চাহিদামতো বাড়ছে না চিকন চালের উৎপাদন

দেশে ৩৫-৪০ শতাংশ মানুষ চিকন চালে অভ্যস্ত। তবে চাহিদামতো এই চালের উৎপাদন বাড়ছে না। এই চালের সিংহভাগ বোরো মৌসুম থেকে সংগ্রহ করা হয়। অথচ চিকন চাল যেসব জাতের ধান থেকে সংগ্রহ করা হয় বোরো মৌসুমে সেগুলোর আবাদ বাড়ছে না। আগামী বোরো মৌসুমে ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ কোটি ৪ লাখ ৩ হাজার ৬০০ টন, যা আগের বছরের চেয়ে মাত্র ৫০ হাজার টন বেশি। বোরো মৌসুমে মোট উৎপাদনের ৪০-৪৫ শতাংশ ‘চিকন ধান’ উৎপাদন হয়ে থাকে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, মোটা ধানের চেয়ে চিকন ধানের উৎপাদন কম হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়নি। কীভাবে চিকন ধানের উৎপাদন বাড়ানো যায় সেটি নিয়ে কাজ চলছে। এদিকে মহাজনের চড়া সুদ থেকে কৃষকদের রক্ষায় ঋণ দিতে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক প্রস্তুত। যাদের খেলাপি ঋণ আছে তাদেরও রিশিডিউলের মাধ্যমে ঋণ দিতে সব শাখা ব্যবস্থাপককে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যদিও সময়মতো ঋণ পাওয়া নিয়ে কৃষকদের মনে শঙ্কা রয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট চালের প্রায় তিন ভাগের দুই ভাগ আসে বোরো মৌসুম থেকে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে মোট চাল উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৩৮ লাখ ৬ হাজার ৭০০ টন, এর মধ্যে বোরো মৌসুমে উৎপাদন হয় ১ কোটি ৮০ লাখ ১৬ হাজার টন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মোট চাল উৎপাদন হয় ৩ কোটি ৬২ লাখ ৭৯ হাজার ১০০ টন। এর মধ্যে বোরো ১ কোটি ৯৫ লাখ ৭৫ হাজার ৮০০ টন, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ১৫ লাখ টন বেশি। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট চাল উৎপাদন হয় ৩ কোটি ৭৩ লাখ টন। এর মধ্যে বোরো ২ কোটি ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৫০০ টন, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৮ লাখ টনেরও বেশি।

দেশে বার্ষিক চালের চাহিদা কত তার সঠিক হিসাব কারও কাছে নেই। তবে ধারণা করা হয়, এর পরিমাণ ২ কোটি ৬০ লাখ থেকে ২ কোটি ৯০ লাখের মধ্যে হবে। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৩৫ শতাংশ মানুষ চিকন চালের ভাত খেতে অভ্যস্ত। তবে চালকল মালিকরা বলছেন, এর পরিমাণ ৪০ শতাংশ, যা দিনে দিনে বাড়ছে। সরকারের পক্ষ থেকে চালের বাম্পার উৎপাদনের ঘোষণা দেওয়া হলেও চিকন চালের চাহিদা বেড়ে যাওয়া ও এর সরবরাহ কম থাকার অজুহাতে গত অক্টোবর থেকে এর দাম বাড়ায় মিলাররা। বছর শেষে কেজিপ্রতি চিকন চালের দাম ৭-৯ টাকা বেড়ে যায়। এরপর কৃষিমন্ত্রীও দেশে চিকন চালের চাহিদা বেড়ে গেছে বলে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। কিন্তু এর পরও চিকন ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা না নেওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এই খাতের সংশ্লিষ্টরা। যদিও অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, চিকন ধান মোটা ধানের চেয়ে কম ফলে। তাই চিকনের উৎপাদন বাড়াতে গেলে দেশে মোট চালের উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এজন্য আপাতত চিকনের উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে না। তবে কীভাবে এর উৎপাদন বাড়ানো যায় সেটি নিয়ে গবেষণা চলছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক চন্ডি দাস কুন্ডু দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের এখন আমন ও আউশের উৎপাদন বাড়ছে। এছাড়া জমিতে অন্যান্য ফসলও ফলাতে হচ্ছে। এখন যদি চিকন চালের উৎপাদন বাড়াতে যাই, তাহলে আউশ আমনের উৎপাদন কমে যেতে পারে। আবার চিকনের উৎপাদনও মোটা ধানের চেয়ে কম। এখন যদি চিকন ধান বেশি উৎপাদন করি, তাহলে মোট ধানের উৎপাদন কমে যেতে পারে। এতে দেশ চালের সংকটে পড়তে পারে। তাই আপাতত চিকন ধান সেভাবে বাড়ছে না। কীভাবে চিকন চালের উৎপাদন বৃদ্ধি করা যায় সে বিষয়ে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) গবেষণা করছে। ভালো ফল এলে চিকন ধানের উৎপাদন বাড়ানো যাবে।

তবে চিকন ধানের উৎপাদন না বাড়ায় হতবাক হয়েছেন ওই অধিদপ্তরেরই কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, মিলারদের সুবিধা দিতেই এটা করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘দেশে চিকন জাতের ধানের উৎপাদন কম হলে মিলারদেরই লাভ। প্রথমত তারা সরবরাহ সংকট দেখিয়ে চালের দাম বাড়াতে পারবে। আবার কম দামে মোটা ধান কিনে মেশিনে ছেঁটে চিকন করে বেশি দামে বিক্রি করতে পারবে।’

এদিকে কৃষকদের যাতে মহাজন থেকে দাদনের (চড়া সুদে বা শর্তসাপেক্ষে আগাম ঋণ) মাধ্যমে ঋণ নিতে না হয় সেজন্য প্রত্যেক কৃষককে ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক থাকলেই তারা মাত্র ৯ শতাংশ সুদে ব্যাংকের যেকোনো শাখা থেকে ঋণ নিতে পারবে। যাদের খেলাপি ঋণ আছে তারাও রিশিডিউলের মাধ্যমে ঋণ নিতে পারবে। এজন্য ব্যাংকের সব শাখা ব্যবস্থাপককে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও সাবেক বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইসমাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমদের ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে কৃষকদের জন্য। এখন সমস্যা হলো অনেক কৃষকই ঋণ নিতে আসেন কিন্তু কোনো ন্যূনতম কাগজপত্র নেই। তাদের ঋণ দেই কীভাবে। এর পরও ব্যবস্থাপকদের বলে দেওয়া হয়েছে যাতে কৃষকরা ঋণ পেতে পারে সে বিষয়ে সর্বাত্মক সহায়তা করতে।’