করোনাভাইরাসে মৃতের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। চীনে এক দিনেই আরও ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত বেড়েছে দুই হাজারের বেশি। হুবেই প্রদেশের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া এ ভাইরাস গত শুক্রবার পর্যন্ত ২৫৯ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে বলে চীনা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। নিহত ২৫৯ জনের ১৯২ জনই উহানের।
আক্রান্তের সংখ্যা বিবেচনায় প্রাণঘাতী এ ভাইরাস গত বৃহস্পতিবারই সিভিয়ার অ্যাকুট রেসপিরেটরি সিনড্রোমে (সার্স) আক্রান্তের সংখ্যা অতিক্রম করেছিল। ২০০২-০৩ সালে দুই ডজনেরও বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়া সার্স মহামারীতে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৮ হাজার ১০০-এর কাছাকাছি। কিন্তু এবারের ভাইরাসে সব মিলিয়ে চীনেই আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছেছে ১১ হাজার ৭৯১।
চীনের যে প্রদেশ থেকে এই ভাইরাস ছড়ানো শুরু হয়েছে, সেই হুবেইয়ের বেশির ভাগ এলাকা কার্যত অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। বেশির ভাগ সড়ক আটকে দেওয়া হয়েছে, বন্ধ রয়েছে গণপরিবহন। বিপর্যস্ত চীনের হুবেই প্রদেশে ৩০ কোটিরও বেশি মুরগি মৃত্যুর পথে রয়েছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় প্রাণীদের খাবার সরবরাহ ব্যবস্থাও বন্ধ প্রশংসা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। গত বৃহস্পতিবার নতুন করোনাভাইরাসের কারণে বৈশ্বিক সতর্কতাও জারি করেছে তারা। করোনাভাইরাসের কারণে ফেব্রুয়ারির শেষে কুনমিংয়ে হতে যাওয়া জীববৈচিত্র্যসংক্রান্ত চুক্তি নিয়ে একটি বৈঠক ইতালির রোমে সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে জাতিসংঘ।
চীনের বাইরে কিছু দেশে ভাইরাসটিতে আক্রান্ত ব্যক্তির সন্ধান মিললেও এখন পর্যন্ত কারও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। সংক্রমণ ঠেকাতে অনেক দেশই চীনের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ সীমিত করেছে। বিমানবন্দরগুলোতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। আক্রান্ত অঞ্চল থেকে নিজেদের নাগরিকদের ফেরাতে ব্যবস্থা নিয়েছে বেশ কয়েকটি দেশও। গুগল, স্টারবাক, ইকিয়া, টেসলার মতো আন্তর্জাতিক কোম্পানি চীনে তাদের সব দোকান বা কার্যক্রম বন্ধ রাখছে। ওয়ালমার্টের মতো বড় আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো তাদের কর্মীদের চীনে যাতায়াতের বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করেছে।
চীনের মূল ভূখণ্ডে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নিজেদের সব অফিশিয়াল শোরুম ও করপোরেট কার্যালয় বন্ধ করছে আইফোন নির্মাতাপ্রতিষ্ঠান অ্যাপল। দেশটিতে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস মহামারী আকার ধারণ করার পর ১ ফেব্রুয়ারি শনিবার এক বিবৃতিতে এ ঘোষণা দেয় প্রতিষ্ঠানটি। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ সতর্কতা ও শীর্ষস্থানীয় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমরা চীনে অবস্থিত অ্যাপলের করপোরেট অফিস, শোরুম ও যোগাযোগ কেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখছি।
করোনাভাইরাসে চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসেই চীনের অর্থনীতির ৬ হাজার কোটি ডলার ক্ষতি হতে পারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৫ লাখ কোটি টাকার বেশি, যা বাংলাদেশের বাজেটের প্রায় সমান। সিএনএনের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বেশ কয়েকজন অর্থনীতিবিদের উদ্ধৃতি দিয়ে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির এই চিত্র তুলে ধরা হয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, চীনের অর্থনৈতিক অবস্থা করোনাভাইরাসের আক্রমের আগে থেকেই দুর্বল ছিল। বর্তমান পরিস্থিতি চীনের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কৌশলে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে পারে বলেও মনে করেন তারা।
তবে করোনাভাইরাস নিয়ে আশাহত হওয়ার মধ্যেই আশা জাগাল আক্রান্ত ২০ ব্যক্তির সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছাড়ার ভিডিও। করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে যে উহান থেকে, সেই শহরেরই একটি হাসপাতালের এই ভিডিও যেন আতঙ্কিত বিশ্ববাসীর প্রাণসঞ্চার ঘটিয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রচারিত ১১ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, করোনাভাইরাস মহামারীর কেন্দ্রস্থল হুবেই প্রদেশের শহর উহানের জিনজিনতান হাসপাতালের সামনে ২০ রোগী দারুণ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন এবং ‘ভি’ চিহ্ন দেখাচ্ছেন। তারা প্রাণঘাতী ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে ওই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। সুস্থতা লাভের পর বিভিন্ন পর্যায়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে গত শুক্রবার বিকেল ৫টার দিকে ওই রোগীদের হাসপাতালের ছাড়পত্র দেওয়া হয়।