৩ ধাপ পিছিয়ে ১৪৬

বাংলাদেশে দুর্নীতি অপরিবর্তিত : টিআই

‘দুর্নীতির ধারণা সূচক’ বাংলাদেশের অবস্থান এবার একধাপ পরিবর্তন হলেও সার্বিক পরিস্থিতি আগের মতোই রয়ে গেছে বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)। জার্মানির বার্লিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা টিআই ‘দুর্নীতির ধারণা সূচক ২০১৯’ অনুযায়ী, সূচকের অধঃক্রম অনুযায়ী (খারাপ থেকে ভালো) এবার বাংলাদেশ ১৪তম স্থান পেয়েছে। আর সূচকের ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী (ভালো থেকে খারাপ) বিশ্বের ১৮০টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এবার ১৪৬ নম্বরে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল তিনধাপ নিচে ১৪৯ নম্বরে। তবে এ বছরও বাংলাদেশ ২৬ স্কোর পেয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সারা বিশ্বে একযোগে ‘দুর্নীতির ধারণা সূচক, ২০১৯’ প্রকাশ করে টিআই। সকালে রাজধানীর ধানম-িতে এক সংবাদ সম্মেলনের প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এবার কয়েকটি দেশ বাংলাদেশের চেয়েও খারাপ স্কোর করেছে। তারা তালিকায় এগিয়ে

 গেছে। কিন্তু বাংলাদেশের স্কোর আগের বছরের মতো অপরিবর্তিত রয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশে আগেরবার যে দুর্নীতি ছিল এখনো সেটাই বহাল আছে। বিষয়টি একই সঙ্গে উদ্বেগ ও হতাশাজনক।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শুদ্ধাচার না থাকা, জবাবদিহি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে রাখা, বড় বড় দুর্নীতিবাজকে আইনের আওতায় না আনার কারণে দুর্নীতির চিত্রে বাংলাদেশের অবস্থানের পরিবর্তন ঘটেনি।’

১৯৯৫ সাল থেকে বৈশ্বিক দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকা প্রকাশ করে আসছে টিআই। ২০০১ সালে বাংলাদেশ এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। ওই বছরই বাংলাদেশ তালিকার শীর্ষ উঠে আসে। টানা পাঁচ বছর এ ধারা অব্যাহত ছিল।

টিআই বলছে, বাংলাদেশের দুর্নীতির চিত্র জানতে আটটি উৎস থেকে তথ্য নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ), ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইইই), ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রোজেক্ট, পলিটিক্যাল রিস্ক সার্ভিসেস (পিআরএস), বার্টসলম্যান ফাউন্ডেশন ট্রান্সফরমেশন ইনডেক্স, ইনফরমেশন হ্যান্ডলিং সার্ভিস (এইচআইএস), বিশ্বব্যাংক ও ভ্যারাটিস অব ডেমোক্রেসি প্রজেক্ট।

টিআইর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দুর্নীতির ধারণা সূচকে সর্বোচ্চ ৮৭ স্কোর পেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ডেনমার্ক ও নিউজিল্যান্ড। ৮৬ স্কোর পেয়ে তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ফিনল্যান্ড, ৮৫ স্কোর নিয়ে তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে আছে সিঙ্গাপুর, সুইডেন ও সুইজারল্যান্ড। ৯ স্কোর পেয়ে তালিকায় গতবারের মতোই তালিকায় সর্বনিম্ন স্থানে রয়েছে আফ্রিকার দেশ সোমালিয়া। ১২ স্কোর নিয়ে তালিকায় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন হয়েছে দক্ষিণ সুদান ও ১৩ স্কোর নিয়ে তৃতীয় সর্বনিম্ন হয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ সিরিয়া। বাংলাদেশের সঙ্গে ১৪তম অবস্থানে রয়েছে অ্যাঙ্গোলা, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, ইরান, মোজাম্বিক ও নাইজেরিয়া।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন ১৬ স্কোর নিয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় শীর্ষ স্থানে রয়েছে আফগানিস্তান। দ্বিতীয় স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ। আর এশিয়ার ৩১ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। সর্বোচ্চ ৬৮ স্কোর নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হয়েছে ভুটান। এরপর রয়েছে ভারত (স্কোর ৪১); বাংলাদেশের মতো দেশটির স্কোরও গতবারের মতো অপরিবর্তিত থাকলেও সূচকে দুধাপ পিছিয়ে ৮০তম হয়েছে। ভারতের পরে দক্ষিণ এশিয়ায় কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হয়েছে শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও পাকিস্তান। পাকিস্তান তালিকায় ১২০তম স্থান পেয়েছে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গত বছর দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের সময় মানুষের মধ্যে একটি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এটা কতটা বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েই গেছে। দুর্নীতির ভালো স্কোর করার মতো আইনি ও কাঠামোগত সক্ষমতা আছে। কিন্তু প্রয়োগের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার জন্যই স্কোরে এগোতে পারছে না বাংলাদেশ। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অনেক উন্নতি করেছে। দুর্নীতি থাকার ফলে এর সুফল মানুষ ঠিকমতো পাচ্ছে না।

সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান টিআইবির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, গতবারের মতো বৈশ্বিক দুর্নীতির তালিকায় ২৬ স্কোর পাওয়ার অর্থ বাংলাদেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা বিরাজ করছে। দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতার কারণে বাংলাদেশের অধিবাসীরা সবাই দুর্নীতি করে এ ধরনের ভুল ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়। যদিও দুর্নীতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য দূরীকরণ সর্বোপরি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিরাট অন্তরায়, তথাপি দেশের আপামর জনতা দুর্নীতিগ্রস্ত নয়। তারা দুর্নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ও ভুক্তভোগী মাত্র।

টিআইবির সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সংস্থাটির উপদেষ্টা (নির্বাহী ব্যবস্থাপনা) সুমাইয়া খায়ের পরিচালক (আউটরিচ কমিউনিকেশন) শেখ মঞ্জুর ই আলম প্রমুখ।