দেড় মিনিটে রোগী দেখেন চিকিৎসকরা!

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে (বহির্বিভাগ) চিকিৎসার জন্য প্রতিদিন গড়ে এক হাজার রোগী আসছে। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক রোগীর জন্য রয়েছেন মাত্র চারজন চিকিৎসক। ফলে রোগীপ্রতি দেড় থেকে দুই মিনিট সময় পাচ্ছেন চিকিৎসকেরা। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই রোগীর সঙ্গে কথা বলা, তার বক্তব্য শোনা এবং এর মধ্যেই প্রভিশনাল ডায়াগনসিস করে ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন চিকিৎসক। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কেটে চিকিৎসকের দেখা পেলেও এই সময় স্বল্পতায় অসন্তুষ্ট রোগীরা। বিভাগটিতে প্রতিদিন একজন চিকিৎসক কমপক্ষে ১৭০ জন রোগী দেখছেন। এই অধিকসংখ্যক রোগীর চিকিৎসা দিতে একদিকে যেমন হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে, অন্যদিকে চিকিৎসার মান নিয়ে ক্ষুব্ধ রোগীরা।

হাসপাতালটির এই পরিস্থিতির জন্য জনবল সংকটকে দায়ী করছে কর্তৃপক্ষ। তাদের ভাষ্য, দেশ স্বাধীনের পর হাসপাতালের সক্ষমতা ১ হাজার ৫০ বেড থেকে দুই ধাপে বাড়িয়ে ২ হাজার ৬০০ বেডে উন্নীত করা হলেও সেই তুলনায় জনবল বাড়েনি।

গতকাল বুধবার ঢামেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগ ঘুরে দেখা গেছে, বহির্বিভাগে রোগীদের দীর্ঘ লাইন। সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন পুরান ঢাকার লালবাগ থেকে আসা জোছনা আক্তার (২৫)। তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঠান্ডা-কাশিতে ভুগছেন তিনি। দুপুর ১২টার দিকে ঢামেক হাসপাতালে এসেছেন। সাড়ে চার বছরের ছেলে সোহাগকে নিয়ে দাঁড়িয়েছেন মেডিকেলের বহির্বিভাগের মেডিসিন বিভাগের টিকিট কাটতে। আধা ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে টিকিট কাটতে। 

এরপর টিকিটে নাম এন্ট্রি করতে ফের লাইনে দাঁড়ান। পরে ৩ নম্বর রুমে চিকিৎসককে দেখাতে বলা হয় তাকে। সেখানেও লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় জোছনাকে।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন এই যে বড় সিরিয়াল দেখছি, ভাবছি কী করব। ডাক্তার দেখাতে পারব কি পারব না। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ডাক্তার দেখানোর সময়ই না শেষ হয়ে যায়।’

কথা হয় বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ময়লার পাম্পের বেসরকারি কর্মচারী রঞ্জিত শীলের (৩৮) সঙ্গে। তিনি জানান, কয়েক দিন ধরে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় ভুগছেন। লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কেটে আবার লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিটে নাম এন্ট্রি করতে হয়েছে। এরপর ডাক্তার দেখাতে আবার ৮ নম্বর রুমের সামনে সিরিয়ালে দাঁড়াতে হয়। এতেই তার এক ঘণ্টার বেশি সময় পার হয়ে গেছে। অবশেষে ৮ নম্বর কক্ষে গিয়ে দেখেন ডাক্তার নেই। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর ডাক্তার এলে সিরিয়াল অনুযায়ী ডাক্তার দেখান তিনি। ২ মিনিটে তার সব সমস্যা শুনে কিছু ওষুধ লিখে দিয়েছেন চিকিৎসক।

মেডিসিন বিভাগের দায়িত্বরত চিকিৎসক ডা. মোসা. ফারহানা বলেন, ‘আমাদের এখানে একেক দিন একেক পরিমাণ রোগী আসেন। এই গড়ে প্রায় ৩০০ রোগী আসে আমাদের এই কক্ষে। এখানে আমরা দুজন থাকলে দুজন মিলেই এই পরিমাণ রোগী দেখি একেক দিন। আর একেক সময় একাই দেখতে হয়।’

স্বল্পসময়ে এত অধিক সংখ্যক রোগীকে সঠিক ব্যবস্থাপত্র দেওয়া সম্ভব হয় কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রোগীর পরিমাণ বেশি হলে তো দেখতে একটু সমস্যা হয়ই। এত রোগীকে তো বেশি সময় দিয়ে দেখা যায় না। তবে আমরা চেষ্টা করি তাদের ভালোভাবে দেখার।’

এ পরিস্থিতে রোগীরা চিকিৎসকদের চিকিৎসায় সন্তুষ্ট কি না, জানতে চাইলে ফারহানা বলেন, ‘আমরা মনে করি, রোগীরা অবশ্যই সন্তুষ্ট। তা না হলে এত রোগী এই হাসপাতালে আসতেন না। অনেকে চার-পাঁচবার করেও আসে চিকিৎসা নিতে। অনেকে নিয়মিত এখানেই চিকিৎসা নেয়।’

মেডিসিন বিভাগে দায়িত্বরতদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মো. শাইখ আব্দুল্লাহসহ ৪টি কক্ষে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। নারী-পুরুষ, শিশুসহ গতকাল বুধবার ৮৭০ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছে সেখানে।

এদিকে হাসপাতালটির এই পরিস্থিতির জন্য জনবল সংকটকে দায়ী করছে কর্তৃপক্ষ। তাদের ভাষ্য, দেশ স্বাধীনের পর এখানে ১০৫০ বেডের জন্য জনবল ছিল ৯৩০ জন। এর মধ্যে চিকিৎসক, নার্স, পেরামেডিকস, টেকনিশিয়ানস ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীও ছিল। পরবর্তী দুই ধাপে প্রথমে ১ হাজার ৮০০ এবং পরে হাসপাতালের সক্ষমতা ২ হাজার ৬০০ বেডে উন্নীত করা হয়। কিন্তু সেই তুলনায় জনবল বাড়েনি। হাসপাতালটিতে বর্তমানে ৮০টি ওয়ার্ড, ৩৬টি ওটি ও ১৪৭টি কেবিন রয়েছে। প্রতিদিন ভর্তি থাকে গড়ে ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ২০০ রোগী। মেডিসিন, সার্জারি, ইউরোলজি ও গাইনি বিভাগসহ সব বিভাগের জন্য চিকিৎসক রয়েছেন ৫৮৪ জন। এই চিকিৎসক দিয়ে সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মেডিসিন বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৯০০ থেকে ১ হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। চারজন চিকিৎসক প্রতিদিন ৫ ঘণ্টার মধ্যে তাদের চিকিৎসা দিচ্ছে। প্রতিদিন একজন চিকিৎসক ন্যূনতম ১৭০ জন রোগী দেখছেন। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই রোগীর সঙ্গে কথা বলা, তার বক্তব্য শোনা, এর মধ্যেই প্রভিশনাল ডায়াগনসিস করে ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন চিকিৎসক। বিরামহীন কাজ করে এই অসম্ভব কাজটি সম্ভব করছেন এখানকার চিকিৎসকেরা।’

তিনি আরও বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই প্রয়োজনীয় জনবল নেই এই হাসপাতালে। স্বাধীনতার পর থেকে কয়েক ধাপে এখানে রোগীর ধারণক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে ধারণক্ষমতার তুলনায় দ্বিগুণ রোগী চিকিৎসাধীন আছে। কিন্তু সেই তুলনায় চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারী বাড়ানো হয়নি; বিশেষ করে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।