মার্কিন তারকা, বাস্কেটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়, আধুনিক যুগের অন্যতম সেরা অ্যাথলেট কোবি ব্রায়ান্টের মৃত্যুতে গোটা বিশ্বই শোকে মুহ্যমান। সামাজিক মাধ্যমসহ সব গণমাধ্যমে কিশোরী মেয়েসহ মাত্র ৪১ বছর বয়সে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় কোবির মৃত্যুতে সাত সমুদ্দুর তেরো নদীর পাড়ের বাংলাদেশ, যেখানে বাস্কেটবল তেমন একটা পরিচিত খেলা নয়, সেখানেও ফেইসবুকে বইছে শোকের মাতম। বলে নিই, আমি নিজেও ‘ড্যাগার’, ‘দি এইটথ ওয়ান্ডার অব দ্য ওয়ার্ল্ড’সহ বিভিন্ন নামে পরিচিত এই অনবদ্য মানুষটির অকাল প্রয়াণে ভীষণভাবে ব্যথিত। তাই এই প্রেক্ষিতে কিছু চিন্তাভাবনা লিখে ফেলার এই প্রয়াস। এই প্রয়াসে কিছু প্রাসঙ্গিক সামাজিক, রাজনৈতিক আলাপও উঠে আসবে।
আলাপটা করছিলাম বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতির সভাপতি, কালের কণ্ঠের সাংবাদিক, মোস্তফা মামুনের সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় পুরুষ ফুটবল দল বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপের সেমিফাইনালে বুরুন্ডির কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার পর। সেই পুরনো আলাপÑ বাংলাদেশের ফুটবল মৃতপ্রায় কেন? জাতীয় দল বাদ দিলে মাঠে দর্শক নেই কেন? ক্লাবগুলোর প্রতি দর্শকদের চরম অনীহা কেন?
প্রশ্নগুলো আরও বেশি জরুরি মনে হবে এই কথা মাথায় রাখলে যে, ফুটবল বাংলাদেশে এখনো সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। তরুণ সমাজের একটা বড় অংশ আন্তর্জাতিক ফুটবলের খেলা, তারকাদের প্রাত্যহিক কার্যকলাপ, প্রিয় ক্লাবের অবস্থার খোঁজখবর রাখা নিয়ে দিনের একটা বড় সময় কাটায়, আলোচনা করে। লিভারপুল, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ ইত্যাদি ক্লাবের সমর্থকরা ফেইসবুকে অবিরত তর্ক করেন, ঝগড়া করেন, এইসব ক্লাবের নানা মার্চেন্ডাইস বিক্রির হার এই দেশেও নেহায়েত কম নয়। আমি নিজে লিভারপুলের পাঁড় সমর্থক, এই ক্লাবের বাংলাদেশি সমর্থকদের কার্যকলাপ কাছ থেকে দেখি। একসঙ্গে খেলা দেখার সময় সমর্থকদের মধ্যে যে অনির্বচনীয় গোষ্ঠীগত আবেগ কাজ করে সেটা আদতে মানব সমাজেরই গল্প, সেই আলাপে একটু পরেই আসছি।
কথা হচ্ছে এই ভালোবাসা আবাহনী, মোহামেডান, আরামবাগ এইসব ক্লাবের প্রতি এখন আর নেই কেন? সারা দুনিয়াতেই লিভারপুলের মতো গ্লোবাল ক্লাবের পাশাপাশি স্থানীয় ক্লাব নিয়েও দর্শকরা সারা বছর মাতোয়ারা থাকেন (সাইমন কুপারে সকার এগেইনস্ট এনিমিতে এর বিশদ বর্ণনা আছে), তবে এই ষোলো কোটি মানুষের দেশে, ফুটবল-পাগল এই দেশে এই হাল কেন? আরও একটা জিনিস মনে করিয়ে দেওয়া জরুরি যে, নব্বইয়ের আগে এই দেশে আবাহনী আর মোহামেডানে দেশ দুইভাগ হয়ে যেত, পাড়ার ক্লাবগুলো ঘিরে কাল্ট গড়ে উঠত, ছিল শত শত ‘আল্টরাস’। গোপীবাগের বড় ক্লাব ব্রাদার্স ইউনিয়নের বদলে আমরা সমর্থন করতাম গোপীবাগের এক কোনায় আমাদের মহল্লার নিজস্ব ‘বাংলাদেশ বয়েজ ক্লাব’কে।
তাহলে এখন কি হলো? উত্তর আসতে পারে খেলার মান খারাপ। নাহ, পুরোপুরি মানা গেল না। ভারতে কিন্তু একই কারণে মাঠে গিয়ে খেলা দেখা কমেনি। ঢাকার ট্রাফিক জ্যাম? কিছুটা মানা গেল, কিন্তু এতে কি প্রকৃত ফুটবল দর্শক কখনো দমে যায়? আর ঢাকার বাইরেও তো দেখি যে এখন গ্যালারি ফাঁকা থাকে।
এখন এখানে এবার একটু ক্রিকেটের আলাপ করা যাক। এই অঞ্চলে ক্রিকেটটা কখনই আমজনতার খেলা ছিল না। পাকিস্তানিদের সঙ্গে যেসব বিষয়ে পূর্ববঙ্গের পার্থক্য ছিল সেখানে ফুটবল-ক্রিকেট ছিল একটা বড় ব্যাপার। ক্রিকেট মূলত অভিজাত, পশ্চিমাদের খেলা। তবে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর, সর্বোচ্চ পর্যায়ে একমাত্র এই খেলার মাধ্যমেই দেশের পরিচিতি বহনের সুযোগ পাওয়াতে ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত হয় জাতীয়তাবাদী সৌরভ। সঙ্গে আছে টেলিভিশনসহ গণমাধ্যমের বিস্তার। গল্পটা হুবহু ৯০ দশকের ‘রাইজিং ইন্ডিয়ার’ মতোই। ভাত-কাপড়ের নিশ্চয়তা না দিতে পারলেও উন্নয়নের ফাঁপা গল্পের, চরম অসাম্যর মডেলে এই জাতীয়তাবাদী জোশটা খুব কার্যকরী একটা টোটকা, আর একে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বোকা বাক্স তো আছেই। ফলে ক্রিকেটটা আসলে যতটা না খেলা তারচেয়ে বলা চলে জাতীয়তাবাদী প্রজেক্ট। এর প্রমাণ কিন্তু ঘরোয়া লিগের ফাঁকা মাঠ। যে সাকিব, মাশরাফীর জন্য গোটা দেশ টিভি সেটের সামনে বসে পড়ে, মিডিয়াজুড়ে চলে মাতোয়ারা, সেই সাকিবরা যখন ঘরোয়া লিগে খেলেন তখন মিরপুরের কিছু কাক, পুলিশ আর সাংবাদিক ছাড়া অন্যদের আনাগোনা দেখা যায় না। অর্থাৎ, খেলা ভালোবাসার এই সমীকরণ আসলে মান, ট্রাফিক জ্যাম কিংবা ব্যস্ততা দিয়ে মাপা বেঠিক হবে। তাহলে এর পরিমাপক কি হবে? সামাজিক অসাম্যতা।
ব্যাপারটা তলিয়ে দেখা যাক। এমনকি আশির দশকেও এই দেশের জনপ্রিয় বিনোদন ব্যবস্থা ছিল প্রায় সার্বজনীন। নায়ক রাজ্জাক কিংবা ফুটবলার সালাউদ্দিন ছিলেন রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতির কাছেও হিরো। অতি ধনীরা হয়তো বিদেশ-টিদেশ গিয়ে নিজেদের আলাদা করতে পারতেন, কিন্তু হোয়াইট কলার মধ্যবিত্তও এইসব দিক দিয়ে নিম্নবিত্তের মতোই ছিল। তবে নব্বইয়ে এসে মধ্যবিত্তের ‘ক্লাসি’ হওয়ার ইচ্ছাটা চাগাড় দিয়ে উঠল বা আরও ঠিকভাবে বললেÑ সুযোগ মিলল। মনে রাখতে হবে এই মধ্যবিত্ত ঊর্ধ্বমুখী টাকার অভাবে দরিদ্রের কাছাকাছি থাকতে বাধ্য হলেও তাদের আকাক্সক্ষা উচ্চবিত্তের বসার ঘরের সোফায় একটু ঠাঁই করে নেওয়া, নিজেদের ‘কলচর’ যে গরিবের থেকে পৃথক সেটা পদে পদে প্রমাণ করা। এর ফলে ক্রিকেট হয়ে উঠল মধ্যবিত্তের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আশির দশকে ভিসিপিতে কিংবা নাইনব্যান্ডের রেডিও দিয়ে টেস্ট ক্রিকেট ফলো করা একটা বেশ ‘অভিজাত’ ব্যাপার হয়ে ওঠে, আর অন্যদিকে ‘আমজনতা’ মাঠে গিয়ে আসলাম, সাব্বির, কায়সার হামিদ কিংবা হলে গিয়ে ইলিয়াস কাঞ্চন আর বেদের মেয়ে জোছনা নিয়ে ব্যস্ত। বেশ একটা ফারাক।
মুশকিল হলো, ক্রিকেট প্রজেক্টের উত্থানে। এখন বাড়ির চাকর, বাসের হেলপার, গ্রামের চাচাতো ভাইটাও ক্রিকেট নিয়ে মেতে থাকতে চায়। সেইটাও আবার নিম্নবিত্তের ইন্টারক্লাস স্ট্রাগলের আরেক গল্প হয়তো। অতটা আলাপের সুযোগ এইখানে নেই। মোদ্দা কথা, ক্রিকেটটাও ‘কলচর’ থেকে আমজনতার বিষয় হওয়াতে ‘রেসিস্ট’ মধ্যবিত্ত এখান থেকে বের হওয়ার সুযোগ খুঁজতে লাগল। এই সুযোগটা দিল ইন্টারনেট আর কেব্ল নেটওয়ার্ক। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সেই পুরনো, ‘ফকিরনি খেলা’ ফুটবল হয়ে উঠল ‘কলচর’। তবে এইখানে একটা ফারাক আছে, এই ফুটবল হচ্ছে ‘ক্লাসি’, ‘গ্লোবাল’ ব্যাপার। এর সঙ্গে স্থানীয় আবেগ বা স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে যাওয়ার সুযোগ তো নেই-ই, বরং একটা দেয়াল তৈরির বড় অনুষঙ্গ। এই ফুটবলের পাশাপাশি আরও ‘ক্লাসি’ যারা তারা বাস্কেটবল, কার রেসিং, এমনকি আমেরিকান ফুটবল বা এনএফলও যুক্ত করল। এই হচ্ছে বাঙালি মধ্যবিত্তের মানস। জাতপাতের প্রথাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করলেও মননে গভীরভাবে প্রোথিত।
এটা সত্যি যে, বিশ্বায়নের ফলে এখন কমিউনিটি ব্যাপারটা আর স্থানিক নেই বা থাকার সুযোগ নেই। সাত সমুদ্র তফাতে থাকা দুইজন লিভারপুল সমর্থক কিংবা দুইজন আলফ্রেড হিচকক ভক্তের মধ্যে যে বন্ধন হতে পারে সেটা পাশাপাশি বাসায় থাকা দুইজন ভিন্ন আগ্রহের মানুষের মধ্যে নাও হতে পারে। ফলে ভার্চুয়াল কমিউনিটি একটা বাস্তব ব্যাপার। কিন্তু সমস্যাটা হয় অন্যত্র। এই যে স্থানিক পার্থক্য, সুস্পষ্ট শ্রেণি বিভাজন, এই ব্যাপারটা নানারকম সামাজিক আর রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দেয়। একটা ফুটবল মাঠে একসঙ্গে খেলা দেখতে গেলে যেই আবেগ উথলে ওঠে সেটা শ্রেণি পার্থক্য ঘুচিয়ে দেয়। প্রিয় দল গোল করার পর পাশের মানুষটিকে আলিঙ্গন করার সময় কেউ এত সাতপাঁচ ভাবে না। এই আবেগটা, স্থানীয় কমিউনিটির জন্য খুব জরুরি। এর ফলে সমাজ তখন ‘আমরা’ আর ‘তোমরা’ থেকে ঊর্ধ্বে উঠতে পারে।
যারা ‘তোমরা’ মানে ‘ক্লাসি’ হতে পারে না, সেইসব মধ্যবিত্ত বা মূলত নিম্নবিত্তের দিক থেকে এইবার ব্যাপারটা ভাবা যাক। এদের বিনোদন কী হবে? ক্রিকেট প্রজেক্ট তো অনেকটাই আসলে জাতীয়তাবাদী, এদের কর্মক্লান্ত জীবনের অবসাদ মেটানো হবে কী দিয়ে? এই ভ্যাকুয়াম নানাভাবে পূর্ণ হবে। ওয়াজ মাহফিলের (মাথায় রাখতে হবে, এই ব্যাপারটা যতটা না ধর্মপ্রচার তারচেয়ে অনেক বেশি আসলে কমিউনিটি গ্যাদারিং) মতো ব্যাপার সেই জায়গা পূরণ করবে। আর ‘ক্লাসিরা’ যেহেতু এই শ্রেণিটাকে মোটামুটি অচ্ছুত ভাবে, ফলে এদের প্রতিক্রিয়া হবে রিজেকশনের, পাল্টা ঘেন্নার। মোটাদাগে বললে, ‘ক্লাসি’ মধ্যবিত্তকে অবিশ্বাস করা এবং এদের ‘ফাঁপা’ ভাবাটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হবে।
এই অবস্থাটাকে খুব সহজেই এক্সপ্লয়েট করা যায়। মানব ইতিহাসের বড় একটা সময় আকাশের ঈশ্বর যেমন সবচেয়ে নিচুতে থাকা, পতিত শ্রেণির শেষ সহায়, অনেকটাই ডেসপারেট আশা, এই সময়ে এই ডেসপারেশন আরও তুঙ্গে চলে যায়। এ সময় সব ছাপিয়ে কেবল ‘ক্লাসি’ মধ্যবিত্তের প্রতি ঘেন্না আর অবিশ্বাসের অনুভূতিই কাজ করে। তাই ওয়াজ মাহফিলের আলাপ শহুরে ক্লাসিদের কাছে যত বেশি হাস্যকর মনে হয়, সাবঅল্টার্নের কাছে সেটাকেই মনে হয় মোক্ষ, ঘেন্নার জবাব, শুধু তাই নয়, এই অবস্থায় মনে হয় যে, আসলে সবই ওদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। ফলে হুজুরের মিথ্যাকে তারা নানাভাবে ডিফেন্ড করবে আর ‘ক্লাসিদের’ সব আলাপকেই খারিজ করবে।
ব্যাপারটা আরও ঘোরপ্যাঁচ খায় এই দারিদ্র্যকে পুঁজি করে এনজিও আর উন্নয়ন ব্যবসায়। দরিদ্ররা টের পায় যে তাদের আবারও এক্সপ্লয়েট করা হচ্ছে। ঘেন্না আরও বাড়ে। কোনো কোনো গবেষকদের কাছেও এইসব নিয়ে ভাবাটা বেশ ‘আবেদনময়’, কিন্তু এই ভাবনাগুলোও আদতে ভাবা হয় কোনো ‘পশ’ কফিশপ বা দামি অফিসে বসে। ফলে বিভাজন, অবিশ্বাস, পারস্পরিক দূরত্ব কমার বদলে বাড়ে। গ্লোবালাইজেশনের যুগে ভার্চুয়াল কমিউনিটি বাস্তব হলেও স্থানিক কমিউনিটির ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়া, বিভক্ত হয়ে পড়া, রাজনৈতিক অধিকার আদায়কে দুর্বল করে তোলে। আরও একটা ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে, স্থানীয় কমিউনিটির সঙ্গে ব্যবধান সবরকম ট্যাঞ্জিবল সম্পর্ককেই দুর্বল করে তোলে, দেশপ্রেম বিষয়টা নাড়ির টানের, বিশ্বাসের, ‘গ্রেটার দ্যান লাইফ’-এর বদলে হয়ে ওঠে তেলতেলে আবেগ কিংবা উপেক্ষণীয় বিষয় হিসেবে। এর পুরোটা সুবিধা নেয় শাসকগোষ্ঠী। তাহলে নিষ্ঠাবান রাজনৈতিক কর্মী বা গবেষক যারা এই দূরত্ব ঘোচাতে চান তাদের কাজ কী হতে পারে? এই ‘আমরা’ আর ‘তোমরা’র সাংস্কৃতিক দেয়াল ভাঙার চেষ্টা। কোবি ব্রায়ান্ট আর তাহেরী হুজুরের শ্রোতাদের নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে সবার জন্য একটা অভিন্ন প্ল্যাটফরম বানানোর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করা।
এক কাল্পনিক ফুটবল খেলায় নিজের পাড়ার সঙ্গে পাশের পাড়ার খেলায় ব্রায়ান্টের একজন সমর্থক আর তাহেরীর সমর্থকের একই ব্যানারে আবেগী হয়ে পড়াটা বিপজ্জনকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়া এই সমাজের জন্য এক দুর্দান্ত স্বপ্নদৃশ্য।লেখক
ক্রীড়া সাংবাদিক ও অনুবাদক
faiz@dhaka.net