রাজনীতি স্থিতিশীল, অবকাঠামোর উন্নয়নও হচ্ছে দ্রুতগতিতে। সে তুলনায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ পাচ্ছে না বাংলাদেশ। তাই বেসরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন করতে যাচ্ছে সরকার। দিনক্ষণ এখনো ঠিক না হলেও মুজিববর্ষেই সম্মেলনটি আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ-বিডা। ‘বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট সামিট’ নামে এই সম্মেলনে দেশসেরা উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি বিশ্বসেরা উদ্যোক্তা ও বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের কর্ণধারদের দেওয়া হবে ‘বঙ্গবন্ধু ইনভেস্টমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ বা বঙ্গবন্ধু বিনিয়োগ পদক।
বিডার কর্মকর্তারা জানান, মুজিববর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে এই সম্মেলন আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নামে বিনিয়োগ পদক প্রবর্তন করে তা দেওয়ার সিদ্ধান্তও হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বিডার নির্বাহী সদস্য ও সরকারের অতিরিক্ত সচিব বেগম মোহসিনা ইয়াসমিনকে আহ্বায়ক করে গত ১৪ জানুয়ারি ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে বিডা।
কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে, বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট সামিট আয়োজনের যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করবে কমিটি। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু ইনভেস্টমেন্ট অ্যাওয়ার্ড বিষয়ে নীতিমালাও প্রণয়ন করবে কমিটি।
কমিটির আহ্বায়ক বেগম মোহসিনা ইয়াসমিন গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট সামিট আয়োজন ও বঙ্গবন্ধু ইনভেস্টমেন্ট অ্যাওয়ার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। মুজিববর্ষেই এটি আয়োজন করা হবে। তবে কবে হবে, তা এখনো ঠিক হয়নি। কমিটি গঠনের পর এখনো কোনো বৈঠক হয়নি। শিগগিরই বৈঠক করে এসব বিষয় চূড়ান্ত করা হবে।
তিনি বলেন, বিনিয়োগ সম্মেলনে দেশের সম্ভাবনাময় সব খাতের সেরা উদ্যোক্তাদের রাখা হতে পারে। এ ছাড়া দেশসেরা ব্যবসায়ীদেরও রাখা হবে। বৈশ্বিক সেরা ব্র্যান্ড ও বিশ্বসেরা ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের আমন্ত্রণ জানানো হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশে যেসব খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে, ওইসব খাতের সেরা উদ্যোক্তাদের আমন্ত্রণ জানানো হবে। তবে এর কোনো কিছুই এখনো চূড়ান্ত নয়।
এর আগে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে ২০১৬ সালে দু’দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড পলিসি (বিআইপি) সামিট’ আয়োজন করে বিডা। ওই সম্মেলন উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সম্মেলনে যোগ দেন ভারতের বড় শিল্প গ্রুপ আদানির চেয়ারম্যান গৌতম আদানি, রিলায়েন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান অনিল ধিরুভাই আম্বানি, মালয়েশিয়ার প্যান্ডেকার এনার্জি লিমিটেডের রিজিওনাল কান্ট্রি ম্যানেজার আহমাদ সাইয়াহরানি বিন সুলাইমান, বাংলাদেশ হোন্ডা প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ইয়োইচি মিজুতানিসহ বিভিন্ন বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার নির্বাহীরা।
২০১৬ সালের সম্মেলনের আগে বিডার ওয়েবসাইটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বার্তা তুলে ধরা হয়। সেখানে তিনি বলেন, ‘বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে দূরদর্শী ও জ্ঞানীরা দ্রুত বাণিজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে লাভবান হচ্ছেন। এই ধরনের সুযোগ এখন বাংলাদেশে রয়েছে। আমরা ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করতে চাই, সে জন্য বৈদেশিক বিনিয়োগ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আমরা আপনাকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আপনি নিশ্চিত হতে পারেন যে, আপনাকে সম্পূর্ণভাবে স্বাগতম জানিয়ে আমার সরকার সব ধরনের সহায়তা দেবে।’
ওই সম্মেলনে যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠান কোটস গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পল এ ফ্রোমেন, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের প্রধান নির্বাহী সুনীল কুশাল এবং এইচএসবিসি ব্যাংকের বাংলাদেশ প্রধান ফ্রানকোইস ডি মারিকোর্ট বক্তব্য দেন।
গত ২০ জানুয়ারি প্রকাশিত জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (আঙ্কটাড) ‘ইনভেস্টমেন্ট ট্রেন্ড মনিটর’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশে মোট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৩৪০ কোটি মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ৬ শতাংশের মতো কম।
প্রতিবেদনটি বলছে, ২০১৯ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় মোট বিনিয়োগ এসেছে ৬ হাজার কোটি ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি। বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে মূলত ভারতে। আঙ্কটাড বলছে, বাংলাদেশের পাশাপাশি পাকিস্তানেও বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। পাকিস্তান পেয়েছে ১৯০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ, যা আগের বছরের চেয়ে ২০ শতাংশ কম।
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের বড় ধরনের উল্লম্ফন হয়েছিল ২০১৮ সালে। ওই বছর জাপান টোব্যাকো ইন্টারন্যাশনাল (জেটিআই) আকিজ গ্রুপের তামাক ব্যবসা কিনে নেয়। এতে তারা বিনিয়োগ করে ১৪৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার। ফলে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়ে প্রায় ৩৬১ কোটি ডলারে দাঁড়ায়, যা আগের বছরের চেয়ে ৬৮ শতাংশ বেশি ছিল।