পাবলিক বিল্ডিংয়ের সামনের অংশ খোলামেলা থাকবে নাকি দেয়াল/গ্রিল/গেইট দিয়ে বন্ধ করা হবে তা নিয়ে নানা মত নানাজনের। খোলা রাখলে অনেক মানুষ আসেন, বসেন, গল্প করেন, সবাই খুশি হয়, সুন্দর পরিবেশ তৈরি হয়। কিন্তু যারা গেইট/প্রাচীর দিয়ে বন্ধ করেন, তারা বলেন নিরাপত্তার কথা। নূর মসজিদে এই ইস্যুটি সামলানো হয়েছে বেশ সুন্দরভাবে। এখানে ঢোকার সিঁড়িগুলো বলতে গেলে প্রায় পুরো খোলা, নামকা ওয়াস্তে কিছু নিচু বেড়াসদৃশ গেট আছে, যা সারা দিন খোলাই থাকে (সম্ভবত রাস্তার কুকুর বেড়াল, গবাদিপশু যাতে মসজিদে ঢুকে না পড়ে সে জন্য, মানুষকে বাধা দেওয়ার জন্য না)। ভবনটি দেখতে আপন-আপন লাগে, মনে হয় সিঁড়ি বেয়ে পায়ে পায়ে ভেতরে যাই। একবারে পুরোটা দেখা যায় না। নিচু গেইট পেরিয়ে কয়েক ধাপ ওঠার পর বামে ঘুরে ওপরে উঠে গেছে সিঁড়ি, তারপর চোখে পড়ে একটা ছোট খোলা ছাদ, সেখান থেকে ডানে মূল ভবনৃ এভাবে স্তরে স্তরে বিল্ডিংটি নতুন মেহমানের কাছে উন্মোচিত হয়। এরকম বামে ডানে ভাঁজ থাকার কারণে, পুরো খোলা হওয়া সত্যেও মানুষ বুঝতে পারে এটা খোলা ময়দান না, আমি কোনো একটা বিশেষ এলাকার ভেতর প্রবেশ করছি।
২০১৭ সাল থেকে এই মসজিদ এরকম আছে, এখন পর্যন্ত খোলা থাকার কারণে নিরাপত্তা নিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি। ২০১০ সালে, কাঁচপুর ব্রিজ থেকে চল্লিশ মিনিট দূরত্বে, মহাসড়কের ঢালে মাঝের-চর বাজারের পাশে ৬ কাঠা জমির ওপর বর্তমান ভবনটি প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা শুরু করেন মরহুম অ্যাডভোকেট মুহাম্মাদ লুতফুর রহমান আর শারিফা রুখসানা রহমান (যদিও এর অনেক আগে, ১৯৯৮ সালে একটি টিনশেড ঘর দিয়ে এই মসজিদের যাত্রা শুরু)। ভবনটি ডিজাইন করেন স্থপতি শোয়েব ভূইয়া।
এই স্থপতির কাজের ধরন ছিল অন্য রকম তিনি প্রায় সাত বছর ধরে, ধাপে ধাপে এই ছোট মসজিদটির ডিজাইনের কাজ করেন। স্থপতি ঢাকার অফিস থেকে বড় বড় প্ল্যান এঁকে নিয়ে সাইটে আসতেন। তারপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা- মাঝেমধ্যে সারা দিন, থাকতেন। মালিক পক্ষ, ব্যবহারকারী, প্রতিবেশী সবার সঙ্গে কথা বলতেন– আর নিজের আনা প্ল্যানগুলোর ওপর আঁকিবুঁকি করে পরিবর্তন পরিবর্ধন করতে থাকতেন, যাতে সবার কথার মূল্য থাকে। ফলে এই মসজিদটি অন্যরকম ভিন্নতাযুক্ত এবং আধুনিক হওয়া সত্ত্বেও মনে হয় এই আধা-গ্রাম এলাকার একান্ত আপনজন। উপরন্তু মসজিদের প্রবেশপথ ডিজাইন করার সময়ে যেমন এক সঙ্গে দুই কূল রক্ষা হয়েছে- খোলামেলা ভাবও আছে আবার নিরাপত্তাও আছে– এরকমটি হয়েছে আরও কিছু ক্ষেত্রেও। যেমন ধরুন, ছয় তলা উচ্চতার হওয়া সত্যেও গ্রামীণ পরিবেশে এটাকে বেঢপ উঁচু মনে হয় না– কারণ ভবনের মূল এন্ট্রি দোতলা দিয়ে (যেমন বাইতুল মোকাররম মসজিদে, অথবা শাহবাগের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে) এবং আরও কিছু স্থাপত্যিক কৌশলের কারণে এটিকে তিন-চার তলার বেশি উঁচু মনে হয় না আশপাশের মাঠ, মরা-নদী, গাছপালা, ঘরবাড়ির সঙ্গে মানিয়ে যায়।
ভিন্নতার আরকটি কারণ হচ্ছে এখানে কোনো গম্বুজ, মিনার অথবা মসজিদের মতো দেখতে জানালা নেই। জানালাগুলো চারকোনা আর কংক্রিটের ‘সাদা পর্দা’ লাগানো। তা সত্যেও বিল্ডিংটিকে মসজিদ হিসেবে চিনতে কারও অসুবিধা হয় না কারণ এর বাইরের দেয়ালজুড়ে পলেস্তারার ভেতর গেঁথে আছে সারি সারি সুন্দর আরবি হরফে লেখা ‘ক্যালিগ্রাফি’। একদম ওপরের দিকে আল্লাহু এবং মুহাম্মাদ (সা.) লেখা আছে। তাছাড়া ভেতরে মিহরাবের অংশেও আরবি ক্যালিগ্রাফি আছে। এ কাজগুলো করেছেন শিল্পী মোসাদ্দেক সাদী আর ভাস্কর রনি। এসব কাজে সার্বিক নির্দেশনা দিয়েছেন শিল্পী ওয়াকিলুর রহমান। স্থপতি আর শিল্পী মিলে যৌথভাবে কাজ করার একটি সফল নিদর্শন হচ্ছে এই ভবন। তবে নতুনত্ব থাকা সত্যেও ভবনটি অভূতপূর্ব নয়। কারণ স্থপতি নতুন ফর্মের ভেতর পরিচিত চিরচেনা ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করেছেন– সাদা মোজাইক ফ্লোর, প্লাস্টার করা দেয়ালে সাদা রং, অ্যালুমিনিয়ামের জানালা, সাদা স্বচ্ছ কাঁচ ইত্যাদি। কোথাও কোনো মহামূল্যবান উপাদানের বাহুল্য নেই, এবং দৈনন্দিন ব্যবহারে নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় নেই।
প্রবেশের সিঁড়িগুলোর এক দিকে লাইব্রেরি ও অন্যান্য সেবার ব্যবস্থা (টয়লেট-বাথরুম ইত্যাদি)। নিচতলায় আছে একটি কম্যুনিটি হল, যা মেয়েদের নামাজের জায়গা হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। নিচতলায় যাওয়ার আলাদা গেইট আছে। পেছনে আছে মেহমান থাকার রুম। দোতলায় খোলা ছাদে কংক্রিটের বেঞ্চ আছে যেটায় বসে নদী দেখা যায়। এর পাশে আছে মসজিদের মূল ভবনের তলায় চারদিক খোলা একটা বারান্দার মতো রুম। এখনে তাবলিগের মেহমানরা থাকতে পারেন। এর এক পাশে গেলে ওজুর জায়গা। আরেক দিক দিয়ে সিঁড়ি উঠে গেছে। এরপর একের পর এক তিন ফ্লোর মূল নামাজের জায়গা। ওপরের ফ্লোরগুলোতে যাওয়ার পথটি নিচের মূল নামাজের ফ্লোরের সঙ্গে সংযুক্ত, ইমাম সাহেব খেয়াল রাখতে পারেন সবার দিকে। নামাজের জায়গাগুলোর চারপাশে কংক্রিটের পর্দাযুক্ত জানালাগুলো দিয়ে সুন্দর আলোর আভা আসে। এই ফ্লোরগুলো মক্তব হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। ছাদেও নামাজ পড়ার সুন্দর ব্যবস্থা আছে। আমাদের দেশের রোদ বৃষ্টি ঝড় এসবের কথা মাথায় ছিল স্থপতির। রাতের বেলায় আলো জ্বালানো অবস্থায় মসজিদটিকে সুন্দর দেখা যায়। তবে এখানে হুইল চেয়ার নিয়ে কেউ এলে তার জন্য ওপরের ফ্লোরে যাওয়া কষ্টকর হবে, যেহেতু র্যাম্প বা লিফটের ব্যবস্থা নেই। আরেকটি ব্যাপার, মসজিদের পাশেই ব্রহ্মপুত্র নদী যেটি এখন মৃতপ্রায় এবং এর পানি দূষিত এবং কালো। এই মরা নদীটি একটি অন্য ধরনের উপলব্ধি দেয়। তা হচ্ছে, দেশের মাঠ-ঘাট-বন-নদী যদি দূষিত এবং মৃতপ্রায় হয়, তাহলে বিচ্ছিন্ন সুন্দর বিল্ডিং তৈরি করে লাভ কি? এমন কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্থপতিরা অসহায়।
কাঁচপুর ব্রিজ থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে মদনপুর মোড়। তারপর বামে ঘুরে বস্তাইল-মদনপুর সড়ক ধরে দশ কিলোমিটার পর একটা ছোট ব্রিজে ওঠার মুখে মাঝের-চর বাজার। এখানে থেমে বামে তাকালে সড়কের ঢালে সামান্য দূরে এই মসজিদ চোখে পড়বে। এই নূর মসজিদে একত্রে সর্বোচ্চ ৫০০ জন নামাজ পড়তে পারেন।
বাইতুল আফতাব-নূর জামে মসজিদের স্থপতি শোয়েব ভূইয়া বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৫ সালে স্থাপত্য শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এখন ঢাকার ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক-এর শিক্ষক। তার ডিজাইন হাউজের নাম ‘ভাস্তু’।
লেখক : স্থপতি ও সহকারি অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, ইউনির্ভাসিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক
ছবি তুলেছেন : জিমি চাকমা, সামিন রহমান, নিশাত তাসনিম