সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিবের ফেইসবুক স্ট্যাটাস

মোবাইল ফোনে সাড়া দেন না সরকারি কর্মকর্তারা

সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অপরিচিত নম্বর থেকে আসা ফোন ধরেন না। এমনকি মেসেজ পাঠালেও পড়ে দেখেন না। উত্তর তো দেনই না। এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসার আকুতি প্রকাশ করে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন সদ্য সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম।

সরকারের বর্তমান সচিব থেকে শুরু করে সাবেক কর্মকর্তারা এ স্ট্যাটাসে কমেন্ট করেছেন ও লাইক দিয়েছেন। অনেকে বিরূপ মন্তব্যও করেছেন। ফেইসবুকে ঝড় ওঠার পর প্রথম স্ট্যাটাসের প্রায় ৯ ঘণ্টা ব্যবধানে তিনি নতুন করে আরেকটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। সেখানে তিনি আগের স্ট্যাটাসের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সেই স্ট্যাটাসটিও লুফে নিয়েছেন ফেইসবুক ব্যবহারকারীরা। সরকারের অনেক সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, উপসচিব থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এমনকি নবীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটও এই স্ট্যাটাসে সাড়া দিয়েছেন। অনেক সাবেক কর্মকর্তাও তাদের অভিযোগ প্রকাশ করেছেন।

শফিউল আলম গত বছর নভেম্বরে বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পদে যোগদান করেন। তার জায়গায় নতুন মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্ব নেন খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত শফিউল আলমের সঙ্গে গতকাল বুধবার রাতে যোগাযোগ করা হলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি চেয়েছি টেলিফোন ধরার বিষয়ে কর্মকর্তাদের সচেতন করতে। কেউ টেলিফোন ধরেন না এটা যেমন বলা যাবে না তেমনি অনেকে উপেক্ষা করেনÑ এটাও ঠিক। উপেক্ষা করা উচিত না।’

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি নিজেও শফিউল আলমের স্ট্যাটাস দেখেছি এবং কমেন্ট করেছি। সরকারের কর্মকর্তাদের ফোন ধরার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। কারণ তাদের ফোনের বিল দেওয়া হয় জনগণের করের টাকায়।’

গতকাল বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টা ৩৭ মিনিটে শফিউল আলমের স্ট্যাটাস ফেইসবুকে প্রকাশ করলে তা প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরে রাত ৭টা ১৮ মিনিটে তিনি একটি ব্যাখ্যা দেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ফোন না ধরার সংস্কৃতি নিয়ে কিছু নেতিবাচক কথা লিখেছিলাম। বিদেশ হতে সময়ের ব্যবধানের কারণে ফোন করা খুবই কঠিন। সময়বুঝে হিসাব-কিতাব করে ফোন করতে হয়। যখন সেই ফোনটি দেশে যায় তখন তা রূপান্তরিত হয়ে টেলিটক নম্বর হয়ে যায়। ফলে ফোন গ্রাহক বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন, তাই ধরেন না। তারপরও ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। এই পর্যায়ে তিনি মঙ্গলবার রাত ১২টা ১৪ মিনিটে অর্থ সচিবকে ফোন দেওয়ার কথা জানান। দেশে থাকতে আমরা সহকর্মীদের মাঝে এই এটিকেটটি চালুর চেষ্টা করেছি, পরিচিত অপরিচিত সবার ফোন ধরার। না পারলে মেসেজ দেওয়ার। তাও না পারলে কল ব্যাক করা। এ নিয়ম মানতে গিয়ে তিনি নানা বিপদে পড়ার কথা জানান। শেষ পর্যন্ত তবুও তা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করেছেন বলে জানিয়েছেন।

তিনি আরও বলেছেন, আমার বন্ধুদের কেউ কেউ অনুযোগ করেছেন আমিও দেশে থাকতে একই কাজ করেছি। অর্থাৎ অনেকের ফোন ধরিনি। এরকমটি হয়ে থাকলে আমি তাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। আমি জেনেশুনে কখনো এ কাজটি করিনি। তবে ভিভিআইপি পরিবেশে বা মন্ত্রিসভা চলাকালে ফোন ধরার সুযোগ ছিল না। আবার প্রচ- চাপের সময় ধরতে না পারলেও মেসেজ দিতাম।

তিনি আরও বলেছেন, উন্নত বিশ্বে ফোন না ধরা রীতিমতো অভদ্রতা। কোনো কোনো দেশে তা অপরাধও বটে। আসুন আমরা সবাই জনবান্ধব হই। সেবা প্রার্থীদের ব্যথা বোঝার চেষ্টা করি। তাদের ডাকে সাড়া দিই। অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশ না হলে পরিচিত অপরিচিত সবার ফোন ধরি।

ফেইসবুক ব্যবহারকারী রহমান মাহবুব মন্তব্য করেছেনÑ ‘তারা এ ধারণাও পোষণ করেন যে, টেলিফোনকারী একজন দায়গ্রস্ত ও অনুগ্রহপ্রার্থী। তিনি এটি কখনো মনে করেন না যে, তার অদক্ষতা ও অমনোযোগিতার জন্য আজ টেলিফোনকারী এ দুরবস্থার মধ্যে পতিত।’

৮৪ ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ মন্তব্য করেন, এর কারণ হচ্ছে পাওয়ারফুল পদ হারানো। কল গ্রহণকারী মনে করছেন আপনি আর সরকারি চাকরিতে নেই। পদোন্নতি বা অন্য কোনো কারণে আপনার আগের অবস্থান নেই।

কুমিল্লার দাউদকান্দির ইউএনও কামরুল ইসলাম খান মন্তব্য করেছেন, ‘খুবই দুঃখজনক স্যার। আমরা অনেক জুনিয়র কর্মকর্তা আছি এমন; আবার প্রো-অ্যাকটিভ আছে স্যার। তবে আপনার এ স্ট্যাটাস আমাদের সকলের অনুভূতি ও দায়িত্বশীলতায় নাড়া দেবে বিশ্বাস করতে চাই স্যার। আপনাকে ধন্যবাদ বিষয়টি তুলে ধরার জন্য।

পুলিশের কুড়িগ্রামের এসপি মহিবুল ইসলাম খান জানান, পুলিশ অফিসাররা অপরিচিত নম্বর থেকে আসা শতভাগ কল রিসিভ করেন।

জেদ্দা কনস্যুলেটের ফার্স্ট সেক্রেটারি মোস্তফা জামিল বলেন, আমি অনেক জুনিয়র কর্মকর্তাদের দেখেছি অপরিচিত কল কেটে দিতে। তবে তিনি নিজে অপরিচিত নম্বর থেকে আসা কল ধরেন বলে মন্তব্য করেন।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদারও মন্তব্য করেন। শফিউল আলম মন্ত্রিপরিষদ সচিব থাকাকালেই তিনি এ বিষয়ে অভিযোগ করেছিলেন। তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি। এই সংস্কৃতি আগে অন্যরকম ছিল। অনেকে ওয়েবসাইটে মোবাইল নম্বর এবং বাসার ফোন নম্বর দেন না। সাধারণ করদাতারা এসব ফোনের বিল পরিশোধ করেন। আপনি এখনো সরকারের সঙ্গেই আছেন। কিছু একটা করুন। মুস্তফা মহিউদ্দিন নামে একজন লেখেন কঠিন বাস্তবতাকে বোঝার জন্য ধন্যবাদ।

অর্থ বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত সচিব এএফ আমিন চৌধুরী শফিউল আলমের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন। তিনি এই পদ্ধতিটিকে ট্র্যাজেডি হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাহমুদ হাসান মন্তব্য করেন, ‘স্যার সঠিক পর্যবেক্ষণ। আমার দপ্তরকে এ অপবাদমুক্ত করার প্রয়াস চালানোর অঙ্গীকার করছি। মোস্তফা আমিন খোকন লিখেছেন ‘বিশ্বব্যাংকের মেয়াদ শেষে যদি কেবিনেট মিনিস্টার হয়ে দেশে ফির, এই গ্রুপটাই বিমানবন্দরে বসে থাকবে সবার আগে।’

বশিরউদ্দিন আহমেদ লিখেছেন, একজন সাবেক কেবিনেট সেক্রেটারির যদি এই অবস্থা হয় তাহলে আমাদের কী হাল কল্পনা করো। আমরা ভুলে যাই কোনো কিছু স্থায়ী নয়।

শিশু সাহিত্যিক আলম তালুকদার লিখেছেন, ‘আপনি কি ধরতেন? না পারলে ব্যাক করতেন? নিশ্চয়ই সব পারতেন না। যেখানে লাভ সেখানে ভাব। মুন্সী শাহাবুদ্দিন একজন সচিব, তিনি আমার ফোন ধরেন না, ব্যাকও করেন না। তিনজনকে ব্যতিক্রম পেয়েছি। একজন কামাল চৌধুরী, আরেকজন মোহাম্মদ সাদিক ও কায়কাউস।’

সাবেক সচিব কাজী আখতার হোসেন দাবি করেছেন, তিনি ব্যতিক্রম ছিলেন। দূরবর্তী কোনো গ্রামের একজন শিক্ষকও ফোন করে আমাকে তার সমস্যার কথা বলতে পেরেছেন। আর আমাদের কর্মকর্তাদের ফোন না ধরার তো প্রশ্নই ওঠে না।

সরদার রেজাউল করিম বলেছেন, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিবের ফোন ধরেন না বা এসএমএসের জবাব দেন না এরা প্রশাসন চালায় কীভাবে? অহমিকাবোধ খুবই খারাপ জিনিস। তারা এত আত্মকেন্দ্রিক হয় কীভাবে। দুঃখজনক। এই স্ট্যাটাসে শামিল হয়েছেন কবি নির্মলেন্দু গুণও। তবে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।

বাংলাদেশ একাডেমি ফর রুরাল ডেভেলপমেন্টের কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল হুসাইন বলেছেন, ফোনে বা মেইলে সাড়া দেওয়া সব সমাজের প্র্যাকটিস।

ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন লিখেছেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের এটা কমন সমস্যা।

ফারহানা মিলি লিখেছেন, ‘তারা তাদের প্রয়োজনের বাইরে কল করেনও না, কারও কল ধরেনও না। এমনকি অনেকের তো নাম্বার কাউকে দিতে আদেশ-নিষেধ করা থাকে তাদের পিএস, এপিএস ও কাছের মানুষদের প্রতি।’ ভূমি সচিব মাকছুদুর রহমান পাটওয়ারী লিখেছেন, আমরা যেকোনো নির্দেশের অপেক্ষায় আছি।

সব পদস্থ সরকারি কর্মকর্তার মোবাইল ফোন নম্বর থাকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ওয়েবসাইটে। কর্মকর্তার নাম, পদবি, অফিসের সেকশন ছাড়াও ওয়েবসাইটে কর্মকর্তার অফিসের ফোন নম্বর, বাসার ফোন নম্বর, মোবাইল নম্বর এমনকি অফিসের ইন্টারকমের নম্বরও দেওয়া থাকে। অফিসের প্রয়োজনে। মন্তব্য করা ছাড়াও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিবের স্ট্যাটাসে লাইক দিয়েছেন অনেকে।