ওয়ারীতে ওয়াসার লরিচাপায় এসএসসি পরীক্ষার্থী পিষ্ট

আগামী সোমবার থেকে শুরু হতে যাচ্ছে এসএসসি পরীক্ষা। এ উপলক্ষে গতকাল সোমবার রাজধানীর ওয়ারী উচ্চবিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ এসএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য আয়োজন করেছিল বিদায়ী সংবর্ধনার। ওই অনুষ্ঠানে যোগ

দিতে গতকাল সকাল থেকেই দল বেঁধে স্কুল প্রাঙ্গণে আসতে থাকে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। উচ্ছ্বাস-আনন্দে তারা মাতিয়ে তুলেছিল পুরো বিদ্যালয় চত্বর। একই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বাবার সঙ্গে বাসা থেকে বের হয়ে স্কুলের পথে রওনা হয়েছিল বিদ্যালয়টির এসএসসি পরীক্ষার্থী আবীর হোসেন তন্ময় (১৬)। কিন্তু পথে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বলধা গার্ডেনের পাশে ওয়াসার গলিতে ওয়াসার পানিবাহী একটি বেপরোয়া গাড়ির চাপায় ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তার। আবীরের মৃত্যুসংবাদে স্কুলের বিদায়ী অনুষ্ঠানের আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয় বিষাদে। সেখানে নেমে আসে শোকের ছায়া। কান্নায় ভেঙে পড়ে আবীরের সহপাঠীরা।

এদিকে আবীরের মৃত্যুর খবর পেয়ে বিক্ষুব্ধ সহাপাঠী, ওয়ারী উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী চান্দ্রিচারণ বোস সড়ক, জয়কালী মন্দিরের পাশের সড়ক, বলধা গার্ডেন এবং এর আশপাশের এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে। প্রায় তিন ঘণ্টার অবরোধে ওই সব এলাকায় দেখা দেয় তীব্র যানজট।

স্বজন ও সহপাঠীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওয়ারী উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল আবীর। স্কুলের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বেলা পৌনে ১১টার দিকে বাবা হানিফ মিয়ার সঙ্গে ৫৩/৪ কাপ্তান বাজারের বাসা থেকে বের হয় আবীর। ১০ মিনিট পরই ছেলেকে জয়কালী মন্দিরের কাছে স্কুলের পাশে নামিয়ে দেন বাবা। সেখানে আবীরের কয়েকজন বন্ধু ছিল। পরে বন্ধুদের সঙ্গে হেঁটে স্কুলে যাওয়ার পথে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বলধা গার্ডেনের পাশে ওয়াসা গলিতে বেপরোয়া গতিতে থাকা ওয়াসার পানিবাহী একটি লরি আবীরকে ধাক্কা দেয়। কেবল ধাক্কা নয়, মাটিতে পড়ে যাওয়া আবীরের মাথার ওপর উঠে যায় লরিটির চাকা। এ সময় আবীরের সঙ্গে থাকা সহপাঠী ও এলাকাবাসী লরিটির চালক চুন্নু মিয়াকে (৪৯) আটক করে। অন্যদিকে নিজ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ছুটে আসে ওয়ারী উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-শিক্ষকরা। তারা রক্তাক্ত-ক্ষতবিক্ষত আবীরকে উদ্ধার করে। তাকে ঘটনাস্থল থেকে পুলিশের সহায়তায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে সেখানকার চিকিৎসকরা আবীরকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের ওয়ারী ট্রাফিক জোনের সহকারী কমিশনার তারিকুল ইসলাম জানান, বলধা গার্ডেনের পাশে ওয়াসার পানির পাম্প থেকে পানি নিয়ে আবীরকে চাপা দেওয়া ট্রাকটি মূল সড়কে উঠছিল। এ সময় আবীরকে চাপা দেয়।

ওয়ারী থানার এসআই মো. জহির হোসেন জানান, আবীরকে চাপা দেওয়া ওয়াসার লরিটি জব্দ এবং এর চালক চুন্নু মিয়াকে আটক করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে মামলা হবে।

পরিবারের সদস্যরা জানান, মাত্র ১১ মাস আগে আবীরের মা মিনু বেগম হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এ ছাড়া বছর পাঁচেক আগে আবীরের বড় ভাই ফয়সাল আহমেদ রেজা গুলিস্তান পার্কের পুকুরে গোসল করতে নেমে প্রাণ হারায়। বড় ছেলের মৃত্যুর পর হানিফ মিয়ার তিন সন্তানের মধ্যে আবীর ছিল সবার ছোট। বাকি দুই বোন আবীরের চেয়ে বড়। বড় বোন আমেনা আক্তার লিজার বিয়ে হয়েছে। ছোট বোন সালমা আক্তার সাথী স্নাতকের শিক্ষার্থী। মায়ের আকস্মিক মৃত্যুর পর আবীর বড় বোন আমেনা বেগমের বাসায় অধিকাংশ সময় কাটাত। ছোট ছেলেকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল হানিফ মিয়ার। ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে ছেলের নিথর দেহ দেখার পর ডুকরে কাঁদতে থাকেন তিনি।

হানিফ মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার একমাত্র ছেলে ছিল আবীর। আমি মরে গিয়েও যদি আমার আবীর বেঁচে থাকত। আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব?’

তিনি আরও বলেন, ‘বেলা পৌনে ১১টার দিকে যখন বাসা থেকে বের হই, তখন আবীর নিজেই আমার জুতা মুছে দেয়। নিজের ও আমার গায়ে পারফিউম স্প্রে করে দিয়েছে। আমিই ওকে জয়কালী মন্দিরের পাশে নামিয়ে দিয়ে দোকানের দিকে গিয়েছি। দোকানে গিয়েই ওর মৃত্যুর সংবাদ পেলাম। আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই। আর কারও বুক যাতে এভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় খালি না হয়, তার দাবি জানাই।’ এসব কথা বলতে বলতে একপর্যায়ে অচেতন হয়ে পড়েন আবীরের বাবা। চেতনা ফেরার পর তিনি জানান, আবীরকে আজিমপুর কবরস্থানে মায়ের পাশে দাফন করা হবে।

আবীরের চাচাতো ভাই সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানান, আবীরের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার বরুড়ার সোনাইমুড়ি গ্রামে। আবিরের বাবার নবাবপুর রোডে কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যাবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। ওয়ারীর জয়কালী মন্দিরের অটোভিটাসংলগ্ন ৫৩/৪ নম্বর কাপ্তান বাজারের বাসায় থাকেন তারা। এটি তাদের নিজস্ব বাড়ি।

ওয়ারী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাদল চন্দ্র সাহা নিহত আবীরকে শান্ত, ভদ্র ও মেধাবী উল্লেখ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তার মৃত্যু এভাবে মেনে নেওয়া যায় না।’

আবীরের সহপাঠী খোকন বলে, ‘আর ছয় দিন পরই এসএসসি পরীক্ষা। আমরা স্কুলে গিয়েছিলাম সবাই সবাইকে বিদায় জানাতে। এখানে আবীরের এভাবে মৃত্যু হবে সেটা ভাবাই যায় না।’

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত আরও ৫ : এদিকে সাভারে অটোরিকশার চাপায় দ্বিতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় আরও চারজন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে সাভার পৌর এলাকায় স্কুল ছুটির পর বাসায় ফেরার পথে অটোরিকশাচাপায় দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী আঁখি আক্তার (৭) নিহত হয়েছে। নেত্রকোনা সদরে ট্রাক-মোটরসাইকেল মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন অসীম রায় (৩০) নামে এক শিক্ষক। গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে পিকআপ ভ্যান উল্টে নাছির মোল্লা (৩৮) নামে এক মাছ ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে লক্ষ্মীপুরে ট্রাক্টরের নিচে চাপা পড়ে রাজু আহমেদ (১৯) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ট্রলির চাপায় এক মাটিশ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

সাভারে আটোরিকশাচাপায় শিক্ষার্থী নিহত : সাভার পৌর এলাকায় স্কুল ছুটির পর বাসায় ফেরার পথে অটোরিকশার চাপায় আঁখি আক্তার নামে এক শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। গতকাল সোমবার দুপুরে সাভার-বিরুলিয়া রোডের রাজাশন পলু মার্কেট এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহত আঁখি স্থানীয় ধরেন্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির পলু মার্কেট এলাকার বাসিন্দা আমজাদ ম-লের মেয়ে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, দুপুর ১২টার দিকে স্কুল ছুটির পর বাসায় ফিরছিল আঁখি। এ সময় সাভার বাসস্ট্যান্ডগামী একটি অটোরিকশা তাকে চাপা দেয়। স্থানীয়রা উদ্ধার করে সাভার এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

নেত্রকোনায় ট্রাক-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে শিক্ষক নিহত : নেত্রকোনায় ট্রাকের সঙ্গে মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে অসীম রায় (৩০) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। গতকাল সোমবার বিকেলে নেত্রকোনা-মোহনগঞ্জ সড়কের সদর উপজেলার বাংলা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত অসীম রায় স্থানীয় কয়েকটি কোচিং সেন্টারে পাঠদানের পাশাপাশি দত্ত উচ্চবিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করতেন। তার বাড়ি বারহাট্টা উপজেলার বড়ি গ্রামে। একই দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও দুজন।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বিকেলে অসীম রায় আরও দুজন আরোহীসহ মোটরসাইকেলে চড়ে নেত্রকোনা থেকে মোহনগঞ্জের দিকে যাচ্ছিলেন। পথে বাংলা এলাকায় বিপরীত দিক থেকে আসা নেত্রকোনাগামী একটি ট্রাকের সঙ্গে তার মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই অসীম রায় মারা যান। মোটরসাইকেলটির আরোহী অপর দুজনকে উদ্ধার করে নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় পরে তাদের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

গোপালগঞ্জে পিকআপ ভ্যান উল্টে মাছ ব্যবসায়ী নিহত : গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে পিকআপ ভ্যান উল্টে নাছির মোল্লা (৩৮) নামে এক মাছ ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। গতকাল সোমবার ভোরে মুকসুদপুরের দিগনগর ইউনিয়নের বিশ্বম্বরদী এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। একই দুর্ঘটনায় আরও তিনজন আহত হয়েছেন।

নিহত নাছির মোল্লা গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার উলপুর গ্রামের আউয়াল মোল্লার ছেলে।

ভাঙ্গা হাইওয়ে থানার পুলিশের ওসি মো. আতাউর রহমান জানান, সোমবার ভোরে বিশ্বম্বরদী এলাকায় মাছ বহনকারী একটি পিকআপ ভ্যান নিয়ন্ত্রয়ণ হারিয়ে রাস্তার পাশে খাদে পড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই মাছ ব্যবসায়ী নাছির মোল্লা নিহত হন।

লক্ষ্মীপুরে ট্রাক্টর চাপায় যুবক নিহত : লক্ষ্মীপুরে ট্রাক্টরের নিচে চাপা পড়ে রাজু আহমেদ (১৯) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। গতকাল সোমবার দুপুরে সদর উপজেলার সুতার গোপ্টা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত রাজু ওই দুর্ঘটনাকবলিত ট্রাক্টরটিতে চালকের সহকারী (হেলপার) হিসেবে কাজ করতেন। তিনি সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নের চরমনশা গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, একটি ট্রাক্টর ইট নিয়ে লক্ষ্মীপুরের দিকে যাচ্ছিল। পথে সুতার গোপ্টা এলাকায় অসাবধানতাবশত রাজু ট্রাক্টর থেকে নিচে পড়ে যান। এতে ট্রাক্টরের নিচে চাপা পড়েন তিনি। পরে রাজুকে উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

মৌলভীবাজারে ট্রলিচাপায় মাটিশ্রমিক নিহত : মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ট্রলির চাপায় জাহির আলী কালু (৪২) নামে এক মাটিশ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সোমবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে আদমপুর ইউনিয়নের জালালপুর গ্রামে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত কালু আদমপুর ইউনিয়ন পরিষদের আধকানী গ্রামের বাসিন্দা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, মাটিবাহী ট্রলি থেকে নিচে পড়ে ট্রলিটির চাকায় পিষ্ট হন জাহির আলী কালু (৪২)। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।