যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে মধ্যপ্রাচ্য শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন, যাকে তিনি ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’ বলে দাবি করছেন, তার অন্তর্নিহিত অর্থ উপলব্ধি করতে হলে এটাকে পড়ে দেখার প্রয়োজন নেই। শুধু এ পরিকল্পনার প্রধান প্রণেতা ট্রাম্পের উপদেষ্টা ও জামাতা জ্যারেড কুশনারের সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটি সাক্ষাৎকারের দিকে লক্ষ করলেই চলবে। এগুলোতে দেখা যাবে মার্কিন নীতিতে এতদিন ধরে যে ইসলাম এবং ফিলিস্তিনবিদ্বেষী ধারার প্রাধান্য, তারই পুনরাবৃত্তির উদগিরণ ঘটেছে। বিখ্যাত ইংরেজ লেখক ও দার্শনিক আলডাস হাক্সলি একবার বলেছিলেন, ‘ইতিহাসের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সে ব্যক্তির কাছ থেকে নেওয়া যায়, যে ব্যক্তি ইতিহাসের শিক্ষা থেকে বেশি একটা শিখতে চান না।’ কুশনার সেই পথেই হাঁটতে বললেন সবাইকে। সিএনএনে দেওয়া এক মন্তব্যে তিনি বিশ্বকে সব ইতিহাসের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে এই চুক্তিকে পরখ করে দেখার অনুনয় করেছেন। কুশনার দাবি করেছেন, তিনি এই সংকটের ওপর অন্তত পঁচিশটি গ্রন্থ পাঠ করে এ পরিকল্পনায় হাত দিয়েছেন। কিন্তু সেই গ্রন্থগুলো যে জায়নবাদী বিদ্বেষের মন্ত্রে রচিত, তা অনায়াসেই বোঝা যায় কুশনারের এ পরকল্পনায়। কেননা তিনি দশকের পর দশক ধরে ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর জায়নবাদীদের ঘৃণিত যে আচরণ বিদ্যমান রয়েছে, তাকেই বৈধতা দিয়েছেন। ইসরায়েলি জায়নবাদীদের এ রকম একজন মুখপাত্রই তো দরকার ছিল!
ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য পরিকল্পনার নেপথ্যের প্রধান কুশীলব কুশনার নিজেই একজন ইহুদি বংশোদ্ভূত ইহুদিবাদী। মার্কিন প্রেসিডেন্ট মধ্যপ্রাচ্য পরিকল্পনার নামে যে ইসরায়েলি বর্বরতাকে স্বীকৃতি দিতে চাচ্ছেন, তার প্রধান কারণ হলো তিনি আমেরিকার জায়নবাদীদের তুষ্ট করতে চান। কেননা সামনেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আর সে নির্বাচনে তাদের সমর্থন তার প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব জায়নবাদী ধনকুবের যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন, তাদের আর্থিক সমর্থন ট্রাম্পের বড়ই প্রয়োজন। তাই তো যখন ট্রাম্প তার মধ্যপ্রাচ্য পরিকল্পনা ঘোষণা করছেন, তখন তার সামনেই হাস্যোজ্জ্বল দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে জায়নবাদী মার্কিন ধনকুবের শেলডন এডেলসন এবং তার স্ত্রী মারিয়াম এডেলসনকে। আর জায়নবাদের শিরোমণি ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে তার পাশেই দেখা গেছে। ট্রাম্পের মতো তিনিও ইমপিচমেন্টের কবল থেকে বেঁচে ফিরেছেন। ২০১৯-এর নির্বাচনে ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে তার দল। তারপর থেকেই তিনি একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিচালনা করছেন। এমনিতেই বিচারের খাঁড়ার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে তিনি দেশ চালাচ্ছেন। আগামী ২ মার্চ ইসরায়েলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নেতানিয়াহু চাইছেন এ নির্বাচনের ফলকে তিনি বিচারের হাত থেকে বাঁচার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করবেন। তিনি চাইছেন নির্বাচনের ফল এমন হোক, যাতে নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারীরা যুক্ত সরকারকে সমর্থন দিতে বাধ্য হয়। এখন বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য পরিকল্পনা নির্বাচনী ফুটবল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এটা নেতানিয়াহুকে নিশ্চিত পতন থেকে রক্ষা করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা এ মধ্যপ্রাচ্য পরিকল্পনাকে ‘সহস্রাব্দের সেরা ভাঁওতা’ বলে অভিহিত করছেন। কেন এটাকে তারা ভাঁওতা বলছেন, তার কয়েকটি প্রধান কারণ নিচে উল্লেখ করা হলো :
১. এই পরিকল্পনাটিতে ফিলিস্তিনের জনগণের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়েছে, তাদের সংশ্লিষ্টতা ছাড়াই। এটা ভাবতে অবাক লাগে যে, হাজার হাজার ফিলিস্তিনি দেশটিতে বাস করছে, শরণার্থী শিবিরে বাস করছে এবং বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাস করছে, তারা তাদের জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে কোনো মত রাখতে পারবে না। সবকিছুই ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু ঠিক করবেন! অপরদিকে, ইসরায়েল যা চাইছে বা চাইবে, তা পরিপূর্ণভাবে তারা পাবে।
২. এই পরিকল্পনাটি আন্তর্জাতিক আইনকে লঙ্ঘন করছে। এতে ইসরায়েল সেটেলমেন্টের নামে যে অবৈধ বসতি গড়ে তুলেছে এবং তাতে যে পাঁচ লাখ সেটেলার অবৈধ উপায়ে বাস করছেন, তার বৈধতা দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনে স্পষ্ট রয়েছে যে, কোনো আগ্রাসী শক্তি তাদের নাগরিককে দখলকৃত ভূমিতে রাখতে পারে না। এই আইনে আরও বলা হয়েছে, যে কেউ যদি যুদ্ধে জয়লাভ করে, তাহলেও সে ভূমির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারবে না।
৩. এ পরিকল্পনা অনুযায়ী, পশ্চিম তীরের একটা বড় অংশ অবৈধভাবে দখল করার পর আপাতত চার বছর ধরে ইসরায়েল আর বাড়তি সেটেলমেন্ট স্থাপন করতে পারবে না। এই সময়ের মধ্যে পরিকল্পনার ছক অনুযায়ী, চূড়ান্ত সমাঝোতা সম্পন্ন হবে। অথচ বিশ বছর ধরে ফিলিস্তিন মার্কিন প্রহরার মাঝে ইসরায়েলের সঙ্গে সমাঝোতা করে আসছে। এটা যেন সেই শিয়ালের মুরগি পাহারা দেওয়ার গল্পের মতো। যদি ফিলিস্তিন এ পরিকল্পনা মেনে নেয়, তাহলে চার বছর নিষ্ফল আলোচনার পর ইসরায়েল বাকি ফিলিস্তিনি ভূখন্ড দখল করে ফেলবে।
৪. এ পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনিদের নিজের ভূখন্ডের ওপর সীমিত নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয়েছে।
৫. ফিলিস্তিন রাষ্ট্রটিতে সড়কপথ ও সেতুর সংযোগ গড়ে তোলা যাবে না, যাতে ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলি জনগণের কাছ থেকে দূরে থাকতে পারে।
সর্বোপরি, এ পরিকল্পনা স্বাধীন ফিলিস্তিন ভূখন্ড প্রতিষ্ঠার লড়াইকে চপেটাঘাত করেছে। তাই তো ফিলিস্তিনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট এ একপেশে পরিকল্পনা না দেখেই প্রত্যাখ্যান করেছেন। যেখানে ট্রাম্প এটাকে বলছেন ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’, সেখানে মাহমুদ আব্বাস বলছেন ‘শতাব্দীর সেরা চপেটাঘাত’। কিন্তু তিনি এ আগ্রাসী শক্তি ইসরায়েল এবং তাদের মদদদাতাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অসহযোগিতার ঘোষণা দিতে পারেননি। ট্রাম্পের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আরও শক্ত অবস্থান তার নেওয়া উচিত ছিল বলে মনে করেন মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞরা। ২০০০ সালে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের অসংবাদিত নেতা ইয়াসির আরাফাত যখন ইসরায়েলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইহুদ বারাকের সঙ্গে কোনো চুক্তি না করে ক্যাম্প ডেভিড থেকে খালি হাতে ফিরতে বাধ্য হোন, তখন তিনি দ্বিতীয় ইন্তিফাদার ঘোষণা দিয়েছিলেন।
বর্তমানে ফিলিস্তিনের যে সরকার রয়েছে, তাদের ইসরায়েল এবং আমেরিকার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অসহযোগিতার পথ বেছে নেওয়াই সর্বোত্তম পন্থা হতে পারে। তাদের ওসলো প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে বাধ্য করার কূটনৈতিক প্রয়াস চালাতে হবে। তাহলেই ইসরায়েলি আগ্রাসনে যেভাবে বসতি উচ্ছেদ, ভূমি দখল চলছে, তার বিরুদ্ধে প্রকৃত প্রতিবাদের সূচনা করা যাবে। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনয়নের একমাত্র পথ হলো জায়নবাদের নামে যে বর্ণবাদী মতাদর্শের আগ্রাসন চলছে এবং তার ওপর ভিত্তি করে ইহুদি রাষ্ট্র নির্মাণের কাজ অব্যাহত আছে, সেই মতাদর্শ এবং এর ইন্ধনদাতাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াই এবং এর সমূলে উৎপাটন। আর স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও এ লড়াইয়ের আরেকটি চূড়ান্ত লক্ষ হওয়া উচিত।
লেখক : সাংবাদিক
anindyaarif1981@gmail.com