পাট শিল্প : সংকট থেকে সম্ভাবনায় রূপান্তর

পাট বাংলাদেশের অন্যতম অর্থকরী ফসল। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশে ৭ লাখ ৫৮ হাজার ২০০ হেক্টর জমি থেকে প্রায় ৮৯ লাখ বেল পাট উৎপাদিত হয়। দেশের ৫০ লাখ কৃষক সরাসরি পাট চাষের সঙ্গে জড়িত। দেশে মোট রপ্তানি আয়ের শতকরা ৩ থেকে ৪ ভাগ আসে পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে। পাট উৎপাদনে বিশ্বে ভারতের অবস্থান শীর্ষে এবং বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় হলেও রপ্তানিতে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম। বাংলাদেশ বিশ্বের মোট পাটের ৩৩ শতাংশ উৎপাদন করে এবং কাঁচা পাটের ৯০ শতাংশ রপ্তানি করে। পাটকে কেন্দ্র করে দেশে গড়ে উঠেছে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মিলে মোট ৩০৭টি পাট কল রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি পাট কলের সংখ্যা ২৫টি এবং বেসরকারি পাট কলের সংখ্যা ২৮২টি।

পাটকল শ্রমিকরা ২০১৫ সালের মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন, পাট ও পাট শিল্প রক্ষা, জাতীয়করণকৃত পাটকল ব্যক্তি খাতে না দেওয়া, সময় মতো মজুরি প্রদান, অবসর-উত্তর পাওনা পরিশোধ এবং বহির্বিশ্বে পাটপণ্যের বাজার সৃষ্টি, মৌসুমের শুরুতে পাট ক্রয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থানসহ ১১ দফা দাবিতে অনেক দিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি (৭ জানুয়ারি) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের উদ্যোগে ‘পাট ও পাটশিল্প : সংকট, সম্ভাবনা ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো হলো পাট উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে পাটচাষিদের মধ্যে উচ্চ ফলনশীল উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ করা, গুণগত মানের পাট উৎপাদনে প্রণোদনা প্রদান এবং বাংলাদেশের ব্র্যান্ডকে টিকিয়ে রাখতে সরকারকে অবশ্যই পাট খাতে বিনিয়োগ করতে হবে। বিনিয়োগের মাধ্যমে পাটকলগুলোয় সর্বশেষ আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজিত হলে পুরাতন পাটকলগুলো উন্নত কারখানায় পরিণত হবে। চাষিরাও পাটের ন্যায্যমূল্য পাবেন। ব্যাকোয়ার্ড লিংকেজ শিল্পও রক্ষা পাবে। বিজেএমসিকে সংস্কার করতে হবে। পাটের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগী একদল বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষকে ব্যবস্থাপনায় নিয়োগ দিতে হবে। করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় যাদের পাট ও পাটজাত বিষয়ের ওপর প্রয়োজনীয় জ্ঞান আছে সেসব বিজ্ঞানীকেও যুক্ত করতে হবে। সরকারি খাতের পাটকলে দ্রুত শতবর্ষের পুরনো যন্ত্রপাতি সরিয়ে আধুনিক ও সর্বশেষ প্রযুক্তি সংবলিত মেশিন প্রতিস্থাপন করতে হবে। এতে উৎপাদনশীলতা বাড়বে। পাটকলগুলোর প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার নিয়োজিত অতিরিক্ত জনবল কমাতে হবে। আধুনিক ব্যবস্থাপনার উপযোগী জনবল তৈরিতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে হবে। দক্ষ ও প্রশিক্ষিতদের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দিতে হবে। পাট মৌসুম শুরুর পূর্বেই পাটকলগুলোকে কাঁচাপাট ক্রয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দিতে হবে। পাট শিল্পকে কৃষিশিল্পের মতো সব সুযোগ সুবিধা দিতে হবে। উৎপাদিত পাটপণ্য বাজারজাত করার লক্ষ্যে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতে একটি বিশেষ পাট বিষয়ক ডেস্ক স্থাপন করতে হবে। সরকারের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সব কার্যালয় ও সংস্থায় পাট ও পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। পাটপণ্য ব্যবহার সম্পর্কে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত পাট প্রশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারকে আন্তরিক উদ্যোগ নিতে হবে।

পাট এমনই একটি কৃষিপণ্য, যার কোনো কিছুই ফেলনা নয়। পাটের পাতা থেকে চা তৈরি করে তা বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব। পাটকাঠি জ্বালানি ও চারকোল তৈরি কাজে ব্যবহার করা হয়। পাটকাঠি পুড়িয়ে উৎপাদিত চারকোল থেকে প্রিন্টার মেশিনের কালি, ফেসওয়াশ, পানির ফিল্টার, বিষবিধ্বংসী ওষুধ ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধ তৈরির কাজে ব্যবহারের জন্য বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। পাট থেকে ভিসকস সুতা তৈরি সম্ভব। সেই সুতায় তৈরি পোশাক অনেক আরামদায়ক এবং দামও বেশি। দেশে প্রতি বছর বস্ত্র কারখানাগুলোতে ৭০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টন ভিসকস সুতা আমদানি করা হয়। পাট থেকে সোনালি ব্যাগ তৈরির যে প্রযুক্তি দেশে উদ্ভাবিত হয়েছে তা কাজে লাগাতে হবে। দেশ বিদেশে সোনালি ব্যাগের প্রচুর চাহিদা আছে। পৃথিবীতে প্রতি বছর ৫০০ বিলিয়ন শপিং ব্যাগের চাহিদা রয়েছে। এই চাহিদার একটি ক্ষুদ্র অংশ বাংলাদেশের তৈরি সোনালি ব্যাগ দ্বারা পূরণ করা সম্ভব হলে পাট খাতে এক নীরব বিপ্লব সাধিত হবে। শুধু বিদেশে নয়; বাংলাদেশেও প্রতিদিন ৫০০ টন সোনালি ব্যাগ তৈরি হলেও তা বাজারজাতকরণের অসুবিধা হবে না। জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে পাট পাতা থেকে চা  তৈরির কারখানাটি স্থাপিত হলে, তা হবে পাটচাষিদের জন্য আর একটি সু-সংবাদ। কৃষক তখন শুধু পাটের আঁশই নয়; পাতাও বিক্রি করে আয় করতে পারবেন প্রচুর অর্থ। ২০১০ সালে ৬টি এবং পরবর্তীতে ১৩টিসহ মোট ১৯টি পণ্যে পাটের মোড়কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে সরকার যে আইন প্রণয়ন করেছে, তা বাস্তবায়নে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এতে দেশে প্রতি বছর ১০০ কোটি টাকার পাটপণ্যের চাহিদা সৃষ্টি হবে। পাটকল ও পাটচাষি উভয়েই লাভবান হবেন। পাট কাটিংস ও নিম্মমানের পাটের সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুপাতে নারেকেলের ছোবড়ার সংমিশ্রণে প্রস্তুত পরিবেশবান্ধব ও ব্যয়সাশ্রয়ী জুট জিওটেক্সটাইল ভূমিক্ষয় রোধ, রাস্তা বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নদীর পাড় রক্ষা ও পাহাড়ধস রোধে ব্যবহৃত হচ্ছে। জিওটেক্সটাইলের অভ্যন্তরীণ বাজার এখন ৭০০ কোটি টাকার ওপর। এসব ছাড়াও পাট দিয়ে শাড়ি, লুঙ্গি, সালোয়ার-কামিজ, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, বাহারি ব্যাগ, খেলনা, শোপিস, ওয়ালমেট, আলপনা, দৃশ্যাবলি, নকশিকাঁথা, পাপোশ, জুতা ,স্যান্ডেল, শিকা, দড়ি, সুতলি, দরজা-জানালার পর্দার কাপড়, গহনা ও গহনার বক্সসহ ২৭৫ ধরনের পণ্য দেশে-বিদেশে বাজারজাত করা হচ্ছে। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম ছয়মাসে( জুলাই-ডিসেম্বর) এই খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ৫১ কোটি ১৭ লাখ মার্কিন ডলার , যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২১. ৫৫ এবং লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৭ শতাংশ বেশি।

গোলটেবিল আলোচনায় অংশগ্রহণকারী শ্রমিক নেতাদের কথা- বাংলাদেশের সরকারি পাটকলগুলোর বয়স ১৫০ বছর এবং এ প্রযুক্তি এখন আর তেমন কার্যকর নয়। তাই পাটশিল্পের উন্নয়নে আধুনিকায়নের কোনো বিকল্প নেই। সরকারি পাটকলগুলো আধুনিকায়নের জন্য ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা খরচ হবে। চীন থেকে আনতে হবে ৩ হাজার আধুনিক প্রযুক্তির তাঁত। এতে উৎপাদন ক্ষমতা তিন গুণ বেড়ে যাবে।  কোনো শ্রমিক ছাঁটাইয়ের প্রয়োজন হবে না এবং ২০১৫ সালের মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন করেও পাটশিল্প ভালোভাবে চালানো সম্ভব হবে। অন্যদিকে বিজিএমসি বলছে মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন করলে পাটশিল্পের লোকসান বহুগুণ বেড়ে যাবে এবং রুগ্ণ প্রতিষ্ঠান চালানো আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, পাটের ভরা মৌসুমে যখন পাটের দাম কম থাকে , তখন সরকার পাট কেনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সরবাহ করে না। নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে যখন কৃষকের ঘরে পাট থাকে না পাটের দাম বেড়ে যায়,তখন পাট কেনে বিজেএমসির মিলগুলো। এতে কৃষকও পাটের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন এবং মিলগুলোও বিপুল লোকসানের সম্মুখীন হয়। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে পাটকলগুলো ভালোভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পাটশিল্পের ওপর বিশেষজ্ঞ তৈরি করা হয়। পাটশিল্পে শিক্ষিত গ্রাজুয়েটরা সেখানকার পাটকলগুলো দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনায় ও উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গুণগতমানের পণ্য উৎপাদনে যথেষ্ট অবদান রাখছেন। পাটশিল্পের উন্নয়নে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনুরূপ বিশেষজ্ঞ তৈরি করা প্রয়োজন।

বর্তমানে বিজেএমসির অধীন রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকলে স্থায়ী শ্রমিক আছে ২৫ হাজার ৫১৯ জন। বদলি তালিকাভুক্ত শ্রমিক ২২ হাজার ৯৯৮ জন। দৈনিক ভিত্তিক তালিকাভুক্ত শ্রমিক ৪ হাজার ৯১০ জন। সব মিলে প্রতিদিন গড়ে কাজ করে ২৭ হাজার ৯৫৭ জন শ্রমিক। পাটকল শ্রমিকদের দাবির মুখে ২০১৫ সালের মজুরি কমিশন মেনে বেতন দিতে যাচ্ছে বিজেএমসি। তবে পাওনা পরিশোধের পাশাপাশি পাটকলগুলোকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার লক্ষ্যে স্থায়ী শ্রমিকদের গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে বিদায় দেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে। গত ৮ বছরে সরকারের এ খাতে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি।শুধু ২০১৮-১৯ অর্থবছরেই ৫৭৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। পাটকলগুলোর লোকসান খুঁজতে গিয়ে ৮টি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, একজন শ্রমিককে ২০১৫ সালের মজুরি কমিশন অনুযায়ী চাকরি থেকে বিদায় জানানো হলে ওই শ্রমিক কমবেশি ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা পাবেন। ওই টাকা তিনি বিভিন্ন কাজে বা ব্যবসায় বিনিয়োগ করে ভালো আয় করতে পারবেন। পাশাপাশি যোগ্যতা অনুযায়ী নিজ প্রতিষ্ঠানে দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করেও সংসার চালাতে পারবেন। ফলে তাদের আর বিনা বেতনে না খেয়ে আন্দোলন করতে হবে না। পক্ষান্তরে সরকারকেও আর লোকসান গুনতে হবে না। বেসরকারি পাটকলগুলোর মতো রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোও হবে লাভজনক প্রতিষ্ঠান।

লেখক

সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস্ লি. নাটোর

netairoy18@yahoo.com