সাধারণত যেকোনো পে-কমিশনেরই দুটো উদ্দেশ্য থাকে এক. জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণার মধ্য দিয়ে সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে সময়োপযোগী করা; দুই. বিভিন্ন গ্রেডে কর্মরতদের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য নিরসন এবং বিভিন্ন গ্রেডের সমপর্যায়ের নানা পদের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করা। এ লক্ষ্যে এ পর্যন্ত আটটি পে-কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করেছে সরকার। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অনুমোদিত ও পে-কমিশনে ঘোষিত কিছু সিদ্ধান্ত বাস্তবে প্রয়োগ হচ্ছে না। দুঃখজনক বিষয় হলো বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা সব সুবিধা পেলেও বেশকিছু ক্ষেত্রে কেবল কর্মচারীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষত, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীরা এমন বৈষম্যের বড় শিকার। অথচ, সরকারের মোট ১৩ লাখ ৪২ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। ২০১৭ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী তাদের সংখ্যা ৮ লাখ ২৬ হাজার।
বুধবার দেশ রূপান্তরে ‘এক পদে দুই বেতন’ শিরোনামের প্রতিবেদনে একই গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে বেতন বিশৃঙ্খলার নানা দিক তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে উঠে আসে সরকারি কর্মচারীদের এক বিরাট অংশ উচ্চ গ্রেডের সংকটে ভুগছেন। একই দিনে একই পদে যোগদান করে কেউ বেতন পাচ্ছেন ১১তম গ্রেডে আবার কেউ বেতন পাচ্ছেন ১৩তম গ্রেডে। একই অবস্থা ১৪ ও ১৬তম গ্রেডেও। কয়েকটি মন্ত্রণালয় এসব গ্রেডে উচ্চতর গ্রেড সুবিধা দিয়েছে, আবার কোনো কোনো মন্ত্রণালয় দেয়নি। যারা উচ্চতর গ্রেড পেয়ে অতিরিক্ত বেতনভাতা ভোগ করছেন তাদের ক্ষেত্রে যেকোনো সময় অডিট আপত্তি আসতে পারে। এতে ভোগকৃত সব সুবিধা ফেরত দেওয়ার আতঙ্কে আছেন তারা। অন্যদিকে, যেসব ক্ষেত্রে কর্মচারীরা উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা পাচ্ছেন না তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। ১১ ও ১৩তম এবং ১৪ ও ১৬তম গ্রেডের এসব কর্মচারী মূলত কম্পিউটার অপারেটর, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর, সাঁটমুদ্রাক্ষরিকের মতো বিভিন্ন কারিগরি বা টেকনিক্যাল পদে কাজ করেন।
দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ১৯৮৫ সাল থেকে কম্পিউটার অপারেটর পদে সরাসরি নিয়োগে গ্রেড ১৩ এবং ইন সার্ভিস ডিপার্টমেন্টাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তাদের ১১তম গ্রেডে বেতনভাতা দেওয়া হতো। ১৬তম গ্রেডের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর পদেও বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তাদের ১৪তম গ্রেড সুবিধা দেওয়া হতো। ২০১০ সাল থেকে সাঁটমুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর পদেও সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে ১৩তম গ্রেড এবং বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সাপেক্ষে তাদের ১১তম গ্রেড দেওয়া হয়। তাদের পাশাপাশি ১৯৮৬ সাল থেকে অফিস সহকারীরাও দুটি অগ্রিম ইনক্রিমেন্ট সুবিধা পেয়ে আসছিলেন। অন্যদিকে, অর্থ বিভাগ ২০১৮ সালের ৩০ জুলাই এক ইউওনোটের মাধ্যমে উচ্চতর বেতন গ্রেডের এসব সুবিধা বাতিল করার আদেশ জারি করে। যাতে ভূতাপেক্ষভাবে ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেল জারির দিন অর্থাৎ ১ জুলাই থেকে উচ্চতর গ্রেড সুবিধা বন্ধ করা করার কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে, লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, সরকার জারিকৃত প্রজ্ঞাপন, বেতনবৈষম্য দূরীকরণ সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সিদ্ধান্ত ও প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে জারিকৃত কোনো সাধারণ আদেশ ‘ইউওনোট’-এর মাধ্যমে বাতিল করা বিধিসম্মত নয় বলেই মনে করেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন অনুবিভাগ প্রায়োগিক ক্ষেত্রে উচ্চপর্যায়ে অনুমোদিত সিদ্ধান্তের ব্যত্যয় ঘটাচ্ছে।
এভাবে তৃতীয় শ্রেণির সংখ্যাগরিষ্ঠ কর্মচারীরা বঞ্চিত হচ্ছে। এসব গ্রেডে কেবল সচিবালয় নয়, সারা দেশের জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, বিশেষায়িত সংস্থা, করপোরেশন, বিধিবদ্ধ ও সাংবিধানিক সংস্থায় কর্মরত কর্মচারীরাও এমন বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠে থাকা সরকারের কর্মকর্তারা পে-কমিশনের সব সুযোগ-সুবিধাই ভোগ করছেন। দেখা যাচ্ছে বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া নবম থেকে উচ্চতর গ্রেডসমূহে কর্মকর্তাদের কোনো সুবিধা কর্তনের নজির নেই। কিন্তু ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা নানা সময়ে এ ধরনের বৈষম্যের শিকার। এমনকি পে-কমিশনের সুপারিশের বাইরে গিয়েও কর্মকর্তাদের অনেক সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারা গাড়ির জন্য বিনা সুদে ৩০ লাখ টাকার পাশাপাশি গাড়ির তেল ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাসিক ৫০ হাজার টাকা পাচ্ছেন। অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ে টেলিফোন বিল দ্বিগুণ করে অব্যবহৃত বিলের টাকা নগদে গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এমন বৈষম্য প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের জন্য যেমন ক্ষতিকর তেমনি এর আর্থ-সামাজিক প্রভাবও নেতিবাচক। এ ধরনের বৈষম্য নিরসন করে কর্মচারীদের বেতনভাতা ও সুযোগ-সুবিধায় শৃঙ্খলা আনতে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।