আহমেদ মুনীরুদ্দিন : বাংলাদেশের আধুনিক স্থাপত্য শিক্ষার শুরুটা কীভাবে হলো? এখন স্থাপত্য শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক প্রসার কতটা হয়েছে? এ বিষয়ে একটা সংক্ষিপ্ত ধারণা চাই।
আবু সাঈদ এম আহমেদ : এ দেশে আধুনিক কারিগরি শিক্ষার শুরু হয় আহছানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের মধ্যে দিয়ে, পাকিস্তান আমলে। ১৯৬২ সালে এই কলেজটাই প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়; যা আজকের বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা ‘বুয়েট’। দুটো অনুষদ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি যাত্রা শুরু করল প্রকৌশল অনুষদ এবং স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনা অনুষদ/বিভাগ। আগে শুধু সিভিল, মেকানিক্যাল ও ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এসব বিভাগ ছিল। তখন স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনা বিভাগ চালু হলো। ফার্স্ট ব্যাচ গ্র্যাজুয়েশন করল ১৯৬৯-৭০ সালে। বুয়েটের প্রায় ৩০ বছর পর ১৯৯১ সালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রম শুরু হলো। স্বাধীন বাংলাদেশে আরেকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা স্থাপত্য বিভাগ পেলাম। ১৯৯৫ সালে আহছানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি, ১৯৯৬ সালে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের মতো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হলো স্থাপত্য বিভাগসহ। সে সময় থেকে ধীরে ধীরে আরও অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য পড়ানো হচ্ছে। সব মিলিয়ে এখন প্রায় ২৭টি পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য শিক্ষা পাচ্ছে দেশের ছাত্রছাত্রীরা। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই ২৭টির মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি স্থাপত্য বিভাগই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে।
আধুনিক স্থাপত্য শিক্ষার শুরু হয়েছিল প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমেরিকার ‘টেক্সাস এ অ্যান্ড এম’ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কোলাবোরাশনে। টেক্সাস এ অ্যান্ড এম থেকে কিছু আমেরিকান প্রফেসর ঢাকায় আসেন আর্কিটেকচার পড়াতে। আর বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কিছু শিক্ষককে সেখানে নিয়ে গিয়ে আর্কিটেকচারে দুই-আড়াই বছরের শর্ট কোর্স করিয়ে আনা হয়। অর্থাৎ শুরুটা হয়েছিল স্থাপত্যবিদ্যার আমেরিকান অধ্যাপক এবং দেশের শিক্ষকদের বিদেশ থেকে উচ্চতর প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে। কিন্তু এখন দেশের এতগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য শিক্ষার জন্য উচ্চতর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও মানসম্মত শিক্ষকের একটা সংকট দেখা যাচ্ছে।
আহমেদ মুনীরুদ্দিন : অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য বিভাগ চালু হওয়ায় কী ধরনের সুবিধা বা অসুবিধা হচ্ছে? দেশে স্থাপত্য শিক্ষার মান এখন কেমন? সংকট আর সম্ভাবনাগুলো বলুন।
আবু সাঈদ এম আহমেদ : পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রয়োজনীয় যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের সংকটে ভুগছে। স্থপতিরা যেহেতু প্র্যাকটিসিং আর্কিটেক্ট হিসেবে কাজ করতে চান তাই সুযোগ-সুবিধার অপ্রতুলতা এবং ঢাকার বাইরে যেতে না চাওয়ার কারণেও অনেক সময় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষক পায় না। কিন্তু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বেশিরভাগই ঢাকায় হওয়ায় এবং তাদের পর্যাপ্ত অর্থ থাকায় তারা ভালো শিক্ষকদের টেনে নিতে পারছে। অন্যদিকে স্থাপত্য শিক্ষায় বড় স্পেস লাগে, স্টুডিও ফ্যাসিলিটি লাগে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এর অভাব না থাকলেও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সবসময়ই পর্যাপ্ত স্থানের অভাবে থাকে।
স্থাপত্য শিক্ষার মানের বিষয়ে যদি বলি, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য বিভাগ থাকায় একটি সুবিধা হচ্ছে যে, একেকটা বিশ্ববিদ্যালয় একেক স্পেশালাইজেশনের দিকে যেতে পারছে। স্কুলগুলোর ফিলোসফির কথা ধরুন। প্রথম যখন বুয়েট শুরু হলো, সেটা এমন একটা স্কুল হলো যেখানে তারা স্টুডেন্টদের ‘জ্যাক অব অল ট্রেড’ বানানোর চেষ্টা করেছে। একজন আর্কিটেক্টকে ওভারঅল সব বিষয়ে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এখন যখন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় শুরু হলো। ওরা স্কিল ডেভেলপ করার ওপর জোর দিল। ওরা ভাবল আমাদের ছেলেমেয়েরা যাতে পাস করে ঢাকায় গিয়ে চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারে। এভাবে খুলনার স্টুডেন্টরা দ্রুত চাকরির বাজার দখল করে নিতে লাগল আর বুয়েটের স্টুডেন্টরা ভাবল আমরা ডিজাইনার। এর অর্থ হলো একেকটা স্কুল একেকটা ভিশন নিয়ে কাজ করছে। এখন যেমন কিছু স্কুলের ছেলেমেয়েরা লো-কস্ট হাউজিং নিয়ে কাজ করতে পারছে। কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আবার ডিজিটালি খুবই অ্যাডভান্সড, ওরা নানা হাইটেক-প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করছে। কিছু আবার আরবান প্ল্যানিং নিয়ে জোর দিচ্ছে। কেউ কেউ আর্কিটেকচারের হিস্ট্রি-থিওরি নিয়ে জোর দিচ্ছে। এই যে বৈচিত্র্য তৈরি হলো এটা সম্ভব হয়েছে স্কুলের সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে।
আহমেদ মুনীরুদ্দিন : ১৯৪৭ সালের দেশভাগে পাকিস্তান নামে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলো। নতুন রাষ্ট্র, নতুন রাজধানীতে কি রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ও নতুন সব পাবলিক বিল্ডিংয়ের সূত্র ধরে স্থাপত্য শিল্পে কোনো জোয়ার এসেছিল? আধুনিক স্থাপত্য চর্চার ধারা কি তখনই শুরু হলো? তখন কারা এ দেশে কাজ করেছেন? সে সময়ের কিছু উল্লেখযোগ্য কাজ সম্পর্কে বলুন।
আবু সাঈদ এম আহমেদ : আমি মনে করি জাতি হিসেবে আমরা বাঙালিরা ভাগ্যবান। অনেক ক্ষেত্রেই ভাগ্য আমাদের সহায় হয়েছে। ’৪৭ সালে কলোনির শাসন শেষ হলো। এর পরপরই একজন বাঙালি স্থপতি বিদেশে লেখাপড়া শেষ করে দেশে ফিরে স্থাপত্য চর্চা শুরু করলেন, স্থপতি মাজহারুল ইসলাম। ১৯৫২ সালে তিনি সরকারি চাকরিতে ঢুকেই প্রথমে যে কাজটি করলেন সেটা ঢাকা আর্ট কলেজ, এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ ভবন, ১৯৫৩ সালে নির্মাণকাজ শুরু হলো। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে এই আর্ট কলেজ ছিল এ দেশে আধুনিকতার সূচনা। যে ভবনে কলোনিয়াল স্থাপত্যের মতো করিন্থিয়ান কলাম নাই, বিশাল এন্ট্রি নাই, এমনকি বিল্ডিংয়ের ওরিয়েন্টেশনও উত্তর-দক্ষিণে করা যেন পর্যাপ্ত আলো-বাতাস আসে। কলোনির ওরা অনেক সময়ই এমনকি স্থানীয় জলবায়ুকেও আমলে নিত না। সব ভবনই করত পশ্চিম দিকে মুখ করা।
আহমেদ মুনীরুদ্দিন : নির্মাণকালের বিবেচনায় স্থপতি মাজহারুল ইসলামের করা বর্তমান চারুকলা অনুষদ ভবনটিকে তো শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ারই পাবলিক আর্কিটেকচার বা পাবলিক বিল্ডিং হিসেবে প্রথম আধুনিক স্থাপত্য বলে দাবি করছেন অনেকে? ২০১৬ সালে চারুকলা ভবনের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ভবনটির রক্ষণাবেক্ষণ তদারকি করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের মধ্যে একটা চুক্তি স্বাক্ষর হয়। আপনি তো তখন স্থপতি ইনস্টিটিউটের সভাপতি ছিলেন?
আবু সাঈদ এম আহমেদ : আসলেই তাই। চারুকলার এই ভবন শুধু বাংলাদেশে নয়, দক্ষিণ এশিয়াতেই আধুনিকতার একটি সূচনাবিন্দু। আর চারুকলা ভবনটি কীভাবে রক্ষণাবেক্ষণ হবে এবং ভবিষ্যতে চারুকলা অঙ্গনে আর কী ধরনের স্থাপত্য নির্মাণ হতে পারে সেসব বিষয়ে পরামর্শক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কাজ করবে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট। বিদায়ী সভাপতি হিসেবে সেটা ছিল আমাদের কমিটির শেষ কাজ।
আহমেদ মুনীরুদ্দিন : আপনি বলছিলেন, নতুন রাষ্ট্রের সূচনালগ্নেই স্থপতি মাজহারুল ইসলামের করা চারুকলা ভবন আধুনিকতার সূচনা করায় বাংলাদেশের নতুন স্থাপত্য দারুণভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিল। সে সময় আর কী হলো আর কারা কাজ করলেন?
আবু সাঈদ এম আহমেদ : এর মধ্য দিয়ে আসলে যা হলো কলোনিয়াল বা উপনিবেশিক স্থাপত্যধারাকে মাজহারুল ইসলাম প্রত্যাখ্যান করলেন এবং একই সঙ্গে তিনি ইসলামিক স্থাপত্যের যে ধারার দিকে পশ্চিম পাকিস্তানিরা ঝুঁকে পড়েছিল সেটিকেও তিনি প্রত্যাখ্যান করলেন। বরং আমাদের নিরক্ষীয় জলবায়ু, নিসর্গ ও পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে আধুনিক স্থাপত্যধারার অনুসরণ করলেন তিনি। চারুকলা ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সেখানকার বিশাল গোল পুকুরটিকে ভরাট না করে সেটাকে অর্ধবৃত্তাকার করে কিছুটা ঘিরে উত্তর-দক্ষিণে লম্বালম্বি ভবন তৈরি করলেন। যাতে বছরের বেশিরভাগ সময় দক্ষিণ দিক থেকে প্রচুর আলো-বাতাস পাওয়া যায়। ভবনটি চারদিকেই খোলামেলা, নানা দিক দিয়ে প্রবেশ করা যায়, বেরোনো যায়। এমন অনেক বৈশিষ্ট্যের কারণেই এটি আমাদের জলবায়ু উপযোগী একটি অনবদ্য আধুনিক স্থাপত্য। স্থপতি মাজহারুল ইসলাম একই সঙ্গে খুবই উদ্যমী ও ভালো সংগঠক ছিলেন। তিনি সে সময়েই পশ্চিমের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ স্থপতিকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নিয়ে আসেন বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য। তিনি নিজে তার সহপাঠী-বন্ধু স্ট্যানলি টাইগারম্যানের সঙ্গে মিলে পাঁচটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের নকশা করলেন। আসলেন পল রুডলফ ময়মনসিংহের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্পের জন্য। সেকালের পশ্চিমা আধুনিক ধারার এরকম আরও কয়েকজন স্থপতি তখন পূর্ব পাকিস্তানে কাজ করেন। বুয়েট যখন শুরু হয় তখন সেখনে আসা কয়েকজন অধ্যাপকও এতে ভূমিকা রাখেন। কাছাকাছি সময়ে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, নটর ডেম কলেজসহ এরকম অনেকগুলো কাজ হলো। যার সবই আধুনিক স্থাপত্যধারার। দেশি-বিদেশি মিলিয়ে সেই সময়টা আমাদের দেশের স্থাপত্য শিল্পের একটা ভিত্তিযুগ বলা যায়। স্থপতি মাজহারুল ইসলাম, পল রুডলফ, স্ট্যানলি টাইগারম্যান, কনস্তানতিনোস দক্সিয়াদিস, রবার্ট বোয়ি, বব বুই, রিচার্ড নয়ট্রা, রিচার্ড ভ্রুম্যানরা তখন কাজ করেছেন। এখানে বিশেষত দক্সিয়াদিস ছিলেন ট্রপিক্যাল ক্লাইমেটের বিশেষজ্ঞ স্থপতি, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি নকশা করেছেন। এর পরপরই সেকেন্ড ক্যাপিটাল প্রকল্পে বিশ্বখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের এ দেশে আসাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় সংসদ ভবনের মতো এত বড় একটা মাস্টারপিস এখনো বাংলাদেশের স্থপতিদের নিরন্তর প্রেরণার উৎস হয়ে আছে। এই সবকিছু মিলিয়েই উপনিবেশিক স্থাপত্য এবং ইসলামি স্থাপত্যধারা দুটোই প্রত্যাখ্যান করে আমাদের স্থপতিদের জন্য নিজস্ব স্থাপত্যভাষার অনুসন্ধানের পথ করে দিয়েছিল।
আহমেদ মুনীরুদ্দিন : স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের স্থাপত্যচর্চা কি কোনো নতুন মোড় নিয়েছিল?
আবু সাঈদ এম আহমেদ : এখানে একটা কথা বলে নেওয়া দরকার। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে স্থাপত্যের যে চর্চা শুরু হয়েছিল সেটা কিন্তু আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও পূর্বাপর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারেনি। একাত্তর থেকে পঁচাত্তর পর্যন্ত তো বাংলাদেশ যুদ্ধ আর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন-রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়েই গেল। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দেশ চলে গেল সামরিক শাসনের অধীনে। ১৯৭৮ সালের দিকে জিয়াউর রহমান ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’ বলে রাজনীতিতে থিতু হলেন। সেই সময়টার পরই মূলত আবার নতুন করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতি পেল। আর্কিটেকচারাল একটিভিটিসও শুরু হলো। কারওয়ানবাজার ডেভেলপমেন্ট হলো, মতিঝিলে নতুন বাণিজ্যিক এলাকা গড়ে উঠতে লাগল। শিল্প ব্যাংক ভবন উঠল। জনতা ব্যাংক ভবন, কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন ভবন হলো। ১৯৭৮ থেকে ’৮৫-৮৬ সাল পর্যন্ত ঢাকায় হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের একটা বুম হলো বলতে পারেন। এটা একভাবে ’৯০ সাল পর্যন্ত চলতে থাকল। নব্বই দশকের পর আরেকটা পর্বে প্রবেশ করল। গুলশান-বনানীসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে এ সময়ে অনেক বড় বিল্ডিং হয়েছে।
আহমেদ মুনীরুদ্দিন : নব্বইয়ের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা শুরু হলো। রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এ সময় নতুন গতি আসে। এসব পেরিয়ে এসে আজকের বাংলাদেশের সমকালীন স্থাপত্যচর্চার মূল প্রবণতা বা ধারাগুলো কেমন ও কী কী বলে মনে হয় আপনার? এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই।
আবু সাঈদ এম আহমেদ : সমকালীন স্থাপত্যধারার কথা বললে মোটা দাগে তিনটা ধারাকে সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়। একটা ধারা পশ্চিমা ট্রেন্ডের হাইটেক বিল্ডিং বানাচ্ছে। একটা ধারা আধুনিক চিন্তার প্রতিফলন ঘটালেও নকশা থেকে শুরু করে নির্মাণসামগ্রীতে যতটা সম্ভব ঐতিহ্য ও দেশজ উপকরণ ব্যবহার করে স্থানীয় পরিবেশ-প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে কাজ করছেন। আরেকটা ধারা আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের চেয়েও স্থাপত্যের নান্দনিকতার দিকে বেশি জোর দিয়ে কাজ করছেন। কিছু স্থপতি জলবায়ু, পরিবেশ-প্রতিবেশ, সামাজিক শ্রেণি এবং স্থানীয় ভূগোলের বিশেষায়িত চাহিদা পূরণ করা বা এমন বিভিন্ন চিন্তাকে প্রাধান্য দিয়েও কাজ করছেন। বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রবণতা এবং উচ্চপ্রযুক্তি ব্যবহার করে যারা কাজ করছেন তারা গ্রামীণফোনের অফিস বা জিপি হাউজের মতো অত্যাধুনিক বিল্ডিং, প্রচুর স্টিল-গ্লাসসহ নানা বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল তারা ব্যবহার করছেন। এ স্থপতিরা ইন্টারন্যাশনাল ট্রেন্ডের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করছেন। এরও ইতিবাচক-নেতিবাচক নানা দিক রয়েছে। মুস্তাফা খালিদ পলাশ, মোহাম্মদ ফয়েজুল্লাহ, এহসান খানসহ এ ধারায় এখন আরও অনেক স্থপতিরা কাজ করছেন। কিন্তু এখানে একটা কথা বলতে পারি যে, ধরুন পলাশরা যদি আরও ১৫ বছর আগে বসুন্ধরা সিটির মতো এত বড় প্রকল্প করার সাহস না করত, তাহলে আজকে দেশের এই স্থাপত্যের বাজার বিদেশি স্থপতিদের হাতে চলে যেত। কিন্তু এখন দেশের এমন সব বিল্ডিংই এই দেশের স্থপতিরা নকশা করছেন, তারাই বানাচ্ছেন।
আরেকটি ধারা যারা ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মিশেলে কাজ করছেন তারা ব্রিক বা ইট-বালু-কাঠ ও অন্যান্য স্থানীয় উপকরণ নিয়েই বেশি কাজ করেন। নকশা ও নির্মাণের ক্ষেত্রেও তারা নানারকম নিরীক্ষা করছেন। এরা চেষ্টা করেন স্থাপত্যকে দেশের জলবায়ু-পরিবশ ও সংস্কৃতির সাপেক্ষে বিবেচনা করতে। এ সময়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থপতি বশিরুল হকের হাত ধরে এ ধারার চর্চায় অনেক স্থপতি কাজ করে যাচ্ছেন। নাহাস খলিল, সাইফ উল হকসহ এ ধারায় উল্লেখযোগ্য অনেক স্থপতি কাজ করছেন। শহরের পাশাপাশি গ্রাম বা বিভিন্ন লোকেশনে কাজ করছেন। এমনকি মাটি-কাঠ-বাঁশসহ একেবারে স্থানীয় উপাদান নিয়েও কাজ করছেন।
এই দুই গ্রুপের মাঝামাঝি আরেকটা গ্রুপ আছে যারা স্থাপত্যকে একটা আর্ট ফর্ম হিসেবেই দেখতে চান বা দেখেন। তারা কখনো হয়তো আরবান কোলাজ তৈরি করেন। কখনো বিল্ডিংয়ের গায়ে আলুকাবান-এসএস আবার কখনো রেডব্রিক-কংক্রিট এসবকিছু মিলিয়ে এক ধরনের কম্পোজিশনের মতো করে স্থাপত্যিক নকশা করছেন, ভবন বানাচ্ছেন। নানা ধরনের নির্মাণ উপকরণের, স্থানীয় ও বিদেশি নানা উপকরণের মিশেলে এরা কাজ করছেন। রফিক আজম, প্যাট্রিক ডি রোজারিওসহ এই গ্রুপটাও এখন বেশ বড়। অবশ্য রফিক আজম এখন প্রকৃতির সবুজ ও জল নিয়ে অনেক বেশি নিমগ্ন হয়ে কাজ করছেন।
আহমেদ মুনীরুদ্দিন : এখন আমরা একটা ধারণার কথা প্রায়ই শুনছি। কখনো শুনছি একটা কারখানা হয়েছে সেটা গ্রিন বিল্ডিং, কখনো শুনছি একটা অফিস ভবন গ্রিন বিল্ডিং। এই সবুজস্থাপত্য বা গ্রিনবিল্ডিং বিষয়টি আসলে কী? কী হলে একটা ভবনকে আমরা গ্রিন বিল্ডিং বা সবুজ স্থাপত্য বলব? আমাদের দেশে সবুজস্থাপত্যের চর্চার কথা জানতে চাই।
আবু সাঈদ এম আহমেদ : অনেস্টলি বলি, আসলে আমাদের দেশে স্থানীয় যে চর্চা ছিল তাতে সব স্থাপনাই তো সবুজ স্থাপনা ছিল। ধরুন গ্রামের একটা কুঁড়েঘরকে কী বলবেন? সবুজ কাকে বলব? প্রচুর আলো-বাতাস থাকবে, ঘর বানানোই হতো আলো-বাতাসের গতিমুখ দেখে। তারপর ছাদটা একটু চওড়া করে নামিয়ে দেওয়া হতো যাতে দেয়াল রোদে পুড়ে বেশি তাপ শুষে না নেয়। আসলে এখন গ্রিন বলে যা কিছু বলা হচ্ছে সবই এখানে চর্চা ছিল। মুশকিল হয়েছে বড় আকারে বড় বড় দালান বানাতে গিয়ে আমরা নতুন জটিলতায় প্রবেশ করেছি। সত্যি বললে বলা যায় এটা একটা ব্যবসায়িক টার্ম বটে। এই ধরুন ইউএসজিবিসি বা ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কোড। এরা প্রথমে ভবনে গ্লাস আর স্টিল বসিয়েছে; এখন বলছে যে তুমি সূর্যের আলো আনো ভবনের ভেতরে। কীভাবে আনতে হবে? সরাসরি সূর্যের আলো না এনে তিন লেয়ারে গ্লাস বসিয়ে তারপর আনো। এরা বলেও দিচ্ছে যে ওই গ্লাসটা আনলে তুমি বেস্ট রেটিং পাবা। বিষয়টা আসলে নিজেই দেয়াল তৈরি করে সেই দেয়াল ভাঙার মতো। নিজস্ব জলবায়ু ও পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নকশা করলে এবং কীভাবে জ্বালানি সাশ্রয় হবে সেসব আগে থেকে ভাবলে আলাদা করে গ্রিন বিল্ডিংয়ের কথা ভাবার দরকার হতো না। আরেকটা বিষয় হলো গ্রিন বিল্ডিং কোড হতে হবে স্থানীয়, আমার দেশের ক্ষেত্রে সেটা হতে হবে আমার জলবায়ু-ভূপ্রকৃতি অনুযায়ী, আমেরিকান স্ট্যান্ডার্ড এনে এখানে বসালে হবে না। এখন আমাদের এখানে রংপুরের কারুপণ্যের কারখানা একটা ভালো গ্রিন বিল্ডিং কিন্তু সেটা ওদের স্ট্যান্ডার্ডে কী সেটা আমি জানি না।
আহমেদ মুনীরুদ্দিন : বিগত কয়েক দশক ধরে দেশে দ্রুতগতিতে নগরায়ণ হচ্ছে। আবাসিক এলাকা এবং বসতবাড়ির ধারণায় বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসেছে বহুতল আবাসিক ভবন বা অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং। রাজধানী ঢাকায় এ ক্ষেত্রে কী ঘটল?
আবু সাঈদ এম আহমেদ : রেসিডেন্সিয়াল বিল্ডিংয়ের ডেভেলপমেন্ট হয়েছে দুটো ধারায়। একটা ফরমাল সেক্টর একটা ইনফরমাল। সরকারিভাবে যেসবে আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা হয়, প্রথম দিকে ধানমন্ডি, তারপর গুলশান, বনানী। এখন পূর্বাচল, ঝিলমিল এগুলো সরকারের পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা। এসব ক্ষেত্রে রাস্তাঘাট এবং বাড়ির চারপাশে কতটুকু জায়গা ছাড়তে হবে, বাড়ি কতাটা উঁচু করা যাবে এসবই প্রথমত আবাসিক এলাকার চরিত্র নির্ধারণ করে দেয়। আবার ইনফরমাল সেক্টরে ধরেন কাজীপাড়া, বাসাবো, মুগদা এসব এলাকা গড়ে ওঠে। ১৯৫২ সালে যে আইন ছিল তাতে বলা ছিল জমির দুই-তৃতীয়াংশই ছেড়ে দিতে হবে। ফলে আমরা অনেক সবুজ দেখতাম। আবার গুলশান বা নিকুঞ্জে যেমন দুইতলার বেশি করারই অনুমতি ছিল না। এ ক্ষেত্রে ১৯৯৬ সালের একটা আইন বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনল বলা হলো সীমানার চারদিকে চার ফিট করে ছেড়ে দিয়েই বাড়ি করা যাবে। ২০০৩-০৪ সাল থেকে এ সংশ্লিষ্ট প্রায় সব প্রফেশনাল বডিগুলোর আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নতুন একটা ধারণা প্রবর্তন করা হয়। এটাকে আমরা বলি ‘এফএআর’ বা ‘ফ্লোর এরিয়া রেশিও’। জায়গা এবং রাস্তাঘাটের অনুপাতে এতটুকু ছাড়লে আপনি এতটুকু ওপরে উঠতে পারবেন। এটা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০০৬-এর এ নিয়মানুসারে এখন একটু দম ফেলার জায়গা পাওয়া যাচ্ছে।
আহমেদ মুনীরুদ্দিন : নগর পরিকল্পনার সঙ্গে আবাসিক ভবন, অফিস ভবন, বিপণিবিতান, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, মন্দির, মসজিদ সবকিছুই তো সম্পর্কিত। আমাদের নগর-শহরের কাঠামোর সঙ্গে এসব ভবন ও স্থাপত্য কতটা মানানসই? এখানে কী ধরনের সংকট রয়েছে বলে মনে করেন?
আবু সাঈদ এম আহমেদ : এখানে পেশাদারদের মধ্যে একটা সমস্যা ছিল। এতদিনে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে, স্থপতিরা কী করবেন আর প্রকৌশলী, স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার কার কী ভূমিকা। কিন্তু একটা ক্ষেত্রে এখনো একটু সমস্যা রয়ে গেছে যে, স্থপতি আর নগর পরিকল্পনাবিদের ভূমিকা নিয়ে। স্থপতিদের অনেকের ধারণা আমরা মিনিমাম জায়গায় কত বেশি সুবিধা দিতে পারব এটাই আমার কাজ। আর প্ল্যানাররা ভাবছে এগুলো সামাজিক সমস্যা অভিবাসন কমাতে হবে, জনঘনত্ব কমাতে হবে ইত্যাদি। স্থপতিরা অনেক সময় ভাবেন যে আমি একটা প্লটের মধ্যে কাজ করছি; তিনি ভাবছেন না যে তার বিল্ডিং রাস্তায় বা প্রতিবেশীদের ওপর কী ইমপ্যাক্ট ফেলবে। আবার প্ল্যানাররা ভাবছেন না পরিকল্পনার ত্রুটি এলাকায় এবং এলাকার বাসিন্দাদের ওপর কী ইমপ্যাক্ট ফেলবে। প্ল্যানারদের আবার সব চিন্তা যেন গ্রাউন্ডে, থ্রি-ডাইমেনশনাল সারফেস নিয়ে তারা ভাবেন নাই। মূলত এ সংকটের সঙ্গে আমাদের পরিকল্পনাহীন নগর-মহানগরের সংকট মিলিয়ে আজকের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই বিষয়ে এখন আসলে নগর পরিকল্পনাবিদদের এসব নিয়ে আরও ভাবতে হবে।
আহমেদ মুনীরুদ্দিন : দেশের বর্তমান স্থাপত্যচর্চায় যে ধরনের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহৃত হচ্ছে তা কতটা যুগোপযোগী? সামগ্রিকভাবে দেখলে আমাদের নির্মাণসামগ্রী ও নির্মাণের মান কতটা সন্তোষজনক বলে মনে করেন?
আবু সাঈদ এম আহমেদ : এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এবং এর উত্তর খুবই দুঃখজনক যে, আমাদের দেশে এখনো নির্মাণসামগ্রীর জন্য আমরা ব্যাপকমাত্রায় বিদেশি উপকরণের ওপর নির্ভরশীল এবং এ বিষয়ে আমাদের উদ্বেগ আছে বলেও মনে হয় না। ধরুন আপনি যে গ্লাস ব্যবহার করছেন তার বেশিরভাগই আমদানি করা। এটা বন্ধ করতে হলে আপনাকে এখানে ইন্ডাস্ট্রি করতে হবে। টাইলসের কথা যদি বলেন, কমোডের কথা বলেন, বাথরুম ফিটিংস থেকে শুরু করে অনেক অনেক সামগ্রী সবই বিদেশ থেকে আনা হচ্ছে। এতে যে শুধু বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হচ্ছে তা-ই না, এসব আমদানি করা প্রডাক্ট নষ্ট হলে আপনি রিপ্লেস করতে পারবেন না। অনেক কিছু আমাদের জলবায়ুতেও খাপ খায় না। এ ক্ষেত্রে অতি দ্রুত সরকারের মনোযোগ দেওয়া দরকার এবং নির্মাণসামগ্রী স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। ব্যবসায়ীদেরও আমদানির ব্যবসা ছেড়ে কীভাবে এখানে ইন্ডাস্ট্রি বানানো যায় সেই চেষ্টা করতে হবে। এখন অনেক টাইলস ইন্ডাস্ট্রি হয়েছে, রঙের ইন্ডাস্ট্রি হচ্ছে, গ্লাসের ইন্ডাস্ট্রি কম। সিরামিকের ইন্ডাস্ট্রি বাড়াতে হবে। এভাবে আমাদের আগামীর চাহিদা নিরূপণ করে সেই চাহিদা পূরণের লক্ষ্য নিয়ে এগোতে হবে। আর স্থানীয়ভাবে ইন্ডাস্ট্রির বিকাশ হলেই শুধু আপনি সবকিছুর মান নিয়ন্ত্রণ বা সবকিছুকে একটা নির্দিষ্ট মাপজোকই বলেন আর মানই বলেন সেটা ঠিক রাখতে পারবেন। আবার কিছু ক্ষেত্রে উল্টো পথেও হাঁটছি আমরা। একটা গ্রুপ সিমেন্টের পক্ষে প্রপাগান্ডা চালাচ্ছেÑ পোড়ামাটির ইট বাদ দিয়ে সিমেন্টে বানানো কংক্রিট ব্লকের ব্যবহার বাড়াতে বলছে। আপনি চাইলে দেশের ভেতরে ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। কিন্তু সিমেন্টের দূষণ তো ভয়াবহ, ইউরোপে-আমেরিকায় কোথায় এখন এত সিমেন্ট ব্যবহার হয়? এসব নিয়েও ভাবতে হবে।
আহমেদ মুনীরুদ্দিন : এখন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে অনেক বড় বড় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। যমুনা সেতু হয়েছে, পদ্মা সেতু হয়েছে। পায়রা বন্দর হচ্ছে, কর্ণফুলী টানেল হচ্ছে। রাজধানী ঢাকায়, বন্দরনগরী চট্টগ্রামে অনেক ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়েসহ নানা ধরনে মেগা স্ট্রাকচার, মেগা আর্কিটেকচার আমরা দেখছি। কিন্তু এসব প্রকল্প তো সবই বিদেশিদের নকশায়, বিদেশিদের ঠিকাদারিতে, বিদেশিদের সুপারভিশনে হচ্ছে। দেশের স্থপতি-প্রকৌশলীরা এখনো সেই সক্ষমতা অর্জন করতে পারছে না কেন? বা এসব ক্ষেত্রে আসলে আমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কতটুকু দেখতে পাচ্ছেন?
আবু সাঈদ এম আহমেদ : এর জবাবও দুঃখ নিয়েই বলতে হচ্ছে। আসলে এমন মেগা স্ট্রাকচার নকশা করা বা সামলানোর মতো ক্ষমতা আমাদের পেশাজীবীদের তৈরি হয়নি। এর সমস্যার দুটো দিক আছে। একটা হলো বিদেশে বসে বিদেশি ফার্মের কনসালট্যান্ট-প্রফেশনালরা সবসময় যে আমাদের স্থানীয় কনটেক্সট বুঝবেন তা কিন্তু না। ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে এমন অনেক সংকটে আমাদের ভুগতে হতে পারে। ধরুন, মগবাজার ফ্লাইওভার আমেরিকায় বসে ডিজাইন করলে আপনি তো বাংলাদেশে লেফট হ্যান্ড ড্রাইভ না রাইট হ্যান্ড ড্রাইভ তা-ই বুঝবেন না। তাহলে এমন আরও মগবাজার ফ্লাইওভার ডিজাস্টার হবে।
আরেকটা দিক হলো, আমাদের এখানে কেন এমন সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম দক্ষতার চাহিদা মেটাতে পারা পেশাজীবী তৈরি হচ্ছে না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এসব বিষয়ে পিছিয়ে আছে। গবেষণা নেই, সেই তাগিদও নেই। একটা সাবজেক্টের কথা বলি ইলেকট্রোমেকানিক্যাল। এখন দেশে হয়তো হাতেগোনা আট-দশজন পেতে পারেন এই বিষয়ে জানাশোনা। এখন আমরা ভারত, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ডসহ নানা দেশের ওপর এজন্য নির্ভরশীল। আমার তো মনে হয় আমরা নিজেরাই নিজেদের বিকাশের পথ আটকে রেখেছি। ধরুন পাস করে বের হয়ে ৩০ বছর ধরে যে প্র্যাকটিস করছে সেই প্রকৌশলীর ডিজাইন এখন বুয়েট থেকে ভেটিং করিয়ে আনতে হবে একজন লেকচারার-অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসরকে দিয়ে! আপনার এক্সপার্টাইজ বাড়বে কীভাবে। বিষয়টা এমন যে, আপনি অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলেন। এখন সেখানকার ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন কি আপনি ঢাকা মেডিকেলে দেখিয়ে তারপর ওষুধ কিনবেন? এখানে হয়ে গেছে সেই রকম সংকট।
এমন সংকট কিন্তু সব ক্ষেত্রেই হচ্ছে। শান্তিনগরের জলাবদ্ধতার সমস্যা কিংবা ফার্গগেটের ট্রাফিক জ্যামের সমস্যা থেকে শুরু করে ইলেকট্রোমেকানিক্যালের সমস্যা, যাই বলুন আমাদের এখানে এগুলো সমাধানের গবেষণাও নেই, তাই শিক্ষাও এগোচ্ছে না। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে জোর না দিলে আগামী দিনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা উন্নয়ন যাই বলি না কেন, সেটাকে কাজে লাগানোর মতো লোক আপনি পাবেন না। স্থপতি, প্রকৌশলী, পরিকল্পনাবিদ থেকে শুরু করে সবাইকেই নিজ নিজ শিক্ষা, গবেষণা ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির, চাহিদা পূরণের লক্ষ্য নিয়ে এগোতে হবে, আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত হতে হবে নতুন প্রজন্মকে।
ড. আবু সাঈদ এম আহমেদ
অধ্যাপক ও ডিন স্থাপত্য অনুষদ, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, ঢাকা
সভাপতি, এশীয় স্থপতিদের সংগঠন ‘আর্কএশিয়া’ (arcasia)
সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট
সাংবাদিক আহমেদ মুনীরুদ্দিন দেশ রূপান্তরের সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত