার ব্যাপারটিও বিবেচ্য। রেজিস্ট্রার অফিসে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মার খাওয়ার ঘটনা বা শিক্ষার্থীদের দ্বারা শিক্ষকের গায়ে কেরোসিন ঢেলে দেওয়ার ঘটনাও আমরা দেখেছি।  গবেষণা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি একজন শিক্ষকের প্রতি সেমিস্টারে তিনটির বেশি কোর্সে পাঠদান বেশ কঠিন ব্যাপার। কিন্তু অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকদের চারটি, পাঁচটি কোর্স নিতে বাধ্য করা হয়। যেখানে অতিরিক্ত শিক্ষকের কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এমনকি সিনিয়র অধ্যাপকরাও কোর্স পাচ্ছেন না, সেখানে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অতিরিক্ত কোর্সের চাপে চিঁড়েচ্যাপ্টা হচ্ছেন।

এর ফলে সবচেয়ে বড় যে সমস্যাটি দেখা যায়, তা হলো শিক্ষকদের গবেষণা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।  দেখা যায় যে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ক্যারিয়ারে পিছিয়ে পড়েন। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষা ছুটির ব্যবস্থা নেই। সুতরাং কয়েক বছর চাকরি করেই একজন লেকচারারকে শিক্ষাঙ্গন থেকে বিদায় নিতে হয়। এর জায়গায় স্থলাভিষিক্ত হন আরেকজন। মনে হয় কম বেতন দেওয়ার স্বার্থে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও সেটাই চায়। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় প্রতি সেমিস্টারে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞাপন দেয়। এটি মোটেই স্বাভাবিক কোনো চর্চা নয়। ইউজিসির এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা উচিত।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির বয়সসীমা নির্ধারণ। একাধারে ৬৫ বছর পর্যন্ত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পর সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অবসরে গিয়ে সামাজিক বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যলয়ের শিক্ষক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিচ্ছেন। এতেও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অপেক্ষাকৃত তরুণ শিক্ষকরা বঞ্চিত হচ্ছেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ্য নেতৃত্ব সৃষ্টি হচ্ছে না। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে এর প্রয়োজনীয়তা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে যদি এটা চলতে থাকে তাহলে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালগুলোরও পূর্ণ বিকাশ ঘটবে না। এই বিষয়েও ইউজিসির দিকনির্দেশনা জরুরি।

একসময় মনে হয়েছিল দেশে পশ্চিমা ধাঁচের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে উচ্চশিক্ষার জন্য বিশেষত ধনীদের সন্তানদের বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা কমবে। কিন্তু তারপরেও বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার হিসাব অনুসারে দেখা যাচ্ছে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৬০ হাজার শিক্ষার্থী বিদেশে পড়তে যায়। সম্ভবত এই কারণেই দেশে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস খোলার অনুমতি দিতে যাচ্ছে সরকার। ইউজিসি এই ব্যাপারে একটি নীতিমালা তৈরির কাজও শুরু করেছে বলে পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে।

বিদেশি খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি এদেশে তাদের শাখা ক্যাম্পাস খোলে তাহলে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে একটি পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পরিবেশের সৃষ্টি হবে এবং এর ফলে দেশে শিক্ষার মান উন্নত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এতে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার অপচয়ও রোধ করা যাবে।  কিন্তু এক্ষেত্রে বিশ্বখ্যাত ভালো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সুযোগ দেওয়া উচিত। যারা চাইবে এবং শর্তপূরণ করতে সক্ষম হবেÑ তাদেরই অনুমতি দিয়ে দেওয়া হবে ব্যাপারটা এরকম হওয়া উচিত নয়। ব্রিটেন এ ব্যাপারে বেশ আগে থেকেই আগ্রহ দেখাচ্ছে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রচারিত হয়েছে। আমেরিকান, ব্রিটিশ বা অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস মালয়েশিয়া, দুবাই, কাতার ইত্যাদি দেশে আছে।  ব্রিটেনের নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা মালয়েশিয়া এমনকি চীনেও আছে। তবে এমন শাখা খোলা সব বিশ্ববিদ্যালয়ই যে উন্নতমানের তা নয়। অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত অনেক পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই এশিয়াতে চুটিয়ে ব্যবসা করছে।

এ ব্যাপারে ইউজিসিকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। আমার মতে বিশ্বব্যাপী যেহেতু নর্থ আমেরিকান ডিগ্রির মূল্য এখন বেশি সেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি এদেশে আসতে চায়, সেক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয় বা টেক্সাস এঅ্যান্ডএম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা রয়েছে কাতারে, জর্জ ম্যাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা আছে দক্ষিণ কোরিয়াতে বা নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা রয়েছে চীনের সাংহাইয়ে, ইটালির ফ্লোরেন্সে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে। এই ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি আমাদের দেশে আসে তাহলে উচ্চশিক্ষাক্ষেত্রে একটি গুণগত পরিবর্তন হবে তা আশা করা যায়। কিন্তু ইউজিসির কাজ হবে খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের এদেশে শাখা ক্যাম্পাস খোলার আমন্ত্রণ জানানো। শুধু ব্যবসা করতে আগ্রহী বিদেশি তৃতীয় শ্রেণির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি এ সুযোগে এখানে আসে তাহলে দেশের কোনো লাভ হবে না। এক্ষেত্রে ইউজিসির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি যেটি অনুসরণ করা উচিত তাহলো আগ্রহী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং দেখা। শুধু বিশ্বখ্যাত ও র‌্যাংকিং-এ ওপরের দিকের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেই এদেশে শাখা ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।

লেখক

গবেষক ও কলামনিস্ট