একটি বিষয় আমাকে অনেক দিন থেকে পীড়া দিচ্ছিল। এবার গেল বিজয় দিবস সূত্রে আরও পীড়িত হলাম। কথাটি বলার আগে একটু সভ্যতার ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিতে চাই। প্রায় সাত হাজার বছর আগে লিখিত প্রথম মহাকাব্য গিলগামেশের দর্শন আমাকে বরাবরই নাড়া দেয়। আমার পীড়িত হওয়ার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। সেই কোনকালে মেসোপটেমিয়ার সুমেরে নাম না জানা কোনো মহাকবি লিখেছিলেন তার মহাকাব্য গিলগামেশ।
সুমেরের উর নগরীর রাজা গিলগামেশ। বীরত্বে তাকে পরাভূত করতে পারে না কেউ। এতে ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়েন স্বর্গের দেব-দেবীরা। সব দেব-দেবীর শক্তি দিয়ে এনকেদু নামে আরেক বীরের জন্ম দেওয়া হয়। পাঠানো হয় গিলগামেশকে হত্যা করার জন্য। অনেক যুদ্ধের পর একসময় দুই বীরের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়ে যায়।
এতে ক্ষুব্ধ হন দেব-দেবীরা। অভিশাপ বর্ষিত হয় এনকেদুর ওপর। অভিশপ্ত এনকেদু গিলগামেশের চোখের সামনে ধুঁকে ধুঁকে মারা যায়। মৃত্যুর এই ভয়ংকর শক্তি দেখে ভাবান্তর হয় গিলগামেশের। মৃত্যুকে জয় করার জন্য বেরিয়ে পড়েন। অমরত্বের সন্ধান পেয়েও যান।
বহু কষ্টে মেলে অমর হওয়ার লতাগুল্ম। কিন্তু বিধির ইশারায় হাতে পেয়েও হারিয়ে ফেলেন অমৃত। এবার নতুন ভাবান্তর হয় গিলগামেশের। বুঝতে পারেন অমরত্ব দেহে নয়Ñ মানুষ অমর হয় তার কর্মে। এরপর মানবতার কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করেন গিলগামেশ। সত্যিই তো এ পথে অমর হওয়া যায়। তাই সাত হাজার বছর পরও গিলগামেশকে আমরা স্মরণ করলাম। কিন্তু আমাদের দেশের নেতা-নেত্রীরা সবাই কর্মে নয়, যেন ছবি টানিয়ে অমর হতে চান।
চারপাশ দেখে প্রশ্ন জাগে ছবির মধ্য দিয়ে কি আমরা বেঁচে থাকতে চাই? ছবি টানিয়েই কি নিজেদের গুরুত্ব প্রকাশ করি? নাকি ছবি টানিয়ে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ঘোষণা দিই। বাংলাদেশে ছবির রাজনীতি বেশ প্রবল। শুনেছি সরকারিভাবে নির্দেশনা আছে, অফিস-আদালতে, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কোন জাতীয় নেতার ছবি টানাতে হবে বা ছবি টানানো যাবে। এ নিয়ম মানলে ঠিক আছে।
জাতির পিতার ছবি তো আমরা অনেক শ্রদ্ধায় টানাবই। মহামান্য রাষ্ট্রপতি এবং সরকার প্রধানের ছবি প্রচলিত বিধিমতে টানাতে হয়। মুশকিল হয় বিভিন্ন জাতীয় দিবস উপলক্ষে পথেঘাটে নানা স্থানে যখন ধুম লেগে যায় ছোট, মাঝারি ও বড় নেতাদের ছবি টানানো দেখে। এসব দেখে খুব দ্বন্দ্বে পড়তে হয়।
যার যার নির্বাচনী এলাকার ব্যানার-ফেস্টুনে এমপির ছবি বড় করে টানানো হয়। তার নিচে কিছুটা ছোট করে তস্য দলীয় নেতা, যার সৌজন্যে ছবি টানানো হয়েছে তার ছবিও পেয়ে যাই। আবার এসব ছবির সঙ্গে যদি নেতা হন আওয়ামী লীগদলীয়, তবে সেই ছবির এক কোণে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবি থাকে। আর স্থানীয় নেতা যদি বিএনপিপন্থি হন, তবে নিজের ছবির একপাশে জিয়াউর রহমান, বেগম জিয়া ও তারেক জিয়ার ছবি যুক্ত করেন।
আমি ভাবি এমন ধারা মহাসমারোহে চলছে কেন! স্থানীয় নেতারা কি মনে করেন এভাবে নিজের সঙ্গে বড় নেতাদের ছবি যুক্ত করলে বা নাম ব্যবহার করলে কেন্দ্রীয় নেতা-নেত্রী খুশি হবেন বা দলের প্রতি অনুরাগের কথা বেশি প্রকাশ পাবে? বাস্তবে কি এর কিছুটা সত্যতা থাকে! তা না হলে অমনভাবে ছবি টানানোর ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আসে না কেন!
দেড় যুগ আগেও আমরা লক্ষ করেছি, বেগম জিয়ার পরে দেশের কর্ণধার করার জন্য তারেক জিয়াকে বিবেচনা করা হয়েছিল। তখন বিএনপির ছাত্র সংগঠনের তরুণদের মুখে সেøাগান তুলে দেওয়া হয়েছিল ‘আগামীর রাষ্ট্রনায়কÑ তারুণ্যের অহংকার তারেক জিয়া।’ এ সময় থেকে তারেক জিয়ার ছবি দেখা যেতে থাকে শহরে-বন্দরে-গঞ্জে সর্বত্র। অনেক সময় বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেছি, বিএনপির শাসন আমলে কোনো কোনো অফিসে জিয়াউর রহমান এবং বেগম জিয়ার পাশে তারেক রহমানের ছবিও টানানো হতো। বুঝতে পারতাম না কোন অধিকার বলে এই ছবি টানানো হতো।
বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের ছবি টানানোর কি সুযোগ আছে? ভেবেছিলাম বিএনপি যেহেতু দলছুট মানুষদের ক্লাব, তাই বিএনপি নেতারা বনেদি রাজনীতির ধরন ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি। এ কারণেই বোধ হয় অমন বালখিল্যতা। কথাটা মনে হলো কয়েক বছর আগে ২৬ মার্চ উপলক্ষে সাভার থেকে জাতীয় স্মৃতিসৌধে যাওয়ার পথে ব্যানার-ফেস্টুনের সজ্জা দেখে। একটি ব্যাপারে সরকারকে প্রসঙ্গক্রমে ধন্যবাদ জানাতে হয়। জাতীয় দিবস উপলক্ষে আগে আমিনবাজার থেকে স্মৃতিসৌধ পর্যন্ত শত শত তোরণ বানানো হতো। অপচয় করা হতো লাখ লাখ টাকা। প্রকাশ পেত সংস্কৃতিবোধের স্থূলতা।
সম্প্রতি এই অপসংস্কৃতি বন্ধ হয়েছে। কিন্তু অতিবুদ্ধিমানরা এই জায়গাটি পূরণ করে দিয়েছে রঙিন ব্যানার-ফেস্টুনে। এসবের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জায়গা করে নিয়েছে এমপিদের ছবি। এর সঙ্গে অবশ্যই যুক্ত হচ্ছে সৌজন্য প্রকাশকারী স্থানীয় ছোট-বড় নেতার ছবি।
দেখে মনে প্রবোধ দিলাম, স্থানীয় নেতারা ছবি ব্যবহার করে নিজেদের প্রচারে রাখতে চান। এই পথ দিয়ে তো প্রধানমন্ত্রী স্মৃতিসৌধে গিয়েছেন। তার চোখে নিশ্চয়ই ছবিগুলো দৃশ্যমান হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর আধুনিক মনস্কতা ও সংস্কৃতিবোধ সম্বন্ধে আমার সন্দেহ নেই। ধারণা করছি, এসব ছবি টানানো তার কাছেও বাতুলতা মনে হয়েছে।
সংস্কৃতবান মানুষ ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দেন না। শুধু ব্যক্তির নয়, রাষ্ট্রেরও আভিজাত্য থাকা চাই।
হাজার বছর ধরে আমাদের পূর্ব পুরুষ উজ্জ্বল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গড়ে তুলেছেন এ দেশে। অমন একটি দেশের মানুষের ভাবনায়, চলনে একটি ভিন্নমাত্রার পরিশীলন থাকবে, এটি সবারই কাম্য। বঙ্গবন্ধুর বিশাল অর্জনকে পারিবারিকভাবে হলেও খাটো করা হবে। এবারও বিজয় দিবসে আমিনবাজার থেকে স্মৃতিসৌধ পর্যন্ত লাখ লাখ রঙিন ছবিতে সয়লাব ছিল। সবচেয়ে বড় কথা ছবি প্রদর্শনের
সংস্কৃতি থেকে বেরোনোর পথ তৈরি করতে হবে। মাঝেমধ্যে নীতিমালার কথা শোনা যায়। অবশ্যই রাষ্ট্রীয়ভাবে নীতিমালা থাকা চাই। রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় নেতা-নেত্রীদের কোন পর্যায় পর্যন্ত ছবি কোথায় কতটুকু টানানো যাবে, তা স্পষ্ট করা উচিত।
আমি এক স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘আপনারা এমন প্রতিযোগিতা দিয়ে নেতাদের ছবি টানান কীসের ভিত্তিতে?’ তিনি বললেন, ‘স্যার, সাধে কি আর এ কাজ করি! প্রয়োজনেই করতে হয়। আমাদের ভেতরেও তো নানা দল, উপ-দল কোন্দল আছে। কে কতটা ছবি কত গুরুত্ব দিয়ে প্রদর্শন করতে পেরেছে, তা দিয়ে দলের প্রতি অনুরাগের মাত্রা মাপা হয়। বলুন দেখি কে চায় প্রতিযোগিতায় নিজেকে পিছিয়ে রাখতে?’
আমি শুনে মনস্তাপ করলাম, হায় আল্লাহ! কথাটি যদি সত্য হয়, তবে বলতে হবে আওয়ামী লীগও শেষ পর্যন্ত এমন মানসিক অবস্থায় এসে পৌঁছেছে! তাহলে তো প্রাজ্ঞজনের কথায় সুর মিলিয়ে বলতে হবে, ‘রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতছাড়া হওয়ার পর থেকে রাজনীতিতে ঘোর অমানিশা নেমেছে’।
লেখক
অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
shahnawaz7b@gmail.co