কবি খালেদ হোসাইন আশির দশকে কাব্যচর্চা শুরু করেন। যদিও তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ইলা মিত্র ও অন্যান্য কবিতা’ প্রকাশিত হয় ২০০০ সালে। এ পর্যন্ত তার ১৫টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিটি গ্রন্থেই কবি সচেতনভাবেই অনেক বেশি নিরীক্ষাপ্রবণ। তাই বিষয়, ছন্দ, উপস্থাপনে কবি সর্বদা ভিন্ন ভিন্ন রূপে নিজেকে প্রকাশ করেছেন। ‘পায়ের তলায় এসে দাঁড়িয়েছে পথ’ তার প্রকাশিত ষষ্ঠতম কাব্যগ্রন্থ। ২০০৯ সালে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে। চল্লিশটি কবিতা সংকলিত হয়েছে গ্রন্থটিতে। সবগুলো কবিতাই গদ্য ছন্দে রচিত। খালেদ হোসাইন রোমান্টিক কবি। কবির পাওয়া না পাওয়া কিংবা হারানোর বেদনাসিক্ত অভিব্যক্তি, সেই সঙ্গে প্রেমিকার সঙ্গ ফিরে পাওয়ার তীব্র আকাক্সক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে কবিতাগুলোতে। যেমন
১. ‘তবু আমি অপেক্ষা করি, এক দিন ফিরে আসবে সেসব দুপুর, যখন তুমি ভুল করে আমার ওষ্ঠে তুলে দিতে মৃতসঞ্জীবনী, আর তোমার শরীর বেয়ে নেমে-আসা অজস্র নদী আমার চোখে বুনে দিত প্রথম বিস্ময়-অশেষ উন্মাদনা।’ (একদিন ফিরে আসবে সেসব দিন)
২. ‘তাই আমি ভাবি, যে আমার সর্বস্ব হরণ করেছে তার নামে আদালতে মামলা না-ঠুকে বেশ ভালোই করেছি, যেহেতু আমার হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার শান্তিটুকু সেই দিয়েছিল, হারিয়ে যাওয়ার আগে।’ (হারানোর অভ্যাস)
৩. ‘জেগে থাকি-দীর্ঘতম পথ পাড়ি দিয়ে একদিন বোধিবৃক্ষের ছায়া আমাকে আলিঙ্গন করবে এই প্রত্যাশায়/যদিও জানি শুশ্রুষার জল জাগতিক সীমানা ছাড়িয়ে চলে গেছে আকীর্ণ তৃষ্ণার গহ্বরে।’ (মোমবাতি ও শুশ্রুষার জল)
কখনো কবি নিজের সাধারণ যাপিত জীবন আর অভিজ্ঞতাকেই প্রকাশ করেছেন সাবলীল ভাষায়। যেখানে চেনা-জানা চেতনার উন্মোচন ঘটেছে।
১. ‘মোরগঝুঁটির মতো পুরনো সূর্যই ফের আসে, কোটি কোটি মানুষের পৃথিবীতে কজন কবিতা পড়ে, এ প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে আমি হাসতে থাকি।’ (জলের গন্ধ)
২. “তারা বলে, ‘লোকটা নেই; আর থাকলেও তার কোনো দেশ নেই, তার কোনো সমাজ নেই, স্বজন নেই।’/শুনে আমি হাসি/বয়স কিছু বেড়েছে বলে এই অসুখটা সম্প্রতি আমাকে ধরেছে/আগে যেখানে অভিমানে আমার ঠোঁট শিশুর মতো ফুলে উঠত, সেখানটায় হাসি পায়/আমার চোখে ভেসে ওঠে মহাকালের তরঙ্গের পর তরঙ্গ/আমি দেখি, পাহাড় মিশে যাচ্ছে সমুদ্রগর্ভে, সমুদ্র শুকিয়ে হচ্ছে মরুভূমি।” (আমাকে কেউ দেখতে পায় না)
কবি অনেক বেশি স্মৃতি-কাতর। তিনি তার ব্যথিত হৃদয়ের নিংড়ানো আবেগ ও অনুভূতির প্রকাশ করেছেন। কবিতায় যেন কবির আবেগের মুক্তির পথ তৈরি করেছে। সেই সঙ্গে প্রকাশ করেছে অভিমানী এক চিত্তের।
১. ‘আমার মাকে নির্মাণ করা হয়েছিল নৈঃশব্দ্য দিয়ে/তার চোখের পাপড়িতে মাখা ছিল অনন্ত রাত্রির নির্যাস/রোদে-জলে সারা জীবন তিনি ছিলেন ডুবোজাহাজ।’ (ইলশেগুঁড়ি জোছনায়)
২. ‘আমার জীবন কি এখনই সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে জলতরঙ্গের মতো কেঁপে উঠছে, যেমন স্বদেশ?/এরই কি নাম শিহরণ, এরই কি নাম বেঁচে থাকা?/এরই জন্য কি আমি বারবার তাকিয়েছি মেঘপন্থি নীলিমার দিকে?/... আজ কি আমার কান্না-দিবস, এমন গোপন গভীর রাতে, স্বদেশের মতো?’ (মেঘপন্থি)
৩. ‘যে কথা কেউ দেয়নি, সে কথা কেউ রাখবে না, তার জন্যই চক্রবৃদ্ধিহারে বাড়বে আমার অভিমান, দুঃখে আমি ঝাঁজরা হয়ে যাব, কিন্তু কাউকে অভিযোগ করতে পারব না, এমনকি নিজেকেও নয়।’ (কালতরঙ্গ)
কোথাও কোথাও কবিতায় প্রকাশিত হয়েছে নিঃসঙ্গতাবোধ। যেখানে কবিকে কখনো মনে হয়েছে বিচলিত, কখনোবা এই নিঃসঙ্গ তাবোধই যেন কবির অনুপ্রেরণা বলে বোধ হয়। তিনি যেন এই অনুভূতিগুলোকেই উপভোগ করেছেন।
১. “বলবে, ‘তুমি যদি চাও, বাছা, নিতে পারো জীবনের ঘনিষ্ঠ গঠনপ্রকৃতি/গিরিখাতে উদ্ভিদের গতিবিধি, মূলত যা পদযাত্রা-তা-ও নিতে পারে’/তবু আমি স্বেচ্ছায়, প্ররোচনাহীনভাবে স্তম্ভিত জলের ভাস্কর্য হয়ে দাঁড়িয়েই থাকব একা ও রক্তাপ্লুত ঐশ্বর্যের মতো।” (একা ও রক্তাপ্লুত)
কবি খালেদ হোসাইন সমকাল, সমাজ ও স্বদেশকে ধারণ করেছেন তার কবিতায়। কবিতা পড়ে মনে হয় যা বুঝেছি, তার থেকেও যেন অন্যকিছু, অন্য কোনো সত্য লুকিয়ে আছে কবিতার আদলে। কবিতাগুলো বহুমাত্রিকতায় ব্যাপ্তি লাভ করেছে।
১. ‘শুকিয়ে যাওয়া রক্ত একেবারে ফুরিয়ে যায় না/প্রতিবাদের অবক্ষেপ আর প্রতিরোধের স্পৃহা নিয়ে বাতাসে ভাসতে থাকে নৈমিত্তিক মেঘের আদলে বা সৃষ্টি করে ধূলিঝড়;/আমরা ভাবি, আজকাল বাতাসও তার সংলগ্ন স্বচ্ছতা হারিয়ে ফেলেছে।’ (পাথরের নুড়ি)
২. ‘দেশ আমাকে হৃদয়ে ধরেছে, আমিও তাকে/এর ফলে আমাকে কেউ দেখতে পায় না, দেশটাকেও নয়/আমি মানুষের মধ্যে মিশে থাকি, মানুষও আমার মধ্যে/এর ফলে আমাকে কেউ দেখতে পায় না, সংখ্যাতীত মানুষকেও না।’ (আমাকে কেউ দেখতে পায় না)
কবি খালেদ হোসাইনের কবিতা পড়ার জন্য পাঠককে হতে হবে অনেক বেশি মনোযোগী। কেননা কবির ভাষাবোধে খুবই জ্ঞানগর্ভতার পরিচয় মেলে। তিনি অপরিচিত শব্দের ব্যবহার করেছেন সহজাত ভঙ্গিতে। যেমন পরাক্সমুখ, ঋজুরৈখিতা, মঞ্জরিত, মৃতসঞ্জীবনী, স্পর্শস্বাদবঞ্চিত, চক্ষুষ্মান, স্থর্যৈই, পরমান্ন, চন্দ্রবোড়া, ত্রিভঙ্গ মুরারী, ক্যান্ষ্কা ইত্যাদি। উপমা প্রয়োগে কবির দক্ষতা মুগ্ধ করে পাঠককে। কেননা উপমা প্রয়োগে তিনি সফলভাবে বৈচিত্র্যময়তার স্বাক্ষর রেখেছেন। যেমন ‘মোরগঝুঁটির মতো পুরনো সূর্য ’, ‘অভিমানে আমার ঠোঁট শিশুর মতো ফুলে উঠত’, ‘চোখের জলের মতো একফোঁটা শিশিরের কণা, বেড়ালের পদক্ষেপের চেয়ে সাবলীল, কম্পমান নাগেশ্বর আর মহিষের শিঙের মতো ইঙ্গিতপ্রবণ ফুলদানি’ ইত্যাদি। অদ্ভুত চমক জাগানো চিত্রকল্পের সন্ধান পাওয়া যায় এ গ্রন্থের অন্তর্গত কবিতাগুলোতে। কবি খালেদ হোসাইন চিত্রকল্প তৈরিতে বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, যা পাঠককে মোহিত করেছে :
১. ‘কবি-কল্পনার মতো অসংলগ্ন জলবায়ু আমাদের চারপাশে অকস্মাৎ ছড়িয়ে দিল পোষ না-মানা কালো কালো বেড়ালছানার মতো অন্ধকার।’ (উঁকি দেয় সোনার হরিণ)
২. ‘আর আমি জেগে থাকি দারিদ্র্যরেখার নিচে রাবারগাছের কষের মতো তমসার নাভিকুণ্ডে/জেগে থাকি-দীর্ঘতম পথ পাড়ি দিয়ে একদিন বোধিবৃক্ষের ছায়া আমাকে আলিঙ্গন করবে এই প্রত্যাশায়। ’ (মোমবাতি ও শুশ্রƒষার জল)
৩. ‘তখন তুমি ধুলোমাটি-ভাতগন্ধ-চোখের জলের মতো একফোঁটা শিশিরের কণাÑ বিগলিত হেমন্তের শেষে-প্রতীক্ষার সম্ভাব্য ফসল।’ (ইলশেগুঁড়ি জোছনায়)
সর্বোপরি, কবির মর্মবেদনা, বিরহ, কামনা এতটাই আবেগতাড়িত ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে, যা পাঠকের মনকেও স্পর্শ করে যায়।
বই : পায়ের তলায় এসে দাঁড়িয়েছে পথ
লেখক : খালেদ হোসাইন