দেশের সড়ক-মহাসড়কের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি রোধ করার তাগিদ অনুভূত হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণ সবাই একটি কার্যকর আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়ে আসছে। গত বছর ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বেপরোয়া বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহতের পর রাস্তায় নেমে আসে তাদের সহপাঠীরা। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের মুখে ওই বছর ৫ আগস্ট মন্ত্রিসভার অনুমোদন পায় সড়ক পরিবহন আইন এবং ওই বছরই সেপ্টেম্বর মাসে সংসদে পাসের পর গত ৮ অক্টোবর গেজেট প্রকাশিত হয়। ২২ অক্টোবর এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে গত ১ নভেম্বর থেকে নতুন এ আইন কার্যকর করা হয়েছে। যদিও নতুন আইনের প্রয়োগ এখনো শুরু হয়নি। এরই মধ্যে দ্রুত বিধিমালা তৈরির কাজ চলছে। বিধিমালার একটি খসড়াও তৈরি করেছে বিআরটিএ।
এর আগে মোটরযান অধ্যাদেশ, ১৯৮৩ এবং মোটরযান বিধিমালা, ১৯৮৪-এর আওতায় সড়ক পরিবহন খাত পরিচালিত হয়ে আসছিল। পুরনো আইনে লঘু শাস্তির ব্যবস্থা থাকায় তা নিয়ে সমালোচনা ছিল। সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধে ওই আইন ও বিধি ছিল অনেকটাই অকার্যকর। নতুন সড়ক পরিবহন আইনের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের ওপর এই বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিআরটিএর দৈনন্দিন কাজ সঠিকভাবে পরিচালনা করা যাবে। যেসব বিষয়ে বিধিমালা করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে মোটরযানের শ্রেণিকরণ, পরিবহন চালানো, লাইসেন্স নবায়ন ও লাইসেন্স অযোগ্য ঘোষণা বা বাতিল। এ ছাড়া চালক ও কন্ডাক্টর নিয়োগের শর্ত, নিবন্ধন, অস্থায়ী নিবন্ধনের আবেদন, মালিকানা পরিবর্তন নিয়েও বিধিমালা করা হয়েছে। কিস্তিতে মূল্য পরিশোধ, রুট পারমিট, বিদেশি নাগরিকদের আনা মোটরযান ও সেগুলোর রুট পারমিট, মোটরযান ড্রাইভিং স্কুলের নিবন্ধন, প্রশিক্ষকদের লাইসেন্স ও মোটরযান মেরামত কারখানার লাইসেন্স বিষয়েও বিধিমালা করা হয়েছে। তবে আইনে থাকা ট্রাস্টি বোর্ডের ব্যবস্থাপনা, দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা তহবিল, যাত্রী ও মোটরযানের বীমার মতো নতুন বিষয় এবং ওজন নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ দূষণ, আপিল ও সালিশের বিধিমালা করা হয়নি। এ বিষয়গুলোতে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে বিধিমালা করা হবে।
বিধিমালায় চালক নিয়োগের আগে এবং নিয়মিত বিরতিতে ডোপ টেস্ট করার প্রস্তাব রয়েছে। মালিকরাই এই ডোপ টেস্ট করবেন। এক্ষেত্রে মালিকপক্ষ প্রত্যেক জেলার সিভিল সার্জনের মাধ্যমে ডোপ টেস্টের চিকিৎসক নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে। আইনের ৪৯ (ক) ধারায় বলা আছে, মদ্যপান বা নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করে কেউ গাড়ি চালাতে পারবে না। এই ধারা বাস্তবায়নে ডোপ টেস্টের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নানা পরিবর্তন করে যেসব গাড়ি দেশে চালানো হচ্ছে, সেগুলো বন্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে বিধিমালায়। নতুন সড়ক আইন কার্যকরে যে বিধিমালা করা হচ্ছে, তাতে চালক (ড্রাইভার) ও চালকের সহকারীদের (হেলপার) ড্রেসকোড বা নির্দিষ্ট পোশাক রাখার প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। এর আইনি দিক পর্যালোচনায় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ গঠিত কমিটিও বিআরটিএর প্রস্তাবটি সমর্থন করেছে। কিন্তু পরিবহন মালিকরা জনসাধারণের মারধরের হাত থেকে ড্রাইভার ও হেলপারদের বাঁচাতে নির্দিষ্ট পোশাকের পক্ষে নন। তাদের দাবি, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ড্রাইভার, হেলপাররাই সবচেয়ে বেশি জনরোষে পড়ে। ফলে নির্দিষ্ট পোশাক থাকলে তারা (ড্রাইভার, হেলপার) বেশি সমস্যায় পড়বে। এজন্য মালিকপক্ষ বিধিমালার এ ধারাটি বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে।
নতুন সড়ক পরিবহন আইনের বিধিমালা বাস্তবায়নের পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী অন্য বিষয়গুলোর প্রতিও দৃষ্টিপাত করতে হবে। রাস্তার ওপর ও ফুটপাতে দোকানপাট, অপরিকল্পিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও ট্রাফিক পুলিশের চাঁদাবাজি, খেয়ালখুশিমতো যত্রতত্র পার্কিং, মহাসড়কের ওপর ম্যাক্সি-টেম্পোস্ট্যান্ডসহ রাস্তার মাঝখানে ডাস্টবিন ও হাটবাজার স্থাপন এবং পথচারীদের অসচেতনতাও সড়কপথে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। এ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে রোড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নিয়মনীতি মানা হয় না, সড়ক-মহাসড়কে যথারীতি সাইন-সিম্বল দেওয়া হয় না। এসব বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া যেমন প্রয়োজন তেমনি রাজধানীসহ সর্বত্র মেয়াদোত্তীর্ণ লক্কড়ঝক্কড় মার্কা গাড়ি চলতে দেওয়া যাবে না। সড়ক-মহাসড়ক তৈরির একশ বা দুইশ বছরব্যাপী মহাপরিকল্পনা থাকা দরকার। যাতে কেউ সেইসব স্থানে আগে থেকে বাড়িঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করতে না পারে। আবার মাটির রাস্তার পাশেও যেন থাকে প্রশস্ত ফুটপাত। মৃত্যুর মিছিল হ্রাস করতে সড়ক-মহাসড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা খুবই জরুরি। এক্ষেত্রে থাইল্যান্ডের দৃষ্টান্ত রয়েছে। থাইল্যান্ড ২০১১ সালে ঘোষণা করেছিল, তারা ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনার হার অর্ধেকে নামিয়ে আনবে এবং ইতিমধ্যে এ কাজে তারা সফল হয়েছে।
সড়কে স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি তৈরি করতে নতুন যে আইনটি করা হয়েছে, তা শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এই আইনের বিধিমালাকে যেমন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে, পাশাপাশি এর অপব্যবহার যাতে না ঘটে, সে বিষয়েও সচেতন হতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনার হার কমাতে চাইলে সরকারের পাশাপাশি পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এবং গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত কর্মসূচি নিয়ে অগ্রসর হওয়া উচিত।