নতুন করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া চীনে অবরুদ্ধ জীবনযাপন করছেন বাংলাদেশিরা। বিশেষ করে যে উহান থেকে রোগটির সংক্রমণ, সেই শহর ও তার আশপাশের শহরগুলোতে ঘরে বন্দি সবাই। তাদের দিন কাটছে আতঙ্কে ও দুশ্চিন্তায়। ঘর থেকে বেরোতে পারছেন না। ফুরিয়ে যাচ্ছে খাবার। দোকানপাট ঠিকমতো খুলছে না। মাঝেমধ্যে খুললেও খাবার পাওয়া যাচ্ছে না। পার্ক, খেলার মাঠ শূন্য। কারও সঙ্গে কারও দেখা নেই। নীরব সুনসান পুরো শহর।
চীন থেকে এসব বাংলাদেশি প্রতিনিয়তই ফেইসবুক, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের দুরবস্থার বর্ণনা দিচ্ছেন। জানাচ্ছেন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কথা। তাদের এমন দুরবস্থায় ভীষণ চিন্তিত বাংলাদেশে থাকা স্বজনরাও। এমন বেশ কয়েকজন বাংলাদেশির সঙ্গে দেশ রূপান্তরের কথা হয়েছে।
উহান থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরে জিয়াংসি প্রদেশের জিওজিয়াং শহর। সেখানকার জিওজিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আবাসিক ভবন ও ছাত্রাবাসে প্রায় বন্দি অবস্থায় আছেন সবাই। বাইরে বেরোতে পারছেন না কেউ। খাবার ফুরিয়ে আসছে দিন দিন। তারা সবাই দেশে ফিরতে চান। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আতিকুর রহমান সুজন তার স্ত্রী সাবরিনা জাহান লিজা ও এক শিশুসন্তান আয়মানকে নিয়ে থাকেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ভবনে। সেখানে আর পাঁচটি বাংলাদেশি পরিবার রয়েছে। লিজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এক ধরনের ভৌতিক পরিবেশের মধ্যে রয়েছেন তারা। খাবার তো দূরের কথা, খাবার পানিও ফুরিয়ে আসছে তাদের। পুরো নগরীতে বলতে গেলে এক ধরনের সুনসান নীরবতা। এমনিতে বাইরে না বেরোনোর নির্দেশ, তার ওপর আবার চীনের নববর্ষের কারণে দোকানপাট সব বন্ধ, গাড়িও চলছে না। মুখ ঢাকার মাস্ক পর্যন্ত কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। ঘরের মধ্যে বন্দি তারা।
লিজা বলেন, সবার মধ্যেই আতঙ্ক কাজ করছে। কখন না জানি কী হয়। দেশে পরিবারের সবাই খুবই চিন্তিত। তারা চাইছেন আমরা দেশে ফিরে যাই। তাছাড়া রোগটি ভীষণ ছোঁয়াচে। কিছু কিছু দোকানপাট মাঝেমধ্যে খোলে। তবে খাবার পাওয়া যায় না। বিশেষ করে আয়মানের দুধ পাওয়া যাচ্ছে না। ওকে ভাত খাওয়াতে হচ্ছে। এভাবে যে কতদিন চলবে, বুঝতে পারছি না!
সিরাজগঞ্জ সদর থানার ইমশিয়াত মিশকাত উহান শহরের উহান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে পড়াশোন করছেন। তিনি চীনের গণমাধ্যম সিনহুয়ার বাংলাদেশের প্রতিনিধি। মিশকাত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উহান এখন একটি নিস্তব্ধ শহরে পরিণত হয়েছে। রাস্তাঘাটে জনমানব নেই। দোকানপাট বন্ধ। ভয়ে কেউ ঘরের বাইরে বের হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গেটে তালা দেওয়া হয়েছে। কেউ সেখান থেকে বের হতে বা ঢুকতে পারছে না। চীন সরকারের পক্ষ থেকে বাইরে বের হওয়ার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ওই শহরে এক হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করলেও শীতকালীন ছুটির কারণে বেশিরভাগ বাংলাদেশে গিয়েছিল। বর্তমানে এখানে প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থী আটকা পড়ে আছে। তবে এখন পর্যন্ত কেউ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়নি। যেসব শিক্ষার্থী উহানে আটকা আছে তাদের মধ্যেও আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি করে বাস দেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বাজার থেকে নিয়ে আসার জন্য। আমরা যারা সিনিয়র আছি তারা গিয়ে বাজার থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে আনছি।’
মিশকাত জানান, গত ২৬ জানুয়ারি বাংলাদেশের নিযুক্ত চীনের দূতাবাস দেশটির সরকারের সঙ্গে একটি বৈঠক করেছে। আরও কয়েকটি বৈঠক হওয়ার পর সিদ্ধান্ত হবে কীভাবে আমাদের উহান থেকে বের করে আনা যায়। উইচ্যাট গ্রুপের মাধ্যমে দূতাবাস আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন। চীন সরকার ইতিমধ্যে করোনাভাইরাসের জন্য শহরের বাইরে ১ হাজার ২০০ শয্যাবিশিষ্ট একটি হাসপাতাল নির্মাণ করেছেন। আগামী ২ ফেব্রুয়ারি এটি উদ্বোধন করা হবে।
পটুয়াখালী জেলার কলাপড়া থানার তারেক মুহাম্মদ নাসরুল্লাহ চীনের জেজিয়াং প্রদেশের হুজু শহরের হুজু ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন। নাসরুল্লাহ বলেন, চীনে প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশি পড়াশোনা করে। তবে বর্তমানে ঠিক কতজন বাংলাদেশি আটকা পড়েছে তার সঠিক হিসাব দূতাবাসের কাছেও নেই। বিভিন্ন উৎস থেকে আমরা জেনেছি, দেশটির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ছয় হাজার শিক্ষার্থী এখনো অবস্থান করছে। আমার বিশ্ববিদ্যালয়েই বর্তমানে প্রায় ২০০ জন রয়েছে। হুজু শহরে এরই মধ্যে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় শহরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সবাইকে ক্যাম্পাসের মধ্যে অবস্থান করতে বলা হয়েছে। শহরের রাস্তাঘাটে এখন সুনসান নীরবতা। দুপুরের খাবার বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া তাদের কাছেও কিছু খাবার সংরক্ষিত আছে। তা দিয়েই চালিয়ে যাচ্ছে। চীনে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাস জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে একটি উইচ্যাট গ্রুপ খুলেছে। এর মাধ্যমে জেজিয়াং শহরের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন। আর দূতাবাসের পক্ষ থেকে যে হটলাইন নাম্বার দেওয়া হয়েছে তার মাধ্যমে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না।
জিয়ানজুর হুয়াইন সিটির হুয়াইন ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে পড়াশোনা করছেন রাজধানী দক্ষিণখানের আবদুল্লাহ আল আমিন। তিনি বলেন, ‘আমার শহরে গতকাল পর্যন্ত প্রায় ২০ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। এ শহরের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১০০ বাংলাদেশি রয়েছে। আমার বিশ্ববিদ্যালয়েই আছে ২৭ জন। নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করায় সবার জন্য বাইরে বের হওয়া নিষিদ্ধ। বাংলাদেশের দূতাবাসের পক্ষ থেকে চীনে অবস্থিত শিক্ষার্থীদের তথ্য জানার জন্য একটি ওয়েব লিঙ্ক দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ সার্ভারের কারণে এটিতে কেউ ঢুকতে পারছে না। তবে উইচ্যাটের একটি গ্রুপের মাধ্যমে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে দূতাবাস। চীন সরকারের প্রতিনিধিরাও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। খাবারের বেশিরভাগ দোকান বন্ধ। পুলিশের সহায়তায় আমরা বাজার করছি। একসঙ্গে ৮-১০ দিনের বাজার করে নিয়ে এসেছি।’
উহান শহর থেকে ১২০০ কিমি দূরে সিচুয়ান প্রদেশে অবস্থিত সাউথইস্ট পেট্রোলিয়াম ইউনিভার্সিটি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৭০ জন বাংলাদেশি ছাত্র পড়াশোনা করছেন। তাদের একজন কক্সবাজারের মঈনউদ্দিন হেলালী তৌহিদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, সিচুয়ানে এখন পর্যন্ত ৩৫ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে। তবে তাদের কেউ মারা যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ বিদেশি শিক্ষার্থীদের বেশ খেয়াল রাখছে। বাইরে বের হওয়ার সময় শরীরের তাপমাত্রা চেক করা হচ্ছে, মাস্ক দেওয়া হচ্ছে, ক্যাম্পাসে প্রবেশের সময়ও তাপমাত্রা মাপা হচ্ছে। প্রি-মেডিসিন সরবরাহ করা হচ্ছে। এক কথায় সরকারি-বেসরকারি প্রস্তুতির কমতি নেই।
তৌহিদ জানান, বাংলাদেশ ছাড়াও চীনে উজবেকিস্তান, মঙ্গোলিয়া, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, তুর্কমিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ভুটানসহ মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের হাজার হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষের বাইরেও নিজ নিজ দেশের দূতাবাস থেকে শিক্ষার্থীদের বাড়তি সতর্কতা ও যতœ করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশ দূতাবাসকে আরও কমিউনেকেটিভ হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তারা।