ব্যবসায়ীদের প্রতি আস্থাহীন সরকার প্রস্তুতি নিচ্ছে

রমজানে ভোগ্যপণ্যের মজুদ বাড়াতে এবং দাম নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেছে সরকার। ব্যবসায়ীদের ওপর আস্থা রাখতে না পারায় সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (টিসিবি) ভোগ্যপণ্য মজুদ বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি দাম নিয়ন্ত্রণে ভোক্তা অধিকার ও মন্ত্রণালয়ের কয়েকটি দল মাঠে নামানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে আমদানিনির্ভর পণ্যগুলোর ওপর আরোপিত ভ্যাট-ট্যাক্স কমানোরও।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, প্রতি বছর রমজান আসার আগে ব্যবসায়ীরা দ্রব্যমূল্য না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষ পর্যন্ত তা রাখেন না। গত রমজানেও ব্যবসায়ীদের অসহযোগিতায় রমজানে অনেকগুলো পণ্যের দাম বেড়ে যায়। এ ছাড়া এবারের আলোচিত পেঁয়াজ সংকটের মুহূর্তে তিনটি গ্রুপ কথা দিয়েও সময়মতো পেঁয়াজ সরবরাহ করেনি। ফলে পণ্যটির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে কার্যত ব্যর্থ হতে হয় সরকারকে। এ অবস্থায় রমজান সামনে রেখে এবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি নিজেরাও ট্রেডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

জানা গেছে, রমজান সামনে রেখে কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি টিসিবিকেও ভোগ্যপণ্য মজুদ বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামীকাল বুধবার ডাল আনতে অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছে টিসিবির একটি প্রতিনিধিদল। আমদানিনির্ভর যেসব ভোগ্যপণ্যের ওপর ভ্যাট-ট্যাক্স আছে সেগুলো কমানোর জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে আলোচনা করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছেন তারা।

তবে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, রমজানে ভোগ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ীদের ওপর আর আস্থা রাখতে পারছেন না; বিশেষ করে পেঁয়াজের সংকটের মুহূর্তে কথা দিয়েও সময়মতো পেঁয়াজ সরবরাহ করেনি ব্যবসায়ীরা। অথচ তাদের প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করেই সরকার পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ নেয়নি। এবারও যে এর ব্যতিক্রম হবে না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে তাদের।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য) জিন্নাত রেহানা দেশ রূপান্তরকে জানান, গত বছর রমজানে অনেকগুলো পণ্যের দাম বেড়ে গিয়েছিল। এ ছাড়া ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যটির দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ে। ভোজ্যতেল ও চিনির দামও বাড়তি। অস্ট্রেলিয়ার দাবানলে ডালের দামও বেড়েছে। এর প্রভাব আগামী রমজানে অভ্যন্তরীণ বাজারে পড়তে পারে। সে জন্য আগে থেকেই সরকারিভাবে এসব পণ্য মজুদের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, বেসরকারিভাবে যাতে বাজারে সব ভোগ্যপণ্য পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকে, সে জন্য নিয়মিত মনিটরিং ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি এই রমজানে কোনো পণ্যেরই সংকট তৈরি হবে না।

২ জানুয়ারি রমজানে ভোগ্যপণ্যের দামের বিষয়ে একটি বৈঠক করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সেখানে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাসহ এই খাতের আমদানিকারকরা অংশ নেন। ওই বৈঠকে রমজানের আগেই আমদানিকারকদের পর্যাপ্ত মজুদ বাড়ানো ও পণ্যের দাম সহনীয় রাখার বিষয়ে নির্দেশনা দেয় মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া সরকারি উদ্যোগেও তেল, ডাল, ছোলা, পেঁয়াজ, চিনির মজুদ বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। পাশাপাশি পেঁয়াজের মৌসুম শুরু হওয়ার পরও পণ্যটির দাম না কমায় রমজানের আগে আরও ২ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ জন্য টিসিবি, এস আলম, সিটি ও মেঘনা গ্রুপকে দায়িত্ব দিয়েছে মন্ত্রণালয়।

সূত্র জানায়, এই মুহূর্তে সরকারের সবচেয়ে বড় চিন্তা চিনি, ভোজ্যতেল ও মসলার দাম নিয়ে। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দাম বাড়ায় বাংলাদেশে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। এসবের মধ্যে চিনি ও ভোজ্যতেলে ভ্যাট-ট্যাক্স থাকায় বর্তমানে পণ্য দুটির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। তবে এরই মধ্যে পণ্য দুটির দাম বাড়ানোর জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে প্রস্তাব দিয়েছে আমদানিকারকরা। তবে দাম না বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে সরকার; বরং ভ্যাট-ট্যাক্স কমিয়ে পণ্য দুটির দাম নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটি। বিষয়টি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট হওয়ায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে যাচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এই সপ্তাহের শেষে এনবিআরের সঙ্গে আরও একটি বৈঠক করার কথা রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের আশা, ভ্যাট-ট্যাক্স কমানো গেলে ভোজ্যতেল, আটা ও চিনির দাম কমে আসবে।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছিলেন, আমরা তেল ও চিনির দাম বাড়াব না; বরং ভ্যাট-ট্যাক্স কমিয়ে কীভাবে পণ্য দুটির দাম কমিয়ে আগের অবস্থায় নিয়ে আসা যায়, সে দিকটি দেখছি। পণ্য দুটির ওপর আরোপিত ভ্যাট-ট্যাক্স কমাতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আশা করছি পণ্য দুটির দাম নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

এদিকে রমজান সামনে রেখে প্রস্তুত খাদ্য অধিদপ্তর। প্রতিষ্ঠানটির কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে চাল ও আটা মজুদ রয়েছে। এ ছাড়া দেশে পর্যাপ্ত চাল মজুদ আছে বলেও প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়। অধিদপ্তরের ট্রাকে এখনো আটা ও চাল বিক্রির কার্যক্রম চলছে। তবে খাদ্য অধিদপ্তরের চালের দাম খুচরা বাজারের দামের প্রায় সমান হওয়ায় তাদের চালে আগ্রহ কম বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে অধিদপ্তরের পরিচালক (সরবরাহ, বণ্টন ও বিপণন) আমজাদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে পর্যাপ্ত চালের মজুদ রয়েছে। তাই বাজারে দাম বাড়ার কোনো আশঙ্কা নেই। রমজান ঘিরে আমাদের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। সরকারের যেকোনো নির্দেশনা বাস্তবায়নে আমরা প্রস্তুত।