কোটিপতি হওয়ার ধান্দা ছিল পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও পিয়নদের!

বাংলা ট্র্যাক কমিউনিকেশন্স লিমিটেড (বাংলা ক্যাট) নামের ভারী যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ৬০ লাখ টাকা চুরি করেও নিয়মিত অফিস করছিলেন কর্মচারীরা। সন্দেহের ঊর্ধ্বে থাকতে স্বাভাবিক আচরণ করে যাচ্ছিলেন দিনের পর দিন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। গত বুধবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দাদের (ডিবি) হাতে গ্রেপ্তার হন প্রতিষ্ঠানের ৪ কর্মচারী। তারা হলেন অফিস সহকারী (পিয়ন) দুই ভাই জাকির হোসেন ও আরিফ হোসেন, লিটন মিয়া ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী আসাদুল ইসলাম। আরেক অফিস সহকারী আব্বাসকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে ডিবি পুলিশ। গ্রেপ্তার চারজনকে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গতকাল বৃহস্পতিবার আদালতের মাধ্যমে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়েছে তারা।

ডিবির উত্তর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মশিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্রেপ্তার চারজন আমাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চুরির কথা স্বীকার করেছেন। তাদের হেফাজত থেকে ৫৪ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি টাকার হদিস পাওয়ার জন্য পলাতক আরেক পিয়নকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’ তিনি বলেন, ‘কম বেতনের এসব কর্মচারী কোটিপতি হওয়ার লোভে নিজ অফিসের কর্মীদের বেতনের টাকাই চুরি করেন। এটা আমাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য অ্যালার্মিং। এর আগে বনানীতেও এ ধরনের কর্মচারীর হাতে প্রাণ হারিয়েছেন চীনা ব্যবসায়ী। কাছে থাকা নগদ টাকার লোভে তার বাসার কর্মচারীরাই তাকে হত্যা করে। কাজেই সব প্রতিষ্ঠানের উচিত তার অধস্তন কর্মচারীদের সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের জন্য সিসিটিভি ক্যামেরা ঠিক আছে কি না পরীক্ষা করা। পাশাপাশি নগদ টাকা রাখার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা।’

তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, ডিবির প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা চুরির কথা স্বীকার করে জানিয়েছেন, তাদের কম বেতনে সংসার চলত না। তাই চাকরি ছেড়ে ব্যবসার পুঁজি জোগাড়ে প্রতিষ্ঠানের টাকা চুরির পরিকল্পনা করেন। সেই মোতাবেক গত ১০ ডিসেম্বর অফিসের সিসিটিভির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখেন। তারপর অফিস বন্ধের দিন ৩০ জানুয়ারি আলমারির ড্রয়ার ভেঙে টাকা চুরি করেন। অফিসের কেউ যাতে তাদের সন্দেহ করতে না পারেন, সে জন্য তারা নিয়মিত অফিসও করেন স্বাভাবিকভাবে। পরিকল্পনা ছিল  পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে একযোগে চাকরি ছেড়ে চুরির ওই টাকা ভাগাভাগি করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দাঁড় করাবেন। কিন্তু তার আগেই ধরা পড়েছেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তারা জানান, ৩ ফেব্রুয়ারি বনানী থানায় ‘বাংলা ট্র্যাক কমিউনিকেউশন্স লিমিটেডের’ পক্ষ থেকে ৬০ লাখ টাকা চুরির অভিযোগে মামলা হয়। মামলার ছায়া তদন্তে নেমে তারা অফিসের পাঁচজনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পান।

এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বুধবার বনানীর অফিস থেকে প্রথমে একজনকে; পরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করেন। এ সময় চুরি হওয়া ৬০ লাখ টাকার মধ্যে ৫৪ লাখ টাকা উদ্ধার করা সম্ভব হয়। বাকি টাকা কারা কীভাবে খরচ করেছে কিংবা অন্য কোথাও সরিয়ে রাখা হয়েছে কি না, তা জানার জন্য আব্বাস নামে আরেক পিয়নকে খোঁজা হচ্ছে।

চুরির ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে রাশেদ আল-আমিন নামে এক কর্মকর্তা গত মঙ্গলবার বনানী থানায় মামলা করেন। পরে মামলা তদন্তের ভার ডিবি পুলিশের ওপর ন্যস্ত হয়। মামলায় বলা হয়, ‘বাংলা ট্র্যাক কমিউনিকেশন্স লিমিটেডের’ বিনিয়োগ বিভাগের প্রধান আশরাফুজ্জামান চৌধুরীর তত্তাবধানে থাকা আলমারির ড্রয়ার ভেঙে ওই টাকা নিয়ে যায় চোরের দল। ড্রয়ারটি ছিল তছনছ অবস্থায়। টাকাগুলো তিনি গত মাসের শেষের দিকে সেখানে রাখেন। ৩০ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রæয়ারি অফিস বন্ধ ছিল। তার ধারণা, ওই সময়ের মধ্যে টাকাগুলো চুরি হয়।

যেভাবে শনাক্ত হয় চোরের দল : ডিবির এক কর্মকর্তা জানান, তদন্তকালে অফিসের সন্দেহভাজন কর্মচারীদের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে প্রযুক্তির সহায়তায় চোরের দলকে শনাক্ত করা হয়। প্রযুক্তির সহায়তায় চুরির সময় ঘটনাস্থলে পাঁচজনের মোবাইল ফোনের উপস্থিতি ধরা পড়ে। এতে সহজেই তাদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়। প্রথমে অফিস সহকারী জাকির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারপর তার দেওয়া তথ্য অনুয়ায়ী বাকি তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে জাকির আরও জানান, ধনী হওয়ার উপায় খুঁজতে খুঁজতে আলমারির ড্রয়ারে লাখ লাখ টাকা দেখে চুরির মতলব মাথায় আসে। এ জন্য তিনি কয়েক মাস আগে থেকেই সেখানে মোটা অঙ্কের টাকা জমা হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। অফিস সহকারী হওয়ায় আশরাফুজ্জামানের ওই ড্রয়ারে কত টাকা কবে আসে তার হিসাব জানা ছিল তার। সেখান থেকে তার একার পক্ষে চুরি করা সম্ভব নয় বিধায় তিনি প্রথমে তার আপন ছোট ভাই আরিফ (পিয়ন), পরে পরিচ্ছন্নতাকর্মী আসাদকে যুক্ত করেন। পরে আরিফ আরেক পিয়ন লিটনকে দলে ভেড়ান। এ ছাড়া আসাদ তার ঘনিষ্ঠ আরেক সহকর্মী আব্বাসকেও দলে নেন। কারণ চুরির দিনে আব্বাসের দায়িত্ব ছিল গেট পাহারার।

ডিবির ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ৩০ জানুয়ারি আশরাফুজ্জামান ৬০ লাখ টাকার ব্যাগ নিয়ে ড্রয়ারে রাখেন। সে দৃশ্য দেখতে পান চোর চক্রের মূল জাকির। পরদিন দল নিয়ে ড্রয়ার ভেঙে ওই টাকা চুরি করেন। চুরির টাকা ভাগ ভাগ করে আরিফ ও লিটন সারা দিন প্যান্টের পকেটে করে নদ্দা এলাকায় তাদের বাসায় জমা করেন। ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন উপলক্ষে ৩১ জানুয়ারি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি বেশি থাকার কারণে তারা টাকা বহনের জন্য নিজেদের প্যান্টের পকেটকেই নিরাপদ মনে করেন। এভাবে কয়েক ধাপে তারা ৬০ লাখ টাকা অফিস থেকে বাসায় নেন। এর এক দিন পর ওই সব টাকা একটি ব্যাগে ভরে আব্বাসের ফুপুর বাসায় রেখে আসেন। ফুপুকে বলেন, ব্যাগে কাপড় আছে। ভোটের পর অফিস খুললে তারা নিয়মিত অফিস করতে থাকেন। ডিবির আরেক কর্মকর্তা বলেন, সন্দেহ এড়াতে তারা টাকা চুরির পরও পালিয়ে যায়নি। কারণ পালিয়ে গেলে তারাই এ কাজ করেছে বলে সবাই সন্দেহ করবে। এ কারণে তারা নিয়মিত অফিস করছিল। তাদের পরিকল্পনা ছিল পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলে তারা চাকরি ছেড়ে দেবেন। এরপর ভাগবাটোয়ারা করে ব্যবসায় বিনিয়োগ করবেন।