৩০ বছর আগে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক সগিরা মোর্শেদ সালাম (৩৪) হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় চারজনকে আসামি করে গতকাল বৃহস্পতিবার আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তারা হলেন সগিরা মোর্শেদের ভাশুর ডা. হাসান আলী চৌধুরী (৭০), ভাশুরের স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা ওরফে শাহীন (৬৪), শাহীনের ভাই আনাস মাহমুদ রেজওয়ান (৫৯) ও ‘ভাড়াটে খুনি’ মারুফ রেজা (৫৯)। তারা পিবিআইয়ের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। পরে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর তাদের কারাগারে রাখা হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে পিবিআইয়ের প্রধান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে প্রায় তিন দশক আগের ওই হত্যাকান্ড সম্পর্কে এসব তথ্য জানান সংস্থাটির প্রধান ডিআইজি বনোজ কুমার মজুমদার। সংবাদ সম্মেলনে ১৯৮৯ সালের ২৫ জুলাইয়ের সেই হত্যাকাণ্ডস্থল, হত্যার পরিকল্পনাস্থল, হত্যার আগে ভাড়াটে মারুফ রেজা ও আনাসের মোটরসাইকেলযোগে ঘটনাস্থলে যাওয়া, অপেক্ষা করা, রিকশার পিছু নেওয়া, রিকশার গতিরোধ করে ব্যাগ ধরে টানাটানি ও গুলির দৃশ্যের স্কেচ প্রদর্শন করা হয়। এ ছাড়া গুলিবিদ্ধ মোর্শেদকে একজন চিকিৎসকের তার গাড়িতে হাসপাতালে নেওয়া এবং হত্যাকারীদের মোটরসাইকেলের পেছনে রিকশাচালকের ইট নিয়ে হাইজ্যাকার হাইজ্যাকার বলে দৌড়ানোর দৃশ্যও প্রদর্শন করা হয়।
এদিকে স্ত্রী হত্যার তদন্তে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন সগিরা মোর্শেদের স্বামী আবদুস সালাম চৌধুরী। গত রাতে মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, পিবিআই যেভাবে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, এটি সাধারণত উন্নত দেশগুলোতে হয়ে থাকে। আমার কাছে মনে হয়েছে, তাদের কাছে কোনো ক্লু ধরিয়ে দিলে তারাও ট্রিমেন্ডাস তদন্ত করতে পারেন। রাতদিন তারা যেভাবে খেটেছেন আমি তাদের তদন্তে অভিভূত। এখন আমার একটাই চাওয়া, এই মামলার বিচারকাজ যাতে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হয়। এ জন্য আমি আগেই আবেদন করেছি। দেখা যাক কর্র্তৃপক্ষ কী করে। বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশল টিউটরিয়ালের অবসরপ্রাপ্ত এই শিক্ষক আরও বলেন, পিবিআই যেভাবে হত্যাকাণ্ডের আগে পরের ঘটনাপ্রবাহ স্কেচের মাধ্যমে তুলে ধরেছে, তা আমার কাছে অসাধারণ কাজ মনে হয়েছে। তাদের এই পরিশ্রমে আমি পুরোপুরি সন্তুষ্ট; বিশেষ করে পুলিশ সুপার ও তদন্তকারী কর্মকর্তা বারবার ঘটনাস্থল ভিজিট করেছেন, পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সবকিছু তুলে ধরেছেন এ জন্য তাদের ধন্যবাদ জানাই। আবদুস সালাম চৌধুরী বলেন, ‘আমার স্ত্রী বাসা থেকে স্কুলে আসা-যাওয়ার জন্য ৪ টাকা করে মোট ৮ টাকা দিয়ে রিকশা ঠিক করেছিলেন। সেই রিকশা কোথায় থামিয়ে কারা গুলি করে পালিয়ে গেছে সেসব চিত্র পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়েছে স্কেচ ভিজুয়ালে। ’
লিখিত বক্তব্যে বনোজ কুমার মজুমদার বলেন, প্রায় তিন দশক আগে ভিকারুননিসা নূন স্কুলের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় শিক্ষক আবদুস সালামের স্ত্রী সগিরা মোর্শেদকে। গত বছরের ১৭ আগস্ট মামলাটি তদন্ত শুরু করে পিবিআই। হাইকোর্টের নির্দেশে প্রায় ৬ মাস তদন্ত চলাকালে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। আসামিরা হাইকোর্টে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। সগিরা মোর্শেদকে মূলত তুচ্ছ পারিবারিক দ্বন্দ্ব থেকে হত্যার পরিকল্পনা করেন আসামিরা। পরিকল্পনামাফিক তা বাস্তবায়নের জন্য ভাড়াটে সন্ত্রাসী নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি জানান, পিবিআইয়ের তদন্তে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে পারিবারিক ৮ ধরনের দ্বন্দ্বের তথ্য উদঘাটন করেছে। এগুলো হচ্ছে আসামিরা সিদ্ধেশ্বরীর একই ভবনে বসবাস করতেন। তৃতীয় তলায় ডা. হাসানের বাসা থেকে ময়লা-আবর্জনা নিচে ফেললে তা মোর্শেদার রান্নাঘর ও বারান্দায় পড়ত। শাশুড়ি বেশি পছন্দ করতেন সগিরা মোর্শেদকে। সগিরা ছিলেন বেশি শিক্ষিত, সে তুলনায় ডা. হাসান আলী চৌধুরীর স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা শাহীন ছিলেন কম শিক্ষিত। আবদুস সালাম ও সগিরা মোর্শেদ দম্পতির বাসা ডা. হাসান আলী চৌধুরী ও সায়েদাতুল মাহমুদা শাহীন দম্পতির তুলনায় বেশি সুন্দর ও পরিকল্পিত ছিল। ‘তুমি’ সম্বোধন নিয়েও দুজনের মধ্যে মনস্তাত্ত্বি¡ক দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছিল। ছাদ ব্যবহার নিয়েও দ্বন্দ্ব ছিল। সগিরা মোর্শেদের কাজের মেয়ে জাহানুরকে মারধর করেছিলেন ডা. হাসান আলী। তা নিয়ে পারিবারিক বৈঠক হওয়ায় ক্ষুব্ধ ছিলেন শাহীন। দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন সগিরাকে। তাকে ভয়ভীতি, হেনস্তা ও বড় ধরনের অঘটন ঘটানোর জন্য শাহীন তার বাবার বাড়ি রাজারবাগের বাসার তৃতীয় তলায় হত্যার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনামাফিক তা বাস্তবায়নের জন্য ডা. হাসান তার নিউ ইস্কাটনের চেম্বার যমুনা ফার্মেসিতে ভাড়াটে খুনি মারুফ রেজার সঙ্গে ২৫ হাজার টাকার চুক্তি করেন। পরিকল্পনামাফিক ১৯৮৯ সালের ২৫ জুলাই মারুফ রেজা শাহীনের ভাই আনাসের সহযোগিতায় সিদ্ধেশ্বরীতে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে সগিরা মোর্শেদকে হত্যা করেন।
হত্যার ৫ দিন পর মারুফ রেজা ডা. হাসান আলী চৌধুরীর চেম্বারে দেখা করলে চুক্তির ২৫ হাজার টাকার মধ্যে ১৫ হাজার টাকা দেন। বাকি ১০ হাজার টাকা পরে দেবেন বললেও ডা. হাসান আলী চৌধুরী আজও তা দেননি। বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটরিং পলিসি বিভাগের তথ্য উদ্ধৃত করে বনোজ কুমার জানান, ১৯৮৯ সালের ২৫ হাজার টাকার বর্তমান মূল্যমান ৬ লাখ ১৫ হাজার ৫৪৪ টাকা। তিনি আরও জানান, মারুফ রেজা তার জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মতারিখ ২৯-০৮-১৯৭২ উল্লেখ করে প্রকৃত বয়স গোপন করার চেষ্টা করেন মামলায় কিশোর অপরাধীর সুবিধা নিতে। তদন্তে বের হয়ে আসে মারুফের জন্মতারিখ ১০-০৩-১৯৭১। এ হিসাবে সগিরা মোর্শেদ হত্যার সময় তার বয়স ছিল ১৮ বছর ৪ মাস ১৫ দিন। হত্যাস্থল মারুফের সিদ্ধেশ্বরীর ৬৭ নম্বর বাড়ি থেকে আনুমানিক ৪০০ গজ উত্তর-পশ্চিমে।
বনোজ কুমার জানান, সগিরা মোর্শেদ হত্যায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ঘটনার পরবর্তী সময়ে চুরি হওয়ায় উদ্ধার করা যায়নি। মোটরসাইকেলটির ড্রাইভার আনোয়ার হোসেন সাক্ষী হিসেবে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। হত্যায় ব্যবহৃত রিভলবারটির মালিক মনু মিয়া ওরফে মুন্না ওরফে হরর মুন্না রূপগঞ্জে ২০০৫ সালের ২৮ নভেম্বর ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যান। তার বিরুদ্ধে রূপগঞ্জ থানায় দুটি মামলা ছিল। পিবিআইপ্রধান বলেন, পারিবারিক তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আসামিরা একই উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে সগিরা মোর্শেদকে হত্যা করেন। বিষয়টি গোপন করতে ছিনতাইয়ের মতো নাটক মঞ্চস্থ করা হয়। আসামিরা সগিরা মোর্শেদকে হত্যার পর ৩০ বছর ধরে ‘হোয়াইট কালার অপরাধী’ হিসেবে সমাজে পরিবার-পরিজন নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছিলেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হলেন পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের পরিদর্শক রফিকুল ইসলাম। তদন্ত তদারককারীর দায়িত্ব পালন করেন পুলিশ সুপার মো. শাহাদাত হোসেন।
বনোজ কুমার জানান, হত্যার পর এই মামলা ২৫ জন তদন্ত কর্মকর্তা তদন্ত করেন। দীর্ঘদিনের এই তদন্ত চলাকালে তারা মোট ২৫ জন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছিলেন। তবে হত্যারহস্য উদঘাটন করতে পারেননি। সর্বশেষ মিন্টু নামে একজনকে আসামি করে চার্জশিট দেওয়া হলেও তিনি এই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কিছুই জানতেন না।
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণে জানা যায়, ১৯৮৯ সালের ২৫ জুলাই সগিরা মোর্শেদ ভিকারুননিসা নূন স্কুল থেকে মেয়েকে আনতে যাওয়ার পথে দুর্বৃত্তের কবলে পড়েন। একপর্যায়ে দৌড় দিলে তাকে গুলি করা হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে সগিরা মোর্শেদ মারা যান। সেদিনই রমনা থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন তার স্বামী সালাম চৌধুরী। প্রত্যক্ষদর্শী রিকশাচালক জড়িত দুজনের কথা বললেও মিন্টু ওরফে মন্টু নামের একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। ১৯৯১ সালের ১৭ জানুয়ারি মন্টুর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। নেওয়া হয় সাতজনের সাক্ষ্য। বাদীপক্ষের সাক্ষ্যে আসামি মন্টু ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদুল হাসানের নিকটাত্মীয় মারুফ রেজার নাম আসে। পরে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে ১৯৯১ সালের ২৩ মে বিচারিক আদালত অধিকতর তদন্তের আদেশ দেয়। এই আদেশের বিরুদ্ধে মারুফ রেজা হাইকোর্টে আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯১ সালের ২ জুলাই হাইকোর্ট রুল দিয়ে অধিকতর তদন্তের আদেশ স্থগিত করে। পরের বছরের ২৭ আগস্ট অপর এক আদেশে হাইকোর্ট ওই রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ায়। এতে থমকে যায় মামলার কার্যক্রম। বিষয়টি নজরে এলে ওই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের জন্য উদ্যোগ নেয় রাষ্ট্রপক্ষ। শুনানি নিয়ে গত বছরের ২৬ জুন হাইকোর্টের একই বেঞ্চ মামলার অধিকতর তদন্ত আদেশে ইতিপূর্বে দেওয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে। একই সঙ্গে ৬০ দিনের মধ্যে অধিকতর তদন্ত শেষ করতে পিবিআইকে নির্দেশ দেয়। পরে পিবিআই আদালতের মাধ্যমে তদন্তের মেয়াদ বাড়িয়ে নেয়।