আগামী ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে মহানগর বিএনপি নেতারা এখন ঐক্যবদ্ধ। দীর্ঘদিনের তিক্ততা ভুলে দলের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে একে অপরের সঙ্গে হাতে হাত রেখে কাজ করে যাচ্ছেন। দীর্ঘ ২৮ বছরের তিক্ততা ভুলে একসঙ্গে কাজ করছেন বিএনপির বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক সালাহউদ্দিন আহমেদ ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সহ-সভাপতি নবী উল্লাহ নবী। অথচ এই দুই নেতা অতীতে কখনো একসঙ্গে বসেননি। কাজও করেননি। এখন তারা একত্রে বসছেন। খাওয়াদাওয়া করছেন। অতীতের তিক্ততা ভুলে একসঙ্গে কাজ ॥করার বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল বুধবার দেশ রূপান্তরকে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমার প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ ছিল না। কারও সঙ্গে আমার প্রতিযোগিতা ছিল না। দলের কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে আন্দোলনের অংশ হিসেবে আমরা সিটি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। অন্যদিকে নবী উল্লাহ নবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১৯৯১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে সালাহউদ্দিন আহমেদের একগুঁয়েমি ও দলের নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন না করায় তার সঙ্গে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছিল আমার। এখন আর সেই দ্বন্দ্ব নেই আমাদের মধ্যে। সিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন আমরা একসঙ্গে কাজ করছি।
এই দুই নেতার দ্বন্দ্বের বিষয়ে দক্ষিণের মেয়র প্রার্থী প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অতীতে তাদের সম্পর্ক কেমন ছিল সে বিষয়ে কিছু বলতে চাই না। তবে এখন সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমার জন্য কাজ করছেন। সবাই এখন আমার অভিভাবক।’
মহানগর বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব ও শত্রুতা ভুলে ভোটের মাঠে বিএনপি নেতাকর্মীরা এখন ঐক্যবদ্ধ। ঢাকার দুই প্রভাবশালী নেতা দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকার আধিপত্যের লড়াই ছিল দীর্ঘদিনের। ঢাকা দক্ষিণ সিটি নির্বাচনে খোকাপুত্র ইশরাক হোসেনকে এখন পিতৃস্নেহে আগলে ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন মির্জা আব্বাস। একইভাবে আব্বাসপতœীও ইশরাকের গণসংযোগে থাকছেন সর্বাগ্রে। গণসংযোগ শেষে বিরতির সময় মির্জা আব্বাসের শাহজাহানপুরের বাসায় দুপুরে খাবার খেয়েছেন ইশরাক। খাবার টেবিলে বিভিন্ন আইটেম মায়ের মমতায় ইশরাকের প্লেটে তুলে দিয়েছেন আফরোজা আব্বাস।
তারা বলেন, ডেমরা-যাত্রাবাড়ী এলাকায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির দুই নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ ও নবী উল্লাহ নবী। সিটি ভোট ঘিরে তারাও এখন এক কাতারে এসে গণসংযোগ করছেন খোকাপুত্র ইশরাকের জন্য। একসঙ্গে হাতে হাত রেখে গণসংযোগ করছেন। সালাহউদ্দিনের বাসায় খেয়েছেন নবী উল্লাহ নবী। জ্যেষ্ঠ নেতাদের দ্বন্দ্বের অবসান হওয়ায় থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়েও নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও অন্তঃকলহ অনেকটা মিটে গেছে। তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও এখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভোটের মাঠে নেমে পড়েছেন।
মহানগর নেতারা আরও বলেন, শুধু খোকার সঙ্গেই নয়, ঢাকা মহানগরীর নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি হাবিব-উন নবী খান সোহেলের সঙ্গেও সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল মির্জা আব্বাসের। এখন সিটি ভোটে তারা একসঙ্গে গণসংযোগ করছেন। দক্ষিণ সিটি ভোটে নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে সোহেল একজন দায়িত্বশীল নেতা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব করা হয়েছে মির্জা আব্বাসকে। ওই নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে রয়েছেন আফরোজা আব্বাসও। তারাই ভোটের প্রচারের সামগ্রিক দায়িত্ব পালন করছেন।
তারা বলেন, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন পরিচালনার জন্য যাত্রাবাড়ী-ডেমরার সমন্বয়ক করা হয় নবী উল্লাহকে আর শ্যামপুর-কদমতলীর সমন্বয়ক করা হয় সালাহউদ্দিন আহমেদকে। গত ২০ জানুয়ারি এই দুই সমন্বয়ককে নিয়ে সালাহউদ্দিনের বাসায় বৈঠক করেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান। বৈঠক শেষে তারা সালাহউদ্দিনের বাসায় দুপুরের খাবার খান।
নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণ সম্পর্কে নবী উল্লাহ নবী বলেন, ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন সালাহউদ্দিন আহমেদ। নির্বাচনের পরে ঢাকা মহানগর বিএনপির রাজনীতিতে নিজে নিজে সংগঠন করেছেন। পরীক্ষিতদের বাদ দিয়ে মহানগর কমিটিতে নিজের সমর্থকদের জায়গা করে দেন। নির্বাচনে তার পক্ষে যারা কাজ করেছেন তাদের বাদ দেওয়া হয়। কর্মীদের অবমূল্যায়ন করতে শুরু করেন। এছাড়া কাউকে পছন্দ না হলে মারধর শুরু করেন। এর প্রতিবাদ করায় সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে আমার দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়।
তিনি বলেন, ঢাকার সংসদীয় আসন বণ্টনে শ্যামপুর-কদমতলী নিয়ে গঠন করা হয় ঢাকা-৪ আসন। এখানে মনোনয়ন দেওয়া হয় সালাহউদ্দিন আহমেদকে। আর যাত্রাবাড়ী-ডেমরা নিয়ে গঠন করা হয় ঢাকা-৫ আসন। এখানে মনোনয়ন দেওয়া হয় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সহ-সভাপতি নবী উল্লাহ নবীকে। এর মাধ্যমে উভয়ের দ্বন্দ্বের কিছুটা অবসান হয়।
নবী উল্লাহ নবীর বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, নবী উল্লাহ নবী সব সময় আমার বিরোধিতা করেছে। সংসদ নির্বাচনে নবী আমার পক্ষে কাজ না করে আওয়ামী লীগের এমপি প্রার্থীর পক্ষে কাজ করে।
তিনি বলেন, আমি শহীদ জিয়ার হাত ধরে রাজনীতি শুরু করি। আমি কট্টর বিএনপি। এরপর স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় আমাকে কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ঢাকা মহানগরের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেন। একমাত্র আমার সময়ে ঢাকার ৮টি আসন বিএনপি পেয়েছিল। এরপর আর বিএনপি ঢাকার সব আসন পায়নি।
তিনি বলেন, দেশের মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনা ও কারাবন্দি চেয়ারপারসনকে মুক্ত করতে আমরা সিটি নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। আমরা চাই জনগণ তাদের সাংবিধানিক অধিকার ফিরে পাক। এ জন্য সবাই ভেদাভেদ ভুলে প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকার বড় ছেলে ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনের পক্ষে কাজ করছি। জনগণ ভোট দিতে পারলে ইশরাকের বিজয় ঠেকিয়ে রাখা যাবে না।