জকোভিচের শক্তির উৎস

টেনিস কোর্টে তার লড়াই দেখলে মনে হয় গ্ল্যাডিয়েটরের কথা। হারার আগে কখনই হারেন না নোভাক জকোভিচ। বরং পিছিয়ে পরেও ইস্পাতকঠিন খুনে মানসিকতায় প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার নজির আছে অজস্র।

কোথায় পেলেন তিনি এমন লড়াই করার মানসিকতা?

যুদ্ধ থেকে। জকোভিচের বয়স তখন ১২ বছর। যুগোসøাভিয়ার প্রেসিডেন্ট তখন সেøাবোদান মিলোসেভিচ। সার্ব এবং ক্রোয়াটদের গৃহযুদ্ধের মূল হোতা এই সার্ব নেতাকে হটাতে চাইল ন্যাটো (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন)। বেলগ্রেডে বেজে উঠল যুদ্ধর সাইরেন। ২৪ মার্চ ১৯৯৯তে সার্বিয়াতে বোমাবর্ষণ শুরু করল ন্যাটো। সেই বোমার প্রত্যক্ষ শিকার ছিল জকোভিচের পরিবার। বেলগ্রেডে এফ-১১৭ বোমারু বিমান থেকে ফেলা বোমার শব্দে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন জকোভিচের মা ডায়ানা। সেই বোমায় মারা যেতে পারতেন কিশোর জোকারও। এমন মৃত্যু উপত্যকার মধ্যে টেনিস অনুশীলন করতেন তিনি। আত্মজীবনীতে নোভাক জানিয়েছেন যুদ্ধের সময় তার টেনিস অনুশীলনের কথা। রাতে কোথায় বোমারু বিমান হানা দিয়েছে সকালে সেই জায়গা খুঁজে বের করতেন বালক জকোভিচ আর তার কোচ। কারণ কেউ তাদের বলেছিলেন, ‘বোমারু বিমান কখনো এক জায়গায় পরপর দুবার আক্রমণ চালায় না।’

এবার অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে ডমিনিক তিমকে পাঁচ সেটের রোমাঞ্চকর ফাইনালে হারিয়ে সেই রক্তক্ষয়ী সার্বিয়ার স্মৃতি মনে করেছেন জকোভিচ। জানিয়েছেন কঠিন লড়াইয়ের মানসিকতা তিনি পেয়েছেন যুদ্ধবিধ্বস্ত বেলগ্রেডের বাস্তব জীবন থেকে। গৃহযুদ্ধের সময় প্রাণ হাতে রাস্তায় রুটির জন্য লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে বর্তমানের ১৭ গ্র্যান্ড সø্যামের মালিককে। সেই স্মৃতির কথা মনে করে জকোভিচ বলেন, ‘সত্যি বলতে আমি উঠে এসেছি একেবারে শূন্য থেকে। কিশোর বয়স থেকে কঠোর জীবন সংগ্রামের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে আমাকে, আমার পরিবারকে এবং আমার দেশের মানুষকে। সেই কারণেই হয়তো এখন আমি বাড়তি লড়াই করতে পারি।’

বলকান অঞ্চলের কঠিন যুদ্ধটাই আসলে তৈরি করেছিল জকোভিচকে। টানা ১১ সপ্তাহ ধরে ন্যাটো বোমা ফেলেছিল সার্বিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে। কসোভো থেকে সার্বরা উচ্ছেদ হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জেতার পর সেই স্মৃতি মনে করে জকোভিচ বলেন, ‘দেশের খুব কঠিন এক সময়ে আমার জন্ম। বেড়ে ওঠা যুদ্ধের মধ্যে। সেই সময় আমার দেশের ওপর নানারকম নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়েছিল। জীবনধারণের জন্য খুব প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসÑ যেমন রুটি, দুধ, জলের জন্য আমাদের প্রতিদিন লাইনে দাঁড়াতে হতো। এই সংগ্রামই (বলকান যুদ্ধ) ছোট থেকে আমার মধ্যে লড়াকু মানসিকতা তৈরি করে দিয়েছে। এটাই আমার আসল শক্তির উৎস। যে যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে আমি উঠে এসেছি, তা আমাকে সব সময়ই ভালো কিছু করার জন্য অনুপ্রাণিত করে। আরও কঠিন লড়াইয়ের জন্য উদ্বুদ্ধ করে।’

সত্যিকার অর্থেই বোমারু বিমানের আতঙ্ক মাথায় নিয়ে এক কিশোরের জীবন-সংগ্রামের তুলনায় টেনিস কোর্টে এক চ্যাম্পিয়নের লড়াই কঠিন কিছু নয়। তাই অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের সেমিফাইনালে রজার ফেদেরারের মতো কিংবদন্তির বিপক্ষে ৪-০ ও ০-৪-এ পিছিয়ে পড়ার পরও শান্ত থেকে প্রথম সেট জিতে নিতে পারেন তিনি। কিংবা ফাইনালের থ্রিলার জয় তার কাছে সহজ মনে হয়।

জকোভিচের গ্র্যান্ড সø্যাম সংখ্যা ১৭টা। এর আটটি জিতেছেন অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে। ১৯টা গ্র্যান্ড সø্যাম নিয়ে তার সামনে আছেন স্প্যানিশ তারকা রাফায়েল নাদাল। ২০টা গ্র্যান্ড সø্যামের মালিক ফেদেরার আছেন সবার আগে। যার কিশোর বয়সের স্মৃতি যুদ্ধাতঙ্কে ভরা। যিনি বোমারু বিমানের ভয় পেছনে ফেলে এতদূর আসতে পেরেছেন তার পক্ষে দুটি গ্র্যান্ড সø্যামের দূরত্ব অতিক্রম করা বোধহয় কঠিন হবে না।