ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে একতরফা ভোটের অভিযোগ নিয়েই সম্পন্ন হয়েছে চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচন। গতকাল সোমবার অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও প্রায় সব ভোটকেন্দ্রের বাইরে একক আধিপত্য ছিল নৌকার সমর্থকদের। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিলেও ভোটকেন্দ্রগুলোতে তার কর্মী-সমর্থকরা ছিল পুরোপুরি কোণঠাসা। অধিকাংশ কেন্দ্রেই ধানের শীষের এজেন্টদের পাওয়া যায়নি।
সারা দিনের ভোটচিত্র : সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) মাধ্যমে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মোট ১৭০টি কেন্দ্রের মধ্যে নগরের অংশে ভোটারের উপস্থিতি কম দেখা গেলেও বোয়ালখালীর প্রায় সবকটি কেন্দ্রে ভোটারদের সরব উপস্থিতি ছিল। দুয়েকটি ছাড়া প্রায় সব কেন্দ্রে বিএনপির কোনো এজেন্ট ছিল না। আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচনের কথা জানালেও বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী এ উপনির্বাচনকে ‘প্রহসনের’ নির্বাচন বলে আখ্যায়িত করেছেন।
সকাল ৯টার দিকে নগরের বহদ্দারহাট মোড় এলাকার এখলাছুর রহমান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, বুথের সামনে ভোটারদের লাইন। তিনটি বুথে প্রায় ২০ জন করে হতে পারে। তখন কেন্দ্রের প্রবেশপথে জটলা। এ সময় কেন্দ্রের অদূরে একটু পরপর ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়। মিনিট দশেক পর আবার একই আওয়াজ। এ সময় আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোছলেম উদ্দিন আহমেদ ও বিএনপির প্রার্থী আবু সুফিয়ান কেন্দ্রের ভেতরে অবস্থান করছিলেন।
এ সময় কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা নগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) বিজয় বসাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে এসে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। সকাল ১০টার দিকে নগরের মুরাদপুর এলাকার শারীরিক প্রতিবন্ধী প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র কার্যালয়ে কেন্দ্র গিয়ে দেখা যায়, কেন্দ্র ফাঁকা। ভোটাররা না আসায় ভোটগ্রহণ কর্মকর্তারা বসে আছেন। এক ঘণ্টায় একটি ভোটও পড়েনি। পরে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নগরের মোহরায় মীর্জা আহমেদ ইস্পাহানী স্মৃতি বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, ভোটারদের উপস্থিতি নগণ্য। দেড় ঘণ্টায় ৪২ জন ভোটার ভোট দিয়েছেন বলে জানান প্রিসাইডিং অফিসার।
সকাল সাড়ে ১১টার দিকে নগরের চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার সিডিএ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। পুরুষ ভোটারদের পাশাপাশি নারী ভোটারের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো। গত আড়াই ঘণ্টায় এই কেন্দ্রে তিন শতাধিক ভোট কাস্ট হয়েছে বলে জানান প্রিসাইডিং অফিসার। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দুপুর ১টার দিকে এ কেন্দ্রে বিএনপির প্রার্থী আবু সুফিয়ান সমর্থকসহ কেন্দ্র ঢুকতে চাইলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় বিএনপির এক সমর্থক আহত হন।
দুপুর ১টার দিকে বোয়ালখালীর পিসি সেন সারোয়াতলী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র গিয়ে দেখা যায়, বুথের সামনে ভোটাররা ভোট দিচ্ছেন। তবে দুয়েকটি বুথ ফাঁকা। কেন্দ্রের চারটি কক্ষে আওয়ামী লীগের এজেন্ট থাকলেও বিএনপির কোনো এজেন্টকে পাওয়া যায়নি। কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার পূর্ণচন্দ্র সেন জানান, ১ হাজার ৫৮৫ ভোটের মধ্যে ইতিমধ্যে ৫৪৬ ভোট কাস্ট হয়েছে।
পরে এই কেন্দ্র পরিদর্শনে আসেন আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মোছলেম উদ্দিন আহমেদ। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের জানান, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হচ্ছে। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। ভোটারদের উপস্থিতিতে যথেষ্ট হয়েছে। আশা করি নৌকার বিজয় হবে।
এ সময় বিএনপির পুনর্নির্বাচন দাবির বিষয়ে মোছলেম উদ্দিন আহমেদ বলেন, জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে নৌকা প্রতীকে ভোট দিচ্ছেন। বিএনপির পরাজয় নিশ্চিত, তাই তারা অজুহাত দেখিয়ে, শান্তিপূর্ণ ভোটকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে অজুহাত দেখাচ্ছে। বিএনপিকে নালিশ পার্টি হিসেবেও আখ্যায়িত করেন তিনি।
দুপুর দেড়টার দিকে বোয়ালখালীর গোমদন্ডী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। পুরুষদের চেয়ে নারী ভোটারের উপস্থিতির সংখ্যা বেশি। কেন্দ্রের তিনটি কক্ষে আওয়ামী লীগের এজেন্টরা থাকলেও বিএনপির কোনো এজেন্টকে পাওয়া যায়নি। এ কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মো. বিল্লাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ কেন্দ্রে মোট ২ হাজার ৭৫১ ভোটের মধ্যে ৫৫৬ ভোট কাস্ট হয়েছে। এখনো লাইনে অনেক ভোটার রয়েছে।’
নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বোয়ালখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আছিয়া খাতুন বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এখনো কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলার খবর পাইনি। উপজেলায় ১০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে রয়েছেন। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে।’
ইভিএমে প্রথম ভোট : চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচনের মধ্য দিয়ে বোয়ালখালীবাসী প্রথমবারের মতো ইভিএমের মাধ্যমে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এতে অনেকে স্বস্তি প্রকাশ করলেও অনেকে ভোগান্তিতে পড়েন। বোয়ালখালীর গোমদন্ডী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটার নিশ্চিত হওয়ার জন্য এক নারী ভোটার ফিঙ্গার প্রিন্ট দেন। তখন সার্ভারে একাধিকবার দেওয়ার পরও তার পরিচয় সংবলিত ঠিকানা বা আইডি আসেনি। তখন ওই নারীকে একটু অপেক্ষা করতে বলেন। তখন এই কক্ষে ভোটগ্রহণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা জানান, সার্ভার একটু ডাউন হয়েছে, তাই ভোটারের পরিচয় আসছে না। পরে একই বুথে আরেক নারীকে একইভাবে ফিঙ্গার প্রিন্ট নিতে শুরু করেন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা। দুবার ফিঙ্গার প্রিন্ট দিয়ে না এলেও পরেরবার পরিচয় চলে আসে ওই নারী ভোটারের। তবে সাইফুল নামে এক ভোটার জানান, দুবার আঙুলের ছাপ দিয়েই ভোট দেওয়া শেষ হয়ে গেছে। আগে তো নানান কিছু ছিল। এখন দুই চাপেই ভোট দেওয়া শেষ। এদিকে বোয়ালখালীর পিসি সেন সারোয়াতলী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে আসেন মাহবুব নামে এক ভোটার। তিনি কেন্দ্রের একটি কক্ষে আঙুলের ছাপ দিলে তার পরিচয় না আসায় বেশ কয়েকবার আঙুলের ছাপ দেন। পরে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা তাকে পাশের কক্ষে নিয়ে গিয়ে আঙুলের ছাপ নেন। সেখানে অনায়াসে তার পরিচয় চলে আসে।
নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের মোছলেম উদ্দিন আহমেদ, বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান ছাড়াও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন টেলিভিশন প্রতীকে বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ) চেয়ারম্যান এসএম আবুল কালাম আজাদ, চেয়ার প্রতীকে ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের সৈয়দ মোহাম্মদ ফরিদ আহমদ, আপেল প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. এমদাদুল হক ও কুঁড়েঘর প্রতীকে ন্যাপের বাপন দাশগুপ্ত।
মোট ১৭০টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে নগরের চান্দগাঁওয়ে ৬১টি, পাঁচলাইশে ৪০টি ও বোয়ালখালীতে ৬৯টি কেন্দ্র ছিল। এসব কেন্দ্রে ভোটকক্ষ ছিল ১ হাজার ২৫২টি। ভোট গ্রহণে নিয়োজিত ছিলেন ৩ হাজার ৭৫৮ জন ভোটগ্রহণকারী কর্মকর্তা। নির্বাচনে মোট ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৯৯৬ জনের ভোটারের মধ্যে নগরের চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৩, ৪, ৫, ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডে ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ১১ হাজার ৮৬৫ জন এবং বোয়ালখালীর একটি পৌরসভা ও ৮ ইউনিয়নে (শাকপুরা, সারোয়াতলী, পোপাদিয়া, চরণদ্বীপ, আমুচিয়া, আহলা করলডেঙ্গা, পশ্চিম গোমদন্ডী , পূর্ব গোমদন্ডী ও কধুরখীল ইউনিয়ন) ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ৬৪ হাজার ১৩১ জন।
নির্বাচন কমিশন মোট ভোটকেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৫৮টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করে। এর মধ্যে ১৮টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এসব ভোটকেন্দ্রে ১৯ জন ও সাধারণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে ১৮ জন করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নিয়োজিত ছিল। এছাড়া নির্বাচনে পুলিশ, এপিবিএন, আনসার ব্যাটালিয়নের সদস্যের সমন্বয়ে ১৪টি মোবাইল ফোর্স, ৬টি স্ট্রাইকিং ফোর্র্স, র্যাবের ৬টি টহল দল এবং ৫ প্লাটুন বিজিবি নিয়োজিত ছিল।
এর আগে গত ৭ নভেম্বর ভারতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জাসদ একাংশের কার্যকরী সভাপতি মইনউদ্দীন খান বাদলের মৃত্যুর পর আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়।