চীনে দেখা দেওয়া করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে দেশের সব সংস্থাকে সতর্ক থাকতে বলেছে সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, মানুষের ভৌগোলিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের মাধ্যমে যেকোনো সময় এই রোগ বাংলাদেশে প্রবেশ করার আশঙ্কার রয়েছে। তাই রোগটি যাতে আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেতে না পারে সে জন্য সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সতর্ক অবস্থায় থাকতে হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় স্বাস্থ্য অধিদেপ্তরের কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে অধিদপ্তর এ সতর্কতা দেয়। সংবাদ সম্মেলনে করোনা ভাইরাসের বিস্তারিত তুলে ধরেন অধিদপ্তরের অতিরিক্ত
মহাপরিচালক ও রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা। সংবাদ সম্মেলনে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা, প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এস এম আলমগীর এবং অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তারসহ বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তারা।
অধিদপ্তর জানায়, করোনা ভাইরাস মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়। এ ছাড়া অনেক ধরনের করোনা ভাইরাস উটসহ বিভিন্ন পশু, বিড়াল, বাদুরের মধ্যে দেখা যায়। প্রাণিদেহে সংক্রমিত করোনা ভাইরাসগুলো সাধারণত মানুষকে আক্রান্ত করে না। চীনের উহান শহরে শনাক্ত হওয়া বেশির ভাগ রোগী শহরের একটি সামুদ্রিক খাবার ও পশুর বাজার থেকে আক্রান্ত হয়েছে। সেখানে যেসব স্বাস্থ্যকর্মী রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন, তাদের কেউ এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। আক্রান্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে কমিউনিটিগুলোতে অন্য কেউ আক্রান্ত হয়নি।
বিশ্ব স্বাস্থ্যর উদ্বেগের কথা তুলে ধরে অধিদপ্তর জানায়, এ ভাইরাসে সীমিত আকারের মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ হতে পারে। এখন পর্যন্ত এই রহস্যজনক ভাইরাসে ১৯৮ জন আক্রান্ত হয়েছে। তিনজন মৃত্যুবরণ করেছে। আক্রান্তদের সবাই চীনের হুবেই প্রদেশের অন্তর্গত উহান শহরেই আক্রান্ত হয়েছে। এ ছাড়া ভ্রমণজনিত কারণে থাইল্যান্ডে দুজন ও জাপানে একজন রোগী শনাক্ত হয়েছে, যারা চীনের উহান শহরে ভ্রমণ করেছিলেন। ফলে অতীতের মার্স করোনা ভাইরাস এবং সার্স করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের ধরন থেকে বলা যায় সামনের দিনগুলোতে এই রোগে আরও মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। অধিদপ্তর করোনা ভাইরাসের লক্ষণ তুলে ধরে জানায়, রোগীর জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও শ্বাসকষ্টের সঙ্গে কাশি হতে পারে।
ভ্রমণসংক্রান্ত পরামর্শে বলা হয়, ভাইরাসটি সম্পূর্ণ নতুন একটি ভাইরাস এবং এর ভয়াবহতা ও বিস্তার সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে জানা এখনো সম্ভব হয়নি। তাই চীন থেকে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ হতে চীনে ভ্রমণকারীদের সম্ভাব্য ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকতে স্বাভাবিক শ্বাসতন্ত্রের প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে কমপক্ষে দুই হাত দূরে থাকতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তি সংস্পর্শে এলে বা সংক্রমণস্থলে ভ্রমণের পর সঙ্গে সঙ্গে সাবান পানি দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে। জীবিত অথবা মৃত গৃহপালিত বা বন্য প্রাণী থেকে দূরে থাকতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে দূরত্ব বজায় রাখা, হাঁচি-কাশির সময় মুখ ঢেকে রাখা, হাত ধোয়া, যেখানে-সেখানে কফ-কাশি না ফেলার পরামর্শ মেনে চলতে হবে।
অধিদপ্তর আরও জানায়, করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে দেশের বিভিন্ন স্থল, নৌ ও বিমানবন্দরগুলোতে সতর্কতা ও রোগের সার্ভিল্যান্স জোরদার করা হয়েছে। ঢাকার হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর এবং সিলেট ও চট্টগ্রামসহ তিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নতুন করোনা ভাইরাস স্ক্রিনিং কাজ চলছে। নতুন ভাইরাস সম্পর্কে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ভাইরাস সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রতিরোধের জন্য রোগ প্রতিরোধসংক্রান্ত প্রচার কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। আক্রান্তদের চিকিৎসায় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ড প্রস্তুত রয়েছে।
অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ১৩ জানুয়ারি থাইল্যান্ডে প্রথম সংক্রমিত রোগী শনাক্ত হয়। ৬১ বছর বয়সী চীনা মহিলা উহান প্রদেশে বাস করেন। ৫ জানুয়ারি তিনি গলা ও মাথাব্যথায় আক্রান্ত হন। ৮ জানুয়ারি পাঁচজন ফ্যামেলি মেম্বরাসহ ১৬ জনের দল নিয়ে থাইল্যান্ড বেড়াতে গেলে সুবর্ণভূমি এয়ারপোর্ট থার্মাাল স্ক্যানে জ্বর ধরা পড়ে। ১৫ জানুয়ারি জাপানে ইম্পোর্টেড কেস শনাক্ত হয়, বয়স ৩০-৩৯ বছর। জাপানে বাস করেন। ডিসেম্বরের শেষ দিকে চীনের উহান শহরে ভ্রমণ করেছেন। ৩ জানুয়ারি জ্বরে আক্রান্ত হন। তিনি সি ফুড মার্কেটে যাননি, এমনকি উহানে কোনো জীবিত পশুর জারেও যাননি। কিন্তু তিনি বলেছেন, তিনি একটি নিউমোনিয়া রোগীর ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এসেছিলেন। ১৭ জানুয়ারি থাইল্যান্ড তৃতীয় ইম্পোর্টেড কেস। ৭৪ বছর বয়সী রোগী চীনের উহান শহরে বাস করেন। সেখান থেকে চীনে যান লুনার নতুন বছরের ছুটি উপলক্ষে।