বড় হচ্ছে ই-সিগারেটের বাজার

সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা। ১৪-১৫ বছর বয়সী এক তরুণ ফুটপাতের এক দোকানে উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে কী যেন দেখছে। ঢাকার কারওয়ান বাজারের মোড়ে একুশে টেলিভিশনের (ইটিভি) অফিস যে ভবনে তার সামনে ওই দোকানে কিছু ইলেকটনিকস পণ্যের পাশে থরে থরে সাজানো হরেক রকমের ই-সিগারেট। নানা আকারের সিগারেট, দামও ভিন্ন ভিন্ন। তরুণ দাম জানতে চাইলে বিক্রেতা বলল, ‘মূল মেশিনের সঙ্গে লিকুইট (নিকোটিন) একটা ফ্রি আছে। বিক্রেতা দাম বেশি চাইলেও ৮৫০ টাকায় রফা হলো। এর কিছুক্ষণের মধ্যে দোকানটি থেকে আরেক তরুণও কিনল একটি ই-সিগারেট। দেখে তাকে বেশ উচ্ছ্বসিত মনে হলো। এ সময় তার সঙ্গে কথা হলো এই প্রতিবেদকের। ওই তরুণ জানাল, তার বাড়ি নরসিংদী। নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করে বাবার সঙ্গে ব্যবসায় নেমেছে। ব্যবসার কাজেই কারওয়ান বাজার এসেছে। গ্রামে তার এক বন্ধু ই-সিগারেট খায়। সেজন্য সেও একটি নিয়েছে। বলে, ‘একটু স্টাইল করতে কিনলাম।’ বিক্রেতা বললেন, ‘কমবেশি প্রতিদিনই এই সিগারেট বিক্রি হয়। কম বয়সীরাই কেনে বেশি। অনেকে কাগুজে সিগারেট খায় না, তয় ভাব নিতে এই সিগারেট টানে।’ কোথা থেকে আনেন জানতে চাইলে বিক্রেতা বলেন, ‘মোতালেব প্লাজাসহ গুলিস্তানের বিভিন্ন মার্কেটে এই ই-সিগারেটের পাইকারি বিক্রেতা আছেন।’ তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলছে, ৩০টি দেশে ই-সিগারেট নিষিদ্ধ হলেও বাংলাদেশে এর বিস্তার ঘটছেই। বড় ক্ষতি রোধে এখনই আমদানি বন্ধ করতে হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীতে কয়েক বছরে ই-সিগারেটের ব্যবহার ও বাজার কয়েকগুণ বেড়েছে। এ বাজার গ্রামেও ছড়িয়েছে। উঠতি বয়সী তরুণরা এর বড় গ্রাহক। আর গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুরসহ রাজধানীর সর্বত্র গড়ে উঠেছে ই-সিগারেট সেবনের ভ্যাপিং ক্লাব। এই ভ্যাপিং ক্লাবের সদস্যরা রাত-বিরাতে পার্টির আয়োজন করছে। ফেইসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগের আরও মাধ্যমে এসব ভ্যাপিং ক্লাবের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে মেসেঞ্জারে গ্রুপ তৈরি করে। এসব গ্রুপে বিভিন্ন ইভেন্টে যোগ দিতে আহ্বান করা হয়।

এ বিষয়ে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাশন ডিজাইনের তৃতীয় সেমিস্টারের ছাত্র তাহজীব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফেইসবুকে একটি গ্রুপে ভ্যাপিং ক্লাবের ৬৩ হাজার সদস্য রয়েছে। এদের অনেকেই নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে এসব পার্টির আয়োজন করে। মেসেঞ্জারেই গ্রুপ নির্ধারিত স্থান ও সময় উল্লেখ করা হয়।’ তিনি বলেন, ‘এসব পার্টিতে মূলত ই-সিগারেট বিক্রেতারা নিজেদের নানা ধরনের পণ্য নিয়ে উপস্থিত হন। অনেক সময় বিনামূল্যে সেবন করার সুযোগ দেওয়া হয়। অনেক ধরনের প্রলোভন দেখানো হয়। এভাবে অনেকে আসক্ত হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘অনেকে বলে ই-সিগারেটে কাগুজে সিগারেটের মতো নিকোটিন নেই। তাই এতে ক্ষতিও নেই।’

তবে ই-সিগারেটে বেশি ক্ষতি হচ্ছে বলে জানান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক ড. দুলাল কৃষ্ণ সাহা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ই-সিগারেটে কাগুজে সিগারেটের চেয়ে বেশি নিকোটিন থাকে। ক্ষতির পরিমাণও বেশি। কেউ নিয়মিত ই-সিগারেট সেবন করলে দ্রুতই ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘একটি নির্দিষ্ট মাত্রার বাইরে বেশি নিকোটিনযুক্ত তামাকপণ্য আমদানি নিষিদ্ধ। কিন্তু বাংলাদেশে বেশিরভাগ ই-সিগারেট অবৈধভাবে ঢুকছে। এখানে এনবিআর (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণ সেলের আরও সতর্ক হতে হবে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সম্প্রতি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা ই-সিগারেট বাজারে বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০টি দেশে ই-সিগারেট নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কয়েক বছর আগে বাংলাদেশেও এটি বিক্রি নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু অজ্ঞাত কোনো কারণে তা আর হয়নি। ভয়াবহ ক্ষতি রোধ করতে চাইলে সরকারকে এখনই এ সিগারেট আমদানি বন্ধ করতে হবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য (মূসক নীতি) ড. আবদুল মান্নান শিকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো পণ্য বাংলাদেশে আমদানি নিষিদ্ধ করার বিষয়ে এনবিআরের খুব বেশি কিছু করার নেই। তবে কোনো নির্দেশনা থাকলে সেটা অবশ্যই পালন করতে বাধ্য।’ তিনি বলেন, ‘অবৈধ পথে কোনো কিছু যেন দেশে না ঢুকতে পারে, সে বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে।’

সরকার ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের ৭০তম অধিবেশনে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নে (এসডিজি) ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছে। এর মধ্যে তামাক নিয়ন্ত্রণ অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু তামাক নিয়ন্ত্রণ তো দূরের কথা, কয়েক বছর ধরে দেশে ই-সিগারেট ব্যাপক হারে বিস্তার লাভ করলেও তা রোধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট অনেকে জানান।

এ ব্যাপারে তামাকবিরোধী সংগঠন প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের বলেন, ‘থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ প্রায় ৩০টি দেশে ই-সিগারেট নিষিদ্ধ। সম্প্রতি ভারত সরকারও এটা বন্ধ করেছে। অথচ বাংলাদেশে এটা বন্ধ করতে আইন তো দূরের কথা কোনো বিধিনিষেধও নেই। ফলে যেখান-সেখানে পাওয়া যাচ্ছে। কারণ অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতি বলে এর বিস্তার লাভ করেছে। যুবসমাজকে রক্ষার জন্য এর বাজারজাতকরণ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।’