পোপের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল বৃহস্পতিবার ভ্যাটিকান সিটিতে ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের প্রধান ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর ছোট বোন শেখ রেহানা ও তার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ হোসেন তার সঙ্গে ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহ্সানুল করিম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আজ সকালে ইতালির রাজধানী রোমের নিকটে অবস্থিত ভ্যাটিকান সিটি যান এবং পোপের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী সেখানে কিছু সময় অবস্থান করেন এবং পোপের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।’

প্রধানমন্ত্রী মিলান পৌঁছেছেন : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে ৪টায় মিলান পৌঁছেছেন। তিনি স্থানীয় সময় বেলা ১টা ২০ মিনিটে ট্রেনে রোম থেকে ইতালির মিলান শহরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। মিলান সফরকালে তিনি এক্সেলসিয়ার হোটেল গালিয়ায় অবস্থান করবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতালির

প্রধানমন্ত্রী জিউসেপ কোঁতের আমন্ত্রণে চার দিনের সরকারি সফরে ৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে রোম পৌঁছান। তিনি একই দিন সন্ধ্যায় পার্কো দেই প্রিন্সিপি গ্র্যান্ড হোটেল অ্যান্ড স্পায় তার সম্মানে আয়োজিত একটি সংবর্ধনায় যোগ দেন।

প্রধানমন্ত্রী পরদিন জিউসেপ কোঁতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। বৈঠকে সাংস্কৃতিক বিনিময়, রাজনৈতিক বিষয় এবং কূটনৈতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্পর্কিত তিনটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তিনি একই দিন সকালে রোমের ভায়া ডেল’এন্টারটাইড এলাকায় বাংলাদেশ দূতাবাসের চ্যান্সেরি ভবন উদ্বোধন করেন। একই দিন তিনি ইতালির প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন পালাজ্জো চিগিতে আনুষ্ঠানিক মধ্যাহ্নভোজে যোগ দেন।

দুই নেতা তাদের বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সব বিষয়ের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েও আলোচনা করেন। পরে ইতালীয় ব্যবসায়িক সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিগণ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার আবাসকালীন হোটেলের সভাকক্ষে সাক্ষাৎ করেন। প্রধানমন্ত্রী এরপর একই হোটেলে ইতালিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আয়োজিত নৈশভোজে অংশ নেন।

প্রধানমন্ত্রী আজ স্থানীয় সময় দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে আমিরাত এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে মিলান মালপেন্সা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দেশের উদ্দেশে যাত্রা করবেন। তিনি পরদিন দুবাই হয়ে বাংলাদেশ সময় সকাল ৮টা ১০ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছবেন।

রোহিঙ্গাদের সফল প্রত্যাবাসনে ইইউর সমর্থন কামনা : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং স্থায়ী প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে ইতালিসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোর অব্যাহত সমর্থন প্রত্যাশা করেছেন। তিনি ইতালিসহ ইইউকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানান। বুধবার রোমে বাংলাদেশ ও ইতালির প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে ৯ দফা যৌথ বিবৃতিতে এসব কথা বলেন শেখ হাসিনা।

ইতালির প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন পালাজো চিগিতে বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুই প্রধানমন্ত্রী উভয় দেশের পারস্পরিক স্বার্থে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।’

তিনি বলেন, প্রায় এক ঘণ্টার এ বৈঠকে দুই প্রধানমন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সার্বিক দিক নিয়ে আলোচনা করেন এবং দুদেশের মধ্যকার বর্তমান আর্থনৈতিক সহযোগিতার সম্পর্কে সন্তোষ প্রকাশ করেন।

যৌথ ঘোষণায় বলা হয়, উভয় পক্ষই রোহিঙ্গা সমস্যার বিষয়ে গত ২৩ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক আদালতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক আদালতের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সমর্থন কামনা করেছেন।

বৈঠকে জিউসেপ কোঁতে ইতালির পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশের পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বাংলাদেশের অনুসৃত আতিথেয়তার নীতি অব্যাহত রাখতে এই জরুরি মানবিক অবস্থা মোকাবিলা এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উৎসাহ প্রদানে জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ইতালির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহায়তার কথা উল্লেখ করেন।

যৌথ ঘোষণায় বলা হয়, দুই প্রধানমন্ত্রীর ৫ ফেব্রুয়ারির বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক দিক পরিলক্ষিত হয়েছে। এতে বলা হয়, ‘উভয় পক্ষই ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বাংলাদেশের মধ্যে উন্নয়ন, শ্রম ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে আরও নিবিড় সহযোগিতার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন।’

দুই নেতা ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক নীতির আওতায় ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানির গুরুত্বকে স্বীকৃতি দেন। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতির কথা স্বীকার করে বিবৃতিতে তারা বলেন, গত কয়েক বছরে সার্বিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বেড়ে ২ বিলিয়ন (২০০ কোটি) ইউরোর ওপরে দাঁড়িয়েছে।

ইতালির প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের কথা স্বীকার করেন, যার লক্ষ্য ২০২৪ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) তালিকা থেকে বের করে আনা। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘উভয়পক্ষই টেক্সটাইলসহ বাংলাদেশে ইতালীয় সংস্থাগুলোর উপস্থিতির প্রশংসা করে।’

এতে আরও বলা হয়, উভয় নেতাই ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-ইতালি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত, ওষুধ শিল্প, হালকা প্রকৌশল, চামড়া, হাইটেক এবং প্রচলিত ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উভয় খাত সমৃদ্ধকরণে নিজস্ব আস্থা ব্যক্ত করেন।

নীল অর্থনীতির ক্ষেত্রটিকেও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, একই সঙ্গে ইতালির আউটরিচ কার্যক্রম ভারত মহাসাগর রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) সঙ্গে সম্পর্কিত।

বিবৃতিতে বলা হয়, উভয় নেতাই ইতালিতে ১ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি বৃহৎ বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের অবস্থানের কথা স্মরণ করেন, যাদের বেশিরভাগই ইতালীয় সামাজিক কাঠামোয় সুসংহত। আলোচনার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অভিবাসনের ইস্যুতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় করার দিকে নিবদ্ধ ছিল।

দুই প্রধানমন্ত্রী নিয়মিত অভিবাসন ও অনিয়মের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সম্ভাব্য আইনি পথের বিষয়ে কথা বলেছেন।

তারা জাতিসংঘের আওতার মধ্যে ইতালি ও বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যমান সহযোগিতার ইতিবাচক মাত্রার প্রশংসা করেন, যেখানে উভয় দেশই পরম্পরাগতভাবে একে অপরের প্রার্থিতার সমর্থক।

বিবৃতিতে বলা হয়, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) পদমর্যাদা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ হওয়ার পরও ইইউর পণ্যবাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে ইতালির সমর্থন চেয়েছে।

দুই প্রধানমন্ত্রী সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় চুক্তি (সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচি, রাজনৈতিক পরামর্শ, কূটনৈতিক প্রশিক্ষণ এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা) সম্পর্কিত চলমান আলোচনার বিষয়ে উৎসাহ প্রদান করেন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘উভয় পক্ষই আলোচনা জোরদার করতে সম্মত হয়েছে।’

উভয় নেতাই ২০২২ সালে বাংলাদেশ ও ইতালির কূটনৈতিক সম্পর্কের সুবর্ণজয়ন্তীকে গুরুত্ব প্রদান করেন।

তারা সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোর নিজ নিজ উদ্যোগে উভয় দেশের রাজধানীতে একত্রে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে এই ইভেন্টটি উদযাপনেরও আহ্বান জানান।

দুই প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ‘মুজিববর্ষ’ উদযাপনেরও উল্লেখ করেন (১৭ মার্চ ২০২০ থেকে ২৬ মার্চ ২০২১ সাল)।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুজিববর্ষ উদযাপনকালে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জিওসিপে কোঁতেকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। কোঁতে তাকে আমন্ত্রণ জানানোয় প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণ ধন্যবাদ জানান। বাসস।