পাওনার বিরোধে কমেছে গ্রামীণফোনের লভ্যাংশ

নিরীক্ষা দাবির ১২ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার পাওনা নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে নানামুখী সংকটে রয়েছে দেশের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন। অবশ্য বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় থাকার পরও গ্রামীণফোনের আয় বেড়েছে। যদিও এ বিরোধের জেরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কোম্পানিটির শেয়ারহোল্ডাররা। সরকারি পাওনার বিপরীতে সঞ্চিতির অংশ হিসেবে নিট মুনাফার একটি বড় অংশ সংরক্ষণ করছে কোম্পানিটি। এর গত সাত বছরের মধ্যে এবার সবচেয়ে কম লভ্যাংশ ঘোষণা করতে হয়েছে গ্রামীণফোনকে।

গতকাল ২০১৯ সালের ডিসেম্বর সমাপ্ত হিসাব বছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের জন্য অন্তর্বর্তী লভ্যাংশসহ মোট ১৩০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে গ্রামীণফোনের পরিচালনা পর্ষদ। এ লভ্যাংশ ২০১৩ সালের পর সর্বনিম্ন। ২০১৮ সালে কোম্পানিটি নিট মুনাফার চেয়ে বেশি লভ্যাংশ দিয়েছিল। সে সময় কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ২৬ টাকা ৪ পয়সা, আর লভ্যাংশ হিসেবে ২৮ টাকা করে দেয়। ২০১৩ সালে গ্রামীণফোন ১৪০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করে। এরপর এবারই প্রথম সর্বনিম্ন লভ্যাংশ ঘোষণা করে কোম্পানিটি।

সাত বছরে সর্বনিম্ন লভ্যাংশ ঘোষণার কারণ জানতে চাইলে গ্রামীণফোনের পক্ষ থেকে ই-মেইল বার্তায় জানানো হয়, বর্তমানের অনিশ্চয়তা ও ব্যবসায় স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে লভ্যাংশ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গ্রামীণফোনের পরিচালনা পর্ষদ এই লভ্যাংশের প্রস্তাব দিয়েছে।

গত ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) ১২ হাজার ৫৭৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকার নিরীক্ষা দাবির নোটিসের ওপর হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখে গ্রামীণফোনকে তিন মাসের মধ্যে ২ হাজার কোটি টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেয় আপিল বিভাগ। এ আদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন জানিয়ে গত ২৬ জানুয়ারি ১২ কিস্তিতে পরিশোধের প্রস্তাব দিয়েছে গ্রামীণফোন। যদিও গ্রামীণফোনের আবেদনের শুনানি এখনো হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে কোম্পানিটি ২০১৯ সালের নিট মুনাফা থেকে ১ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা সঞ্চিতি হিসেবে সংরক্ষণ করছে।

গ্রামীণফোন ২০১৯ সালে ভয়েস, ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন সেবা থেকে মোট ১৪ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা আয় করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৮ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। তবে আয় বাড়লেও গ্রামীণফোনের নিট মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ২০১৯ সালে প্রায় ২ শতাংশ কমেছে। ২০১৯ সালে কোম্পানিটির ইন্টারনেট সেবা খাত থেকে আয় বেড়েছে ১৭ শতাংশ। একই সময় ভয়েস থেকে আয় বেড়েছে সাড়ে ৮ শতাংশ। ২০১৯ সালে কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ৩ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা।

গ্রামীণফোনের সিইও মাইকেল প্যাট্রিক ফোলি বলেন, ‘রেগুলেটরি দৃষ্টিকোণ থেকে ২০১৯ সাল গ্রামীণফোন একটি কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে পার করেছে। নানা ধরনের বিধিনিষেধ আমাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত করেছে। তবে চমৎকারভাবে  বাজার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং নেটওয়ার্কে আমাদের শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখার মাধ্যমে আমরা ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। পরিকল্পিত  লক্ষ্য অনুযায়ী চতুর্থ প্রান্তিকে ফোরজি সাইটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার। বছর শেষে আমাদের নেটওয়ার্কে ফোরজি গ্রাহকের সংখ্যা ১ কোটি ১৯ লাখে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছি। ইন্টারনেট সেবা খাতে এর ব্যবহার ও রাজস্ব অর্জন দুটি ক্ষেত্রেই প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি।’

মাইকেল ফোলি বলেন, ‘মোবাইল সেবাখাতের উন্নয়ন ও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধিতে এর অবদান ধরে রাখতে সরকার ও খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে যেকোনো অর্থপূর্ণ আলোচনা করতে আমাদের প্রতিশ্রুতি আমরা পুনর্ব্যক্ত করতে চাই।’

চতুর্থ প্রান্তিকে ৭ লাখ নতুন গ্রাহক গ্রামীণফোন নেটওয়ার্কে যোগ দিয়েছে। ২০১৯ সাল শেষে আগের বছরের তুলনায় ৫.১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে মোট গ্রাহক দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৬৫ লাখ। মোট গ্রাহকের মধ্যে ৪ কোটি ৬ লাখ বা ৫৩.১ শতাংশ গ্রামীণফোনের ইন্টারনেট সেবা ব্যবহারকারী।

গ্রামীণফোনের সিএফও ইয়েন্স বেকার বলেন, ‘শক্তিশালী মার্জিন নিয়ে গ্রামীণফোন ২০১৯ সালে ব্যবসায়িক সাফল্য অজর্ন করেছে।’ তিনি বলেন, ‘চতুর্থ প্রান্তিকে আমরা তীব্র প্রতিযোগিতা ও বৈরী আবহাওয়া সত্ত্বেও ইন্টারনেট সেবা খাতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি অর্জনে সফল হয়েছি। আমাদের শেয়ারহোল্ডার ও গ্রাহকদের জন্য আরও বেশি মানসম্মত সুযোগ সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক নির্মাণ ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে আমাদের বিনিয়োগ অব্যাহত থাকবে। আমরা আনন্দের সঙ্গে জানাতে চাই সম্মানিত শেয়ারহোল্ডারদের জন্য আমাদের পরিচালনা পর্ষদ প্রতি শেয়ারে ১৩ টাকা লভ্যাংশের প্রস্তাব করেছেন।’

তিনি আরও বলেন, ২০১৯ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে নেটওয়ার্ক উন্নয়নে ৩৯০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে গ্রামীণফোন। এনওসি বন্ধের কারণে গ্রামীণফোনকে পরিকল্পিত বিনিয়োগের চেয়ে কম বিনিয়োগ করতে হয়েছে। শেষ প্রান্তিকে নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নের পাশাপাশি ৭১৫টি নতুন ফোরজি সাইট করা হয়েছে। ২০১৯ শেষে গ্রামীণফোনের মোট নেটওয়ার্ক সাইটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬,৫০৮। গ্রামীণফোন ২০১৯ সালে  কর, ভ্যাট, ফোরজি লাইসেন্স ফি, স্পেকট্রাম অ্যাসাইনমেন্ট ফি, ডিউটি  ও ফিস বাবদ সরকারি কোষাগারে ৮৫১০ কোটি টাকা প্রদান করেছে, যা মোট আয়ের ৫৯.২ শতাংশ।

প্রসঙ্গত, নিরীক্ষা দাবির অর্থ আদায় না হওয়ায় নতুন প্যাকেজ অনুমোদন স্থগিতের পাশাপাশি গ্রামীণফোন ও রবিকে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিটিআরসি।