আমার এক নিকটাত্মীয়ের বিএনপি-অন্তপ্রাণ। কারও কারও ধারণা জামায়েতে ইসলামীর প্রতিও এক ধরনের অনুরাগ আছে তার। ২০১৮-এর ৩০ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিশাল পরাজয়ে তিনি একাধারে ক্ষুব্ধ ও বিষণ্ণ। এ ধরনের তরুণ বা মাঝবয়সী সার্টিফিকেটে শিক্ষিত মানুষদের দেখলে আমি খুব অবাক হই। নিজে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত নই বলে রাজনীতি অঞ্চলের এ ধরনের মাদকতা নিয়ে আমার মধ্যে যথেষ্ট বিস্ময় রয়েছে। দলের নীরব সমর্থক বলে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে সরাসরি বস্তুগত সুবিধা পাওয়ারও সুযোগ নেই তাদের। তারপরও এত বুক ভেঙে যায় কেন!
যদি তাদের পছন্দের দল আওয়ামী লীগ হতো অথবা জাসদ বা কমিউনিস্ট পার্টি হতো; এমনকি গণফোরাম বা নাগরিক ঐক্য হলেও তেমন অবাক হতাম না। কারণ এসব দলের বা দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে বাংলাদেশের মাটির আর মানুষের সম্পর্ক রয়েছে। মাঝেমধ্যে কক্ষচ্যুত হলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে কমবেশি সম্পর্ক থাকে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের কপট আবরণ থাকলেও পাকিস্তান পন্থার সূত্রে জন্মাবধিই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বলয়ে বাঁধা পড়ে আছে বিএনপি। তারপর বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী দল জামায়েতে ইসলামীর প্রধান পৃষ্ঠপোষক হয়েছিল এই দলটি। সম্ভবত গত নির্বাচনের আগে আদালতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ঐক্যফ্রন্টের সংস্পর্শ ত্যাগ করা যাবে তবু জামায়াতের নয়। তাই গত নির্বাচনেও জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে পারেনি বিএনপি। এ কারণে আমার বারবার মনে হয় বুকের ভেতর স্বাধীনতাবিরোধী ভাবধারা না থাকলে বিএনপির পরাজয়ে প্রবলভাবে মুষড়ে পড়ার কারণ নেই একজন মুক্তিযুদ্ধস্নাত বাঙালির।
বর্তমানে বিপন্নদশায় পতিত বিএনপি নেতাকর্মীরা এমন মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হতে পারেন। কিন্তু এতে কোনো লাভ হবে না। বাস্তবতার উঠোনে দাঁড়িয়ে বিএনপি নেতৃত্ব যদি ফিরে তাকাতে না পারে চোখ না রাখতে পারে ইতিহাসে, তাহলে দলটির ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে। বিএনপির এমন বিপন্নদশা আজ নতুন নয় আদর্শহীনতা ও দুর্বল নেতৃত্বের কারণে এমন সংকটে পড়ার অভিজ্ঞতা বিএনপির আগেও হয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই দলটি যদি কঠিন অস্তিত্ব সংকটে নিপতিত হয়, তবে তা চমকে যাওয়ার মতো ঘটনা হবে না। একটি রাজনৈতিক দলের টিকে থাকার সবচেয়ে বড় শক্তি তার আদর্শিক ভিত্তি। ভুঁইফোড় এই দলটি জিয়াউর রহমানের জীবনকালে যদিওবা এক ধরনের জাতীয়তাবাদী আদর্শের আলোকে নিজেকে সাজাতে চেয়েছিল কিন্তু জিয়াউর রহমান উত্তরকালে সে সম্ভাবনার আলো নির্বাপিত হয়। আওয়ামী লীগ রাজনীতির ব্যর্থতার সুযোগ নিয়ে বিএনপি সারা দেশে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পেরেছিল সে যুগে। অচিরেই সুযোগসন্ধানীরা এসে জড় হতে থাকে এই দলে। আওয়ামী লীগবিদ্বেষী একটি গ্রুপও জায়গা করে নেয়। কিন্তু আত্মবিশ্বাস জাগাতে পারেনি নিজেদের মধ্যে।
সবচেয়ে বড় মানসিক দারিদ্র্য ছিল মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধস্নাত এই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। এ দেশের রাজনীতিতে বারবার মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গ ফিরে আসবে এটাই স্বাভাবিক। এই জায়গায় একশোতে একশ পেয়ে বসে আছে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ। একে মোকাবিলার জন্য নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করা ছাড়া উপায় কি! তাই মুক্তিযুদ্ধের সূচনাকালে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ঘোষণা পাঠ করে জিয়াউর রহমান ইতিহাসে নিজের যে মহিমাময় অবস্থান তৈরি করেছিলেন, তারই উত্তরসূরিরা তাকে অবলীলায় ধুলায় মিশিয়ে দিয়ে নির্লজ্জভাবে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ বানিয়ে দিলেন এবং দমে দমে তা প্রচার করতে থাকলেন। এভাবেই ইতিহাসের সুন্দর আসন থেকে জিয়াউর রহমানকে ছিটকে ফেলে দিল তারই স্বজন-সাথীরা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবর্জিত বিভ্রান্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় বিএনপি এবার যোগ্য সাথী পেল মুক্তিযুদ্ধবিরোধী জামায়াতকে। এমন একটি দলের আদর্শে জনকল্যাণের চেয়ে দল-কল্যাণ এবং সুযোগ ও ক্ষমতা অনুযায়ী ব্যক্তি কল্যাণই বড় হয়ে দেখা দেবে এতে আর বিস্ময়ের কি!
২০০৭-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকার যে এমন ঝড় নিয়ে আসবে তা কে ভাবতে পেরেছিল! দুর্নীতিবাজ বাঘা বাঘা রাজনীতির বণিকরা যে আইনের শেকলে বাঁধা পড়তে পারেন, তা এ দেশের ইতিহাসে ছিল অনেকটাই অকল্পনীয়। এই শেকলে আটকে যাচ্ছিল সব দলের ডাকসাইটেরা। কে কতটা দুর্বৃত্ত বা দুর্বৃত্ত নয়, তা বিচার শেষে বোঝা যাবে। তবে বিএনপির কম্বলের প্রায় প্রতিটি পশমই ছিল দূষিত। এসব পশম তুলতে গিয়ে তখন কম্বল উজাড় হওয়ারই জোগাড় হয়েছিল। যেহেতু কোনো আদর্শের টানে নয় বিএনপিতে দলছুট মানুষগুলো এসেছিল স্বার্থের টানে; তখন এই বিপন্নদশায় তারা বিএনপি নামের অকেজো ঘোড়া টানতে রাজি ছিল না। পুরনো অভ্যাসমতো অ্যাবাউট টার্ন করতে কিছুমাত্র দ্বিধা করবে না তা এক ধরনের নিশ্চিত ছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের চাপে বিধ্বস্ত বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ ট্যাক্স পরিশোধ না করার দায় মাথায় নিয়ে বলতে শুরু করেছিলেন তিনি এখন নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। তারেক রহমানকে আইনি সহায়তা দিতে এগিয়ে আসেননি দলের সিনিয়র আইনজীবীরা। ডাক পাঠিয়েও খালেদা জিয়া জেলখানার বাইরে থাকা দলীয় নেতাদের তেমন সাড়া পাচ্ছিলেন না।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে সবচেয়ে বেশি দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল বিএনপি। অল্প কয়েক দিনেই বাংলাদেশের ইতিহাসে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা দলটির ইমেজ নামতে নামতে তলানিতে এসে ঠেকেছিল। নেতা-নেত্রীদের এতদিনকার মাঠ কাঁপানো বক্তৃতা তখন চরম মিথ্যাচার ছিল বলে মানুষের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছিল। দেশটি বারবার দুর্নীতিগ্রস্ততার বিচারে বিশ্বসেরা হওয়ার কলঙ্ক গায়ে মেখেছিল প্রধানত কাদের জন্য, তা আর কাউকে তখন বলে বোঝাতে হয়নি। বাঘা বাঘা বিএনপি নেতারা সব দুর্নীতির দায়ে একে একে অন্তরীণ হচ্ছিলেন জেলে। বেগম খালেদা জিয়াকে ২০০৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রায় অনুচর সহচরশূন্য অবস্থায় পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করতে হয়েছিল।
মনে পড়ে ২০০৭-পূর্ব ক্ষমতাসীন বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া ক্রমাগত ‘উন্নয়ন’ আর ‘উন্নয়নের জোয়ার’ বলে বলে সবাইকে ক্লান্ত করে ফেলছিলেন। পাশাপাশি গোলকধাঁধায় পড়েছিল দেশবাসী। দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতি, ভেঙে পড়া বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, সন্ত্রাসের বাড়বাড়ন্ত, শিল্প খাতে অবক্ষয়, বিমানের খুঁড়িয়ে চলা অবস্থা, চট্টগ্রাম বন্দরের রুগ্ণদশা, পিএসির প্রশ্নপত্র বারবার ফাঁস হওয়াসহ নানা ক্ষেত্রে দুর্নীতির চিত্র স্পষ্ট হয়ে পড়েছিল।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় পাঁচ বছরের পর্বতপ্রমাণ দুর্নীতির খতিয়ান একে একে বেরিয়ে আসছিল তখন। প্রতিশ্রুতি মতো তত্ত্বাবধায়ক সরকার চৌদ্দ শিকের অন্তরালে পুরতে লাগল দুর্নীতিবাজ রাঘববোয়াল মন্ত্রী-এমপিদের। বিস্মিত দেশবাসী স্বস্তির সঙ্গে লক্ষ করল, সদিচ্ছা থাকলে এমন অসাধ্যও সাধন করা যায়। নানা দলের দুর্নীতিবাজরা আটক হলেও ঝাঁকের কৈ-এর মতো ধরা পড়তে লাগলেন বিএনপির ডাকসাইটে নেতারা। অতি অন্যায় করতে গিয়ে এই দলটি তখন দুর্গত দশায় এসে পৌঁছেছিল। এরপর থেকে বিএনপির আর সুদিন ফিরে আসেনি। ঘুরে দাঁড়ানোর পথও তৈরি করেননি বিএনপির নেতা-নেত্রীরা। অন্যদিকে বড়বড় অপরাধ জমা পড়েছিল বিএনপির খাতায়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, দশ ট্রাক অস্ত্রের ঘটনা আর দেশজুড়ে জঙ্গিবাদের উত্থান সবকিছুর পেছনে বিএনপির সংস্পর্শের অভিযোগ সামনে চলে আসে। এভাবে বিএনপি দলটি রাজনীতির অঙ্গনে নাজুক অবস্থায় এসে দাঁড়ায়। আর এর প্রতিফল হিসেবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস পরাজয় হয়।
এমন অবস্থায় মন ভেঙে যাওয়া নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মনোবল ফিরিয়ে আনার জন্য দেশজুড়ে সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু সরকারপক্ষের নিপীড়নের কথা বলে ঘরে বসে রইলেন বিএনপি নেতারা। পার্টি অফিসে বসে নিয়ম করে প্রতিদিন বিবৃতি পাঠ করা ছাড়া আর কোনো কাজ যেন ছিল না। এ ধারা এখনো বজায় আছে। অন্যদিকে দুর্বল বিএনপি ২০১৪ সালের নির্বাচন বয়কট করে এবং সন্ত্রাস চালিয়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছিল জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে। এই ভুল পদক্ষেপ বিএনপিকে আরও বড় গর্তে ফেলে দেয়। এরপরও তৃণমূলপর্যায়ে সাংগঠনিক তৎপরতা চালানোর মতো তেমন পদক্ষেপ বিএনপি নেতৃত্ব গ্রহণ করতে পারেনি।
একটি ভালো যে, ২০১৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মতো ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু নিজেদের নেতৃত্বের দুর্বলতা এবং মহাজোট সরকারের কৌশলের কাছে আবার ধরাশায়ী হয় ঐক্যফ্রন্ট নেতৃত্বের বিএনপি।
এ কারণেই আমরা বলব, বিএনপিকে যদি আবার শক্ত অবস্থানে দাঁড়াতে হয়, তাহলে শুধু বাগাড়ম্বরে কাজ হবে না। এখনো বিএনপি নেতারা মানুষের কাছে অগ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের ভাষায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা না হয় জনগণের ভোটে জেতেননি। তারা তো জনগণের ভোটে জিতেছেন। তাহলে এই ভোটারদের প্রতি সম্মান জানিয়ে তারা যে এমপি হিসেবে শপথ নিলেন না, এর জবাব কী দেবেন? বরং বিএনপি মহাসচিব যখন বলেন, জনগণ এই নবগঠিত সরকারকে মানে না, তখন প্রশ্ন আসে তিনি কোন পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে এত বড় রায় দিলেন! জনগণের নামে এভাবে কাঁঠাল ভাঙলে তারা কেমন করে জনগণের ভোট আশা করবেন। এত কিছুর পর অবশ্য বিএনপির দু-একজন এমপি আবার শপথগ্রহণ করে সংসদেও গেছেন। ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর একটি প্রতীক হতে পারে। বিএনপি নেতৃত্বের এ সময় আরও কৌশলী বক্তব্য দেওয়া উচিত। কিন্তু তেমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
এসব বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে বিএনপি নেতৃত্বের প্রতি আমাদের নিবেদন, ইতিহাসের আয়নায় নিজেদের অতীত দেখুন। সত্য ও বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে আপনাদের। দলীয় নেতৃত্বের আত্মশুদ্ধি সবার আগে প্রয়োজন। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিয়ে শুধু কণ্ঠশীলন করে প্রবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হবে। গণতন্ত্রের স্বার্থেই সরকারবিরোধী বড় দল হিসেবে বিএনপির রাজনীতির সুস্থধারায় ফিরে আসা খুবই জরুরি।
লেখক
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কলামনিস্ট
shahnawaz7 b@gmail.com