করোনাভাইরাস : লড়ছে নবজাতক, আক্রান্ত সামাজিক জীবন

জন্মের মাত্র দুই দিনের মধ্যেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বিশ্বগণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে একটি চীনা শিশু। এ ভাইরাসের কারণে সারা পৃথিবী থেকেই যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে চীন। প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাণিজ্য ব্যবস্থায়। আর আক্ষরিক অর্থেই বদলে গেছে চীনের সামাজিক জীবনও। লিখেছেন পরাগ মাঝি

আক্রান্ত চীনা শিশু

জন্মের মাত্র ৩০ ঘণ্টার মধ্যেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে এক চীনা নবজাতক। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে সবচেয়ে কমবয়সী করোনাভাইরাস আক্রান্ত হিসেবে তাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। করোনাভাইরাসের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পাওয়া চীনের উহান শহরেই গত ২ ফেব্রæয়ারি জন্ম হয় শিশুটির। ৫ ফেব্রুয়ারি বিকালে চীনা গণমাধ্যম আক্রান্ত শিশুটির খবর প্রকাশ করে।

বিবিসি’র বরাতে জানা গেছে, শিশুটির জন্মের আগেই তার মায়ের শরীরে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় না জন্মের পর শিশুটির শরীরে ভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছে তা নিয়ে চিকিৎসকরাও ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছেন। জন্মের সময় শিশুটির ওজন ছিল প্রায় সোয়া তিন কেজি। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শিশুটির অবস্থা এখন স্থিতিশীল রয়েছে এবং তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

চীনের এই ভাইরাসের সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লেও শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার হার এখনো তুলনামূলক কম। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দেশটিতে ৫৬৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, আর এতে আক্রান্ত হয়েছে ২৮ হাজারেরও বেশি মানুষ।

কীভাবে আক্রান্ত হলো শিশুটি

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুটির জন্মের পূর্বেই হয়তো তার মায়ের গর্ভে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল। চীনের উহানে অবস্থিত একটি শিশু হাসপাতালের নবজাতক বিভাগের প্রধান ঝেং লিংকং বলেন, ‘মায়ের কাছ থেকে শিশুর মাঝে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রটিতে আমাদের আরও মনোযোগ দিতে হবে।’

তবে এও ধারণা করা হচ্ছে যে- মাতৃগর্ভে নয়, করোনাভাইরাস আক্রান্ত মায়ের কাছাকাছি অবস্থান কিংবা যোগসূত্রের কারণেই শিশুটিও আক্রান্ত হয়েছে। এ সম্পর্কে বিজনেস ইনসাইডারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির মাইলাম স্কুল অব পাবলিক হেলথ-এর সংক্রমণ বিশেষজ্ঞ স্টিফেন মোর্স বলেন, ‘অন্য মানুষরা যেভাবে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয় শিশুটিও হয়তো সেভাবেই আক্রান্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে তার মায়ের কাশি থেকে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাস নিঃশ্বাসের মাধ্যমে শিশুটির শরীরে প্রবেশ করে থাকতে পারে।

করোনাভাইরাস সংক্রমণে শিশুদের হার

চীনের চলমান করোনাভাইরাস মহামারীতে খুব কম সংখ্যক শিশুই এতে আহত হয়েছে। এই ভাইরাস গোত্রেরই অন্য দুটি সাম্প্রতিক মহামারী যেমন- সার্স এবং মার্স ভাইরাসেও শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার হার তুলনামূলক কম ছিল।

জার্নাল অফ আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৪৯ থেকে ৫৬ বছর বয়সীরাই সবচেয়ে বেশি। প্রতিবেদনে এও বলা হয়েছে যে- এ ভাইরাসে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার হার খুবই কম। একইভাবে, ২০১৬ সালে সংঘটিত মার্স মহামারীতেও শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার হার খুবই কম ছিল। এই ধরনের ভাইরাসে শিশুদের কম আক্রান্ত হওয়ার কারণ এখনো সুস্পষ্টভাবে জানা যায়নি।

চীনের নবজাতক ছাড়াও সিঙ্গাপুরে ছয় মাস বয়সী এক শিশু করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া উহানে বসবাস করা আট বছর বয়সী একটি শিশুর মধ্যেও এই ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। জানা গেছে, ওই শিশুটি বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছে। উহান থেকে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি দেওয়ার পর তার শরীরে ভাইরাসটির উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়।

সাম্প্রতিক করোনাভাইরাস ইতিমধ্যেই পৃথিবীজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। চীনের বাইরে ২৫টি দেশে অন্তত ১৯১ জন করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীকে শনাক্ত করা হয়েছে। চীনের বাইরে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। এই রোগের প্রাথমিক উপসর্গ হিসেবে সবার প্রথমেই সংক্রমিত ব্যক্তির গায়ে জ্বর আসে। এর পাশাপাশি শুকনো কাশিও দেখা দেয়।

আর কী কী হচ্ছে

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা থেকে ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে জরুরি স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি করেছে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি সংস্থাটির প্রধান টেড্রস আধানম গোবিয়াসেস করোনাভাইরাস মোকাবিলায় ৩ মাসের কর্মপরিকল্পনায় ৬৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের তহবিল আহŸান করেছেন। এই তহবিলের বেশিরভাগ অর্থই ভাইরাসটি যেসব দেশে সংক্রমিত হয়েছে সেসব দেশে ব্যয় করা হবে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২৪টি দেশে ৫ লাখেরও বেশি মাস্ক এবং ৪০ হাজার শ্বাসযন্ত্র প্রেরণ করা হবে।

এছাড়া করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এর মধ্যে চীনা নাগরিকদের সমস্ত ভিসা বাতিল করেছে ভারত। এ অবস্থায় চীনা নাগরিকদের আবারও নতুন করে ভারতীয় ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে এবং যাচাই বাছাইয়ের পর সিদ্ধান্ত নেবে ভারতীয় কর্র্তৃপক্ষ।

চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে আসা লোকজনকে ১৪ দিন বাধ্যতামূলকভাবে কোয়ারেন্টাইনে রাখার নির্দেশ দিয়েছে হংকং। তবে চীনের সঙ্গে সীমান্ত পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার আহ্বান এখনো বিবেচনা করছে না হংকং। যদিও চিকিৎসাকর্মীরা এমন দাবি তুলেছেন। এছাড়া তিন জনের শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত করার ফলে হংকং-এর একটি বন্দরে একটি প্রমোদতরীতে ৩৬০০ যাত্রী আটকা পড়ে আছেন।

জাপানের ইয়োকোহামা বন্দরেও একটি প্রমোদতরীতে মোট ২০ জনের দেহে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। জাহাজটিতে ৩ হাজার ৭০০ আরোহী ছিল। সবশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তাদের প্রায় ৩০০ জনের দেহে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি আছে কি না তা পরীক্ষা করা হয়েছে। সংক্রমিত লোকদের একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তবে বাকিদের জাহাজেই কোয়ারেন্টাইনে করে রাখা হয়েছে।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, তাইওয়ান কর্র্তৃপক্ষ তাদের বন্দরে যে কোনো ধরনের প্রমোদতরী ভেড়াতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এছাড়া মূলভূমি চীন থেকে কোনো মানুষের প্রবেশেও সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে তাইওয়ান। নাগরিকদের চীন ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সৌদি আরব।

চীনের উহান থেকে ফেরত যাওয়া অন্তত সাড়ে তিনশো নাগরিককে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি সামরিক ঘাঁটিতে বিচ্ছিন্ন করে রেখে তাদের নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যুক্তরাষ্ট্র।

গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান তেসলা চীনের উদ্দেশ্যে তাদের নতুন মডেলের চালান বিলম্বিত হবে বলে ঘোষণা করেছে।

চীনা কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে তারা তাদের প্রচেষ্টা বৃদ্ধি করেছে। বিশেষ করে হুবেই প্রদেশে এই প্রচেষ্টাকে তারা আরও জোরদার করেছে। করোনাভাইরাসের মূল কেন্দ্র উহান শহর এই হুবেই প্রদেশেরই অন্তর্ভুক্ত। সেখানে ইতিমধ্যেই খুব দ্রুততার সঙ্গে দুটি বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপনের পাশাপাশি অন্তত ১১টি পাবলিক ভেন্যুকে রোগীদের জন্য অস্থায়ী ওয়ার্ডে পরিণত করা হয়েছে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি উহানের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শহরটিতে এখনো রোগীর বিছানা এবং অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব রয়েছে। তবে, কর্র্তৃপক্ষ বিভিন্ন হোটেল এবং স্কুলকে অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রে পরিণত করার কার্যক্রম শুরু করেছে। হুবেই এবং ঝেজিয়াং প্রদেশের কয়েক মিলিয়ন লোককে বলা হয়েছে যে, প্রতি পরিবারের মাত্র একজন লোক দুই দিন পর পর বাড়ির বাইরে যেতে পারবে।

বিশ্ববাণিজ্যে প্রভাব

চীনে করোনাভাইরাস সংক্রমণ বৈশ্বিক বাণিজ্যেও বিপুল প্রভাব ফেলেছে। যেসব শিপিং কোম্পানি সমুদ্রপথে চীন থেকে বিভিন্ন দেশে মালামাল পরিবহন করে তারা উল্লেখযোগ্য হারে মালবাহী জাহাজের সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে। এতে বিশ্ব সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘœ ঘটতে শুরু করেছে। এক দেশ থেকে অন্য দেশে যত পণ্য পরিবহন করা হয়, তার ৮০ শতাংশই হয় সমুদ্রপথে। আর পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যস্ত ১০টি কনটেইনার বন্দরের মধ্যে সাতটিই চীনে। এছাড়া দেশটির কাছাকাছি সিঙ্গাপুর এবং দক্ষিণ কোরিয়াতেও বিশাল আয়তনের বন্দর রয়েছে। এই বন্দরগুলোতেও করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রভাব পড়েছে। এমন পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব বাণিজ্যব্যবস্থায় ভয়াবহ সংকট দেখা দিতে পারে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ইতিমধ্যেই দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থিত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘হুন্দাই’ তাদের বেশ কয়েকটি প্লান্টের উৎপাদন স্থগিত করেছে। কোম্পানির পক্ষ থেকে এর জন্য করোনাভাইরাস পরিস্থিতিকেই দায়ী করা হয়েছে।

এছাড়া চীনের বিভিন্ন শহর-বন্দর বন্ধ ঘোষণা করার অর্থ হলো- চীনগামী বেশ কিছু জাহাজ এখন সমুদ্রে ভাসমান ও ঠিকানাবিহীন অবস্থায় অলস সময় কাটাচ্ছে। আবার চীনা বন্দরগুলোতেও অসংখ্য জাহাজ আটকা পড়ে আছে। এসব জাহাজের মধ্যে থাকা বিভিন্ন কনটেইনারে পচনশীল বিভিন্ন পণ্যও রয়েছে। এছাড়া চীন থেকে বিভিন্ন দেশে যাওয়া জাহাজের মাল খালাসেও বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে সিঙ্গাপুর এবং অস্ট্রেলিয়ায় তাদের বন্দরগুলোতে চীন থেকে যাওয়া জাহাজগুলোকে আলাদা করে রাখা হয়েছে। এসব জাহাজের ক্রুরা যদি করোনাভাইরাস মুক্ত হয় তবেই তাদের বহন করা মাল খালাস করা হবে। এছাড়া নিউজিল্যান্ডের একটি বন্দরে ২০০ টন জীবন্ত চিংড়ি আটকা পড়ে আছে। কারণ জরুরি ভিত্তিতে অসংখ্য চীনা প্রতিষ্ঠান তাদের আমদানি অর্ডার বাতিল করেছে। এ অবস্থায় নিউজিল্যান্ডের মৎস্যসম্পদমন্ত্রী স্টুয়ার্ট ন্যাশ বলেছেন, আটকেপড়া জীবন্ত চিংড়িগুলোর মধ্যে কিছু অংশ আবারও সমুদ্রে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু এই ধরনের পরিস্থিতি নিশ্চিতভাবেই এই শিল্পকে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

আশঙ্কা করা হচ্ছে, করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়তে পারে এই বছরই জাপানে অনুষ্ঠিতব্য টোকিও অলিম্পিকে। এছাড়া করোনাভাইরাস আতঙ্কের কারণে ডিজনি কোম্পানি অন্তত ২৮০ মিলিয়ন ডলার লোকসানের মুখোমুখি হয়েছে।

বদলে যাচ্ছে সামাজিক জীবন

করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রভাবে চীনা জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এর আগে ২০০৩ সালে যখন সার্স ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছিল তখন চীনের গণপরিবহন জীবাণুমুক্ত করতে প্রচুর স্প্রে করা হতো। এর উদ্দেশ্য ছিল প্রথমত, ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই আর দ্বিতীয়ত মানুষকে দেখানো রহস্যময় নতুন ভাইরাসের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সেই সময়গুলোতে গণপরিবহনে অনেক সময় যাত্রীরা না বুঝেই পরিচ্ছন্ন আসনে বসে পড়তেন, পরে দেখা যেত তার ট্রাউজার ধবধবে সাদা হয়ে গেছে।

এবার পরিস্থিতি ভিন্ন কারণ কর্র্তৃপক্ষ এক কোটিরও বেশি মানুষের শহরে গণপরিবহন বন্ধ করে দিয়েছে এবং লোকজনকে ঘরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে।

শহরের আটকেপড়া অধিবাসীরা এখন মহামারীর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সৃষ্টিশীল চিন্তাভাবনা শুরু করেছ। সিএনএন-এর বরাত দিয়ে জানা গেছে, চীনের ট্রেনগুলোতে যাত্রীর সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে অন্তত ৮০ শতাংশ কমে গেছে। অথচ মাত্র কয়েকদিন আগেই চীনা নববর্ষ শেষ হয়েছে। বছরের এই সময়টিতে সাধারণত ট্রেন ও অন্য চীনা যানগুলোতে যাত্রীদের ঠাসাঠাসি অবস্থায় দেখা যায়।

অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় চীনে মুখের মাস্ক বেশি ব্যবহৃত হয়। চীনা শহরগুলোর মাত্রাতিরিক্ত বায়ুদূষণ এর অন্যতম কারণ। এছাড়া জনসমাগম বেশি এমন জায়গায় জীবাণু সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকতে, মেকআপ ঠিক রাখতেও মাস্ক ব্যবহার করে থাকে চীনা নাগরিকরা। ফলে  এবারের মহামারীর কারণে চীনসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে মাস্কের সংকট দেখা দিয়েছে। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, করোনাভাইরাস থেকে মুক্ত থাকার জন্য শুধু মাস্ক যথেষ্ট নয়- হাত ধোয়াটাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

করোনাভাইরাস আতঙ্কে চীনের ডেলিভারি সার্ভিসগুলোও নতুন পন্থা বের করেছে। তারা লকার ব্যবহারে উৎসাহিত করছে সরাসরি সাক্ষাৎ এড়ানোর জন্য। ভবনের ভেতরে লিফটগুলোতে টিস্যু বা টুথপিক রাখা হচ্ছে। এগুলো দিয়েই মানুষ হাতের স্পর্শ ছাড়া লিফটের বাটনে চাপ দিচ্ছে।

প্রভাব পড়ছে বিয়ে শাদিতেও। চীনা জুটিগুলোর বিয়ের জন্য ‘০২-০২-২০২০’ তারিখটি ছিল বিশেষ একটি দিন। তবে বেইজিং ছাড়া অন্যত্র কর্র্তৃপক্ষ বড় জমায়েত এড়াতে বিয়ে রেজিস্ট্রি বন্ধ ঘোষণা করেছে।

আরও একটি ঘটনা হলো- সম্প্রতি চীনের সিচুয়ান প্রদেশে ৫ দশমিক ১ মাত্রার ভ‚মিকম্প অনুভ‚ত হয়েছে যেটি উহানের এক হাজার কিলোমিটার পশ্চিমে। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছিলেন এজন্য যে- তারা বুঝতে পারছিলেন না ভ‚মিকম্পে ঘরের ভেতরে থেকে চাপা পড়ে মরবেন নাকি বাইরে গিয়ে করোনাভাইরাসের কবলে পড়বেন।

এদিকে, স্কুল কলেজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অসংখ্য চীনা শিক্ষার্থী ও শিক্ষক তাদের সম্পর্ককে নিয়ে গেছেন অনলাইনে। চীনের রাষ্ট্রীয় পত্রিকা গ্লোবাল টাইমস বলছে, পহেলা ফেব্রুয়ারির পর এক কোটি বিশ লাখ শিক্ষার্থী অনলাইনে শিক্ষাগ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেছে।

বিব্রতকর পরিস্থিতিতে আছেন, করোনাভাইরাস আক্রান্তদের হাসপাতালে  যেসব কর্মী কাজ করছেন তারাও। সম্প্রতি একটি ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা গেছে, একজন নার্স তার কন্যার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কর্মস্থলে যাচ্ছেন। আর কান্নারত অবস্থায় তারা দূর থেকে একে অপরকে জড়িয়ে ধরার সান্তনা নিচ্ছেন। মনে হচ্ছিল যেন- এই বিদায় চিরদিনের জন্য।