নগরীর ব্যস্ত রাজপথ। বিরামহীন ছুটে চলা যানগুলো যাত্রীতে পূর্ণ। তবে প্রায়ই সেখানে ঠাঁই হয় না নারীদের। কারণ ভিড়ে দাঁড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর সক্ষমতা নেই নারীর। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয় পথেই। কখনো কখনো গণপরিবহনে উঠতে পারলেও স্বস্তি নেই। নারীবান্ধব নয় গণপরিবহনগুলো। যখন পুরুষ-সহযাত্রীর হাত অবলীলায় নিপীড়ন করতে থাকে, তা কোনো যৌক্তিক বাক্য দিয়ে অন্যদের বোঝানোর ভাষা থাকে না সেই নারীর ।
তবে নারীবান্ধবহীন গণপরিবহন যুগের অবসান হচ্ছে। নিরাপদে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে রাইড শেয়ারিং অ্যাপসগুলো নারীদের জন্য এখন বেশ জনপ্রিয়। এই নারীরা অন্য সাধারণ যানবাহন ছেড়ে এই দুই চাকার বাহনকেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যে গ্রহণের অন্যতম কারণ হিসেবে বাসে নারীর যৌন হয়রানিকেই দায়ী করেছেন প্রায় প্রত্যেক রাইড শেয়ারিং অ্যাপসের মালিকরা। তাই তাদের রাইড শেয়ারিং অ্যাপসে পুরুষের পাশাপাশি নারী চালকরাও রয়েছেন। মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে মুঠোফোনের অ্যাপ্লিকেশনভিত্তিক পরিবহনসেবায় দাঁড়িয়ে থাকা অনেক পুরুষের ভিড়ে এমনই একজন নারী বাইকচালককেও চোখে পড়ে। নারী-পুরুষ সবাই তার ভরসার কাঁধে হাত রেখে হাসিমুখে সেবা নিচ্ছেন। সেই নারী চালকের নাম মণি। কৈশোরে জেদ করে ভাইয়ের বাইক নিয়ে এক ঘণ্টায় বাইক চালানো শিখেছিলেন। তারপর দুই চাকাওয়ালা এই দুরন্ত গতির বাহনকে আর শখ মানতে রাজি নন। এখন পুরোদস্তুর পেশাজীবী। ইতিমধ্যে রাইড শেয়ারিং অ্যাপসগুলো থেকে পাঁচ শতাধিক রাইড দিয়েছেন বলে জানালেন মণি। পেশার নেশার আনন্দে ছুটে চলেন তিনি। তবে সমাজে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও নারী চালকদের সংখ্যা খুবই কম। পাঠাওয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হোসেন মোহাম্মদ ইলিয়াস জানান, পঞ্চাশের বেশি নারীর সংখ্যা নেই পাঠাওয়ে। শুরুর দিকেও এর সংখ্যা বেশি ছিল না। তিনি বলেন, যে নারী চালকরা আছেন, তারা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে সেবা দিয়ে থাকেন। ট্রাফিক আইন থেকে শুরু করে চালানোতেও তারা বেশ দক্ষ। সমাজের জন্য এটা বেশ ইতিবাচক পরিবর্তন। পরিবর্তিত বিশ্বে পুরুষের পাশাপাশি সব ক্ষেত্রেই নারীদের অংশগ্রহণ সমান হলেও চালক হিসেবে নারীদের অংশগ্রহণ কেন এত কম, সেই উত্তরটি জানা গেল শুধু নারীযাত্রীদের মোটরসাইকেল ট্যাক্সি সার্ভিস ‘লিলি রাইড’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ মুহাম্মদ সাইফুল্লাহর কাছ থেকে। মাত্র একজন নারী দিয়ে এই সেবা চালু করেছিলেন তিনি। সে সংখ্যা এখন বেড়েছে। তবে ছেলেদের তুলনায় এর সংখ্যা খুবই নগণ্য। এর অন্যতম কারণ, নারীর পরিচিত রূপ থেকে বেরিয়ে আসাটা সমাজ গ্রহণ করতে পারছে না।
তিনি বলেন, আদিকাল থেকেই সমাজের নানা প্রয়োজনে নারী-পুরুষের কিছু কাজ ভাগ হয়ে গেছে। এখনো কিছু মানুষ সমাজকে সেভাবেই দেখতে চায়। কিন্তু বিশ্ব পরিবর্তিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সেটা মেনে নিলেই নারীদের অনেকগুলো দরজা খুলে যাবে। কিন্তু সমাজের স্বাভাবিক পরিবর্তনকে মেনে না নিতে পারা এবং প্রবল ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে নারীদের সব পেশায় অংশগ্রহণের সংখ্যা কম। তবে রাইড শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে এই পরিবর্তন শুরু হয়েছে এটা বেশ ইতিবাচক। তাই আগামী প্রজন্মে এ সংখ্যা আরও বাড়বে এবং ভবিষ্যতে আরও অনেক। এভাবেই বদলে যাবে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি। তবে রাইডসেবায় নারী চালকদের সংখ্যা কম হলেও সব ধরনের কাজকে সম্মান জানালেই সমাজের নারীদের কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আসবে হবে বলে মনে করেন রাইড শেয়ারিং সেবা সহজের প্রতিষ্ঠাতা মালিহা মালেক কাদির। তিনি বলেন, বাইকের চালক হিসেবে নারীরা সংখ্যায় পুরুষের চেয়ে কম হলেও তারা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি সচেতন। তাদের সেবা সম্পর্কিত খুব ভালো অভিমত এসেছে ও আসছে। কিন্তু নারীদের চালক হিসেবে দেখতে আমাদের সমাজ এখনো তৈরি না। তবে সংখ্যা যতই কম হোক না কেন, এই পরিবর্তনটা রাইড শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে আসছে। যেকোনো কাজকে সম্মান করা উচিত এবং যেই করুক না কেন। কারণ কাজে কোনো লজ্জা নেই। ঢাকায় মেয়েদের মোটরসাইকেল রাইডিং ট্রেনিং দিচ্ছে বাংলাদেশে ইয়ামাহা মোটরসাইকেলের অথরাইজড ডিস্ট্রিবিউটর এসিআই মোটরস লিমিটেড। সেখানকার প্রশিক্ষক শুভ জানালেন, প্রশিক্ষণ নেওয়ার সংখ্যায় কিশোরীরা এগিয়ে। এ ছাড়া বিভিন্ন বয়সী নারী বিশেষ করে কর্মজীবী নারীদেরও বেশ সাড়া পান।
তিনি বলেন, শুরুর দিকে ছেলেদের সংখ্যা বাড়লেও এখন মেয়েরাই অনেক বেশি শিখতে আসে। কেউ নিজে চালায় কেউবা চালক হিসেবে রাইড শেয়ারিং পরিবহন সেবায় যুক্ত হয়। সামাজিক ও ধর্মীয় চাপ উপেক্ষা করে প্রশিক্ষণ নিয়ে নারীরা চালক হিসেবে এগিয়ে আসছে। কিন্তু রাইড শেয়ারিং সার্ভিস পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন (বিআরটিএ) কর্র্তৃক তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে নেই নারীযাত্রীদের রাইড শেয়ারিং অ্যাপস ‘লিলি রাইড’। এ বিষয়ে বিআরটিএর বিমলেন্দু চাকমা বলেন, শুধু নারী চালকদের অ্যাপস থেকে আমাদের কাছে কোনো আবেদন আসেনি। আমরাও নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। যদি এ রকম আবেদন আসত, বিষয়টা অবশ্যই ভেবে দেখতাম। বিআরটিএর অনুমোদন নেওয়ার জন্য কেন আবেদন করেননি, সে বিষয়ে লিলি রাইডের সাইফুল্লাহ বলেন, ‘আমরা এখনো কাক্সিক্ষত কলেবরে আসতে পারিনি। নারীদের অংশগ্রহণ যদি আরও অনেক বেড়ে যায়, তখনই আমরা এ বিষয়ে ভাবব। আশা করি সেদিন বেশি দূরে নয়, যখন আমরা পুরুষের সমপর্যায়ে নারী চালকদের নিয়েও কাজ করব।’