উন্নয়ন ফোরামের সম্মেলনে বক্তারা

বিনিয়োগ বাড়াতে দুর্নীতি আমলাতন্ত্র কমাতে হবে

কাক্সিক্ষত অগ্রগতি ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যবসা শুরুর প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে অগ্রগতি হলেও কাক্সিক্ষত উন্নতি হয়নি। এখনো ব্যবসায় বড় প্রতিবন্ধকতা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও কর্মকর্তাদের মাইন্ড সেটআপ। এক্ষেত্রে সরকারকে বিভিন্ন খাতে দুর্নীতি কমিয়ে আনতে হবে। নতুবা আইন বা নীতিমালা কোনো কাজে আসবে না। 

গতকাল বুধবার ঢাকায় দুই দিনের বাংলাদেশ উন্নয়ন  ফোরাম (বিডিএফ) সম্মেলন শুরু হয়েছে। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রে এর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বেসরকারি খাতের অন্তর্ভুক্তি ও বাণিজ্য সুবিধা নিয়ে এক অধিবেশনে বক্তারা এসব কথা বলেন। এই অধিবেশনে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিমের সভাপতিত্বে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাণিজ্য সচিব ড. মো. জাফর উদ্দীন। আলোচনায় অংশ নেন বিডার চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম, বেজার চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী, ইউএসএআইডির প্রতিনিধি জনস্মিথ শ্রিন, বিশ^ব্যাংকের ঢাকা অফিসের প্রোগ্রাম লিডার ইয়োটাকা ইয়োসোনো ও তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক।

এ সম্মেলনে ইউরোপ, আমেরিকা, বিশ^ব্যাংক, এডিবি, জাইকাসহ প্রায় উন্নয়ন সহযোগী দেশ এবং সংস্থার প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ রয়েছে। দেশে সরকারি-বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা সম্মেলনে তাদের মতামত দিচ্ছেন।

ড. মো. জাফর উদ্দীন বলেন, রপ্তানি আয় বাড়াতে সরকার ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এক্ষেত্রে চামড়া, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, প্লাস্টিক, পাটসহ বেশ কিছু পণ্যে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ব্যবসা সহজীকরণে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা দূর করা হচ্ছে।

সিরাজুল ইসলাম বলেন, ব্যবসার জন্য ই-নথি ব্যবস্থা চালু করতে হবে। কাগজহীন ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা চলছে। গত বছর ব্যবসা সহজীকরণে ৮ ধাপ উন্নতি হয়েছে। এটা বড় অগ্রগতি না হলেও আশানূরূপ। সামনের বছর আরও ভালো করব বলে আশাবাদী আমরা।

পবন চৌধুরী বলেন, ব্যবসা বাণিজ্যের সহজীকরণে সবার আগে দরকার কর্মকর্তাদের মানসিকতার পরিবর্তন। তা না হলে যতই আইন বা বিধিমালা চালু করা হোক কাজে আসবে না। এদেশে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এখনো প্রকট। এজন্য কাক্সিক্ষত হারে সফলতা পাওয়া যাচ্ছে না। পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সেবাদানকারী সংস্থাসহ বিভিন্ন সেক্টরে দুর্নীতি কমিয়ে আনতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে শক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের বিকল্প নেই। কারণ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে এগুলো এখনো বড় বাধা।  

জনস্মিথ শ্রিন বলেন, সরকারি-বেসরকারি পার্টনারশিপের (পিপিপি) কার্যক্রম বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে কৃষি ও শিল্পের বাইরে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যেও ব্যাপ্তি বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, ব্যবসার ক্ষেত্রে পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে অনেক ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এছাড়া কর ব্যবস্থা সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে বেশি হারে কর ধার্য করা রয়েছে।

ইয়োটাকা ইয়োসোনো বলেন, উন্নয়নে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ও অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ কাক্সিক্ষত হারে বাড়েনি। বিদেশি বিনিয়োগ কিছুটা বাড়লেও তা যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। ক্ষমতাসম্পন্ন লোক বাড়াতে হবে।

এদিকে সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন উন্নয়ন সহযোগীরা। উন্নয়ন সহযোগী বিভিন্ন দেশ এবং সংস্থার প্রতিনিধিরা বলেছেন, জিডিপি অনুপাতে কর আহরণে সারা বিশে^ বাংলাদেশের  অবস্থান এখনো সর্বনিম্ন। সঠিক কর কাঠামো অনুসরণের মাধ্যমে সরকার রাজস্ব বাড়াতে পারে। এ বিষয়ে ইউরোপসহ বিশে^র অন্যান্য সফল দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যায়। আর্থ-সামাজিক বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রশংসায় তারা বলেছেন, এ দেশের উন্নয়নে অতীতের মতোই পাশে থাকবেন তারা।

সকালে বিডিএফ সম্মেলনের মূল কর্ম-অধিবেশন ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য এসডিজি অর্জনে আগামী অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন’ শীর্ষক আলোচনায় এ পরামর্শ দিয়েছেন তারা। এর বাইরে বেসরকারি খাতের ব্যবসা পরিবেশ আরও মসৃণ করা ও উচ্চ আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্যে সমন্বিত নীতি-কৌশল নেওয়ারও কথা বলেছেন তারা। ধার করা প্রযুক্তির পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে উদ্ভাবিত পরিবেশ উপযোগী ধারণার মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষা ও শিল্প-বাণিজ্যে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। এসডিজিকে কেন্দ্র করে সম্মেলনের অন্যান্য অধিবেশেনেও প্রায় একই রকম কথা বলেছেন বিভিন্ন প্রতিনিধি। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে উত্তরণের পর যেসব বাণিজ্য বাধার মুখোমুখি হতে পারে বাংলাদেশ সে বিষয়ে এখনি প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে বলেছেন তারা। এজন্য সরকারের নেওয়া নীতি এবং বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান কমানো, ব্যবসা পরিচালনা সহজ করা, উৎপাদন ব্যয় কমানো, দক্ষতা উন্নয়ন, পণ্য ও বাজার বহুমুখী করারও কথা বলেছেন তারা।

দিনের প্রথম অধিবেশনে প্যানেল আলোচক হিসেবে ঢাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত রেঞ্জি তারিগ্ধেক বলেন, টেকসই উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশকে স্থানীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। জিডিপি অনুপাতে কর আহরণে বাংলাদেশ নিচু সারির। এ অবস্থার উন্নয়নে ইইউ বাংলাদেশের সামনে একটা দৃষ্টান্ত হতে পারে। বিনিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইইউ বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে চায়। তবে ব্যবসার পরিবেশে নিচু সারিতে থাকা এক্ষেত্রে একটা বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যবসার পরিবেশ আরও উন্নত হওয়া উচিত। তবে রোহিঙ্গা ইস্যু, জলবায়ু সমস্যা, এলডিসিউত্তর জিএসপি প্লাস সুবিধাÑ এসব বিষয়ে বাংলাদেশের পাশে আছে ইইউ। এই অধিবেশনে যুক্তরাজ্য সরকারের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা ডিএফআইডির বাংলাদেশ প্রধান জুডিথ হারবার্টসন বলেন, টেকসই উন্নয়নে বাংলাদেশের শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন। বিভিন্ন সমস্যার একটা মধ্যমেয়াদি সমাধান কৌশল নিতে হবে।