তিন মেয়াদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে সাফল্যের পরিসংখ্যান দেশ-বিদেশে স্বীকৃত ও প্রশংসিত। এই সময়কালে দেশের আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলার কথাও একই সঙ্গে বহুল আলোচিত। বিশেষত বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ, অবলোপিত ঋণ এবং ঋণগ্রহীতাদের স্বেচ্ছাখেলাপি হওয়া নিয়ে কম কথা হচ্ছে না। বিগত বছরগুলোতে খেলাপি ঋণ আদায়ের নানা কৌশলের ব্যর্থতা এবং খেলাপিদের নানা ছাড় দেওয়ার ঘোষণায় হিতে বিপরীত হওয়ার কথাও বহুল সমালোচিত। আর্থিক খাতের অনেক বিশ্লেষকই বলেছেন যে, এসব ছাড় ও সুবিধা বরং অনেক ঋণগ্রহীতাকে স্বেচ্ছাখেলাপি হতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এমন প্রেক্ষাপটে স্বেচ্ছাখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নানা বিধান রেখে বিশেষ আইন প্রণয়ন করা এবং সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে তাদের বর্জন করার উদ্যোগ কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার করেছে।
সোমবার দেশ রূপান্তরে ‘স্বেচ্ছাখেলাপিরা নিষিদ্ধ হচ্ছেন রাজনীতিতে’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি হওয়া ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে প্রস্তাবিত আইনের নানা দিক তুলে ধরা হয়। এই আইনে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ব্যক্তিদের রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। এমনকি কোনো পেশাজীবী, ব্যবসায়িক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনেও এমন ব্যক্তিরা থাকতে পারবেন না। শুধু তা-ই নয়, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে সরকার। তারা নতুন করে কোনো বাড়ি-গাড়ি ও কোম্পানি নিবন্ধন করতে পারবেন না, তাদের নামে ইস্যু করা হবে না কোনো ট্রেড লাইসেন্স। রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের যোগ্যতাও হারাবেন তারা। সামাজিকভাবে কোনো ধরনের সম্মাননা নিতে পারবেন না। ‘ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন-২০২০’ নামে এ আইনের খসড়া ইতিমধ্যে মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর সংসদে উত্থাপনের জন্য খসড়া বিল আকারে পাঠানো হয়েছে। বিদ্যমান আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন, ১৯৯৩ রহিত করে নতুন এ আইন বলবৎ করতে যাচ্ছে সরকার।
স্বেচ্ছাখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে সরকারের বারংবার হুঁশিয়ারি এবং আর্থিক খাতের বিশ্লেষক, সাবেক ব্যাংকার ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে উচ্চারিত হলেও কাকে স্বেচ্ছাখেলাপি বলা যাবে আর কাকে বলা যাবে না তা চিহ্নিত করার উপায় ছিল না। বিদ্যমান ‘ব্যাংক কোম্পানি আইন’ ও ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন’-এ ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির কোনো সংজ্ঞা নেই। তাই সুষ্ঠু তদন্ত ছাড়া ব্যবসা করতে গিয়ে লোকসানের কারণে খেলাপি হওয়া ও খেলাপি হওয়ার উদ্দেশ্যে ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে আলাদা করার সুযোগ নেই। এবার সেই উপায় বের করতে যাচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ-এফআইডি। এরপর ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের তালিকা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই তালিকা সরকারের কাছে পাঠিয়ে তাদের বিদেশ ভ্রমণ, বাড়ি-গাড়ি নিবন্ধনসহ নতুন কোম্পানি করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুপারিশ থাকবে। সরকার বিদ্যমান অন্যান্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। একই সঙ্গে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার কথা বলা হয়েছে এতে। পাশাপাশি স্বেচ্ছাখেলাপিদের শনাক্ত করে প্রয়োজন সাপেক্ষে ঋণগ্রহীতাকে দেউলিয়া ঘোষণা করার বিধানও যুক্ত করা হয়েছে। খসড়া বিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া এসব ক্ষেত্রে ঋণের সুদ ও মুনাফা মওকুফ করার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল ৮ হাজার ২৩৮টি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ও তাদের পরিশোধিত ঋণের তালিকা তুলে ধরেন। এতে দেখা যায়, দেশে খেলাপি হয়ে পড়া ঋণের মোট পরিমাণ এখন ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ১১ দশমিক ৯৯ শতাংশ। উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের শুরুতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত প্রায় ১১ বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৫ গুণেরও বেশি। এসব পরিসংখ্যান বিবেচনায় নিয়ে বলা যায়, স্বেচ্ছাখেলাপি, ঋণখেলাপি, অবলোপিত ঋণ যে নামেই চিহ্নিত করা হোক না কেন, বিপুল পরিমাণ অনাদায়ী ঋণ আদায়ে শক্তিশালী পদক্ষেপ গ্রহণ বহু আগেই জরুরি হয়ে পড়েছিল।
আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন-২০২০ এর খসড়া বিলে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের যে সংজ্ঞা ও শাস্তি নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে, তা খুবই যৌক্তিক। কারণ, দেশে বড় ঋণখেলাপিদের বেশিরভাগই ঋণ পরিশোধ না করার পরিকল্পনা করেই বৈধ ও অবৈধভাবে ঋণ নিচ্ছেন এবং নেওয়ার পর পরিকল্পনা অনুযায়ী মোটেই কোনো অর্থ পরিশোধ করছেন না। ফলে আর্থিক খাতে বিপর্যয় ও দুর্যোগ নেমে আসছে। এমন অপরাধের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা ও শাস্তির বিধান তৈরি করে আইন করা নিঃসন্দেহে বহু প্রতীক্ষিত একটি জরুরি উদ্যোগ। তবে, সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা। নইলে ঋণ নিয়ে ইচ্ছা করে খেলাপি হওয়ার যে সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়েছে, তা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।