বিন্যাসে পরামর্শ নিতেই এই বৈঠকের আয়োজন। একসময় প্যারিস কনসোর্টিয়াম সভায় বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীদের যেভাবে ঝুলি আর দলবল নিয়ে নতজানু হয়ে অংশগ্রহণ করতে হতো, একগুচ্ছ নসিহত আর কিছু প্রতিশ্রুতি নিয়ে ফিরতে হতো, এখন আর সে অবস্থা নেই; সভার নাম, স্থান ও পরিবেশ সবই পরিবর্তিত হয়েছে। এখন তা পরিণত হয়েছে উন্নয়ন আড্ডায়; এখন এই দেশ নিজেই সেই সভা আয়োজন করে নিজেদের গল্প শোনানোর জন্য, পরামর্শ আহ্বান করে উন্নয়নকে টেকসই ও বেগবান করার জন্য।
প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-৪১-এর লক্ষ্য ২০৩১ সালের ভেতর আমাদের দেশকে মধ্য আয়ের দেশে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করা। তার আওতায় দেশ যে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা শুরু করতে যাচ্ছে, তাতে আমাদের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আগামী ৫ বছরে ৭৭ লাখ ৪১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হবে। এই বিনিয়োগের ৭৫ শতাংশ আসবে বেসরকারি খাত থেকে আর বাদবাকি ২৫ শতাংশ হবে সরকারি। অর্থাৎ বেসরকারি খাত হবে প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তি। এই পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অন্যান্য লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে দারিদ্র্যের হার ২০ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১২ দশমিক ২৮ শতাংশে নামিয়ে আনা, বছরভিত্তিক ২ দশমিক ৩ শতাংশ হারে শ্রমশক্তির প্রবৃদ্ধির বিপরীতে ২ দশমিক ৩ শতাংশ হারে কর্মসৃজন এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রথম বছর ৮ দশমিক ২৩ শতাংশ থেকে শেষ বছর ৮ দশমিক ৫১ শতাংশ প্রাক্কলন করা হচ্ছে। পরিকল্পনায় এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে মোট বিনিয়োগের হার ধরা হয়েছে প্রথম বছর জিডিপির ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে শুরু করে শেষ বছর ৩৭ দশমিক ২ শতাংশ, যার মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি খাতের হার হবে যথাক্রমে ৯ ও ২৮ দশমিক ২ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব ড. শামছুল আলম বিগত ২৯ জানুয়ারি বিডিএফের প্লেনারি সেশনে এ বিষয়ে যে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন, ওই দিন প্রকাশিত তার সংক্ষিপ্ত সংস্করণ থেকে এই তথ্যগুলো নেওয়া।
তিনি তার ওই প্রবন্ধে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার যে রূপরেখা দেখানোর চেষ্টা করেছেন, তাতে অনেক সুন্দর সুন্দর বিষয় আছে। যেমন পরিকল্পনাটির মূল আখ্যানবস্তু হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে ‘সমৃদ্ধিকে পরিবৃদ্ধি করা অন্তর্ভুক্তিকে প্রতিপালন করা’ শব্দগুচ্ছকে। এক কথায় চমৎকার! আসলে আমরা উন্নয়নের এমন এক সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছি, যখন আমাদের সামনে অপার সম্ভাবনার দ্বার যেমন উন্মুক্ত হয়েছে, তেমনি চ্যালেঞ্জও উঁকি দিচ্ছে অনেক। জ্ঞান, দক্ষতা, অঙ্গীকার ও বহুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করেই আমাদের অর্থনীতি ও সমাজের রূপান্তর ঘটাতে হবে।
এখন প্রশ্ন হলো এই উন্নয়ন অভিযাত্রায় যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা মোকাবিলার জন্য আমাদের আমলাতন্ত্র সক্ষম ও প্রস্তুত কি না? কারণ, উন্নয়নের চাকা সামনে এগিয়ে নিতে এবং সাধারণ মানুষকে পরিষেবা দিতে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে বিডিএফের সভার শেষ দিন সরকারের দুজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থনীতিবিদের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। বাণিজ্যসচিব জাফর উদ্দিন মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের কথা অকপটে স্বীকার করেন। অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্র্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী আরও খোলামেলাভাবে উল্লেখ করেন, বেসরকারি খাতকে উদ্দীপ্ত করতে কোনো আইন, বিধি, প্রবিধানই কাজ করবে না, যদি না সরকারি কর্মকর্তাদের মানসিকতার বদল হয়। তিনি অবশ্য এর পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতি কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেন। বিশ্বব্যাংকের আর্থিক খাতের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ইলিয়াস স্কামনেলস স্থানীয় পর্যায়ে অর্থায়নে কার্যকর ব্যাংক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি খেলাপিরা যাতে বাড়তি সুবিধা না পান এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা যাতে ঋণ পান, তা নিশ্চিত করতে বলেন। তিনি আরও বলেন, বিকল্প অর্থায়নের উৎস হিসেবে পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেটের সামর্থ্যকে কাজে লাগাতে হবে।
আমলাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো তিনি যে মন্ত্রণালয়ে বা যে ডেস্কে কাজ করেন, সেই মন্ত্রণালয় বা ডেস্কের অভিমতই চূড়ান্ত, অন্যরা সেখানে অভাজন; তাদের অভিমতের কোনো মূল্য নেই, দেশের তাতে অকল্যাণ হলেও কিছু যায়-আসে না। আমিত্ব সেখানে এক দুরারোগ্য ব্যাধি। এ সমন্বয়ের অভাবের সাম্প্রতিক উদাহরণ দেশের উদ্বৃত্ত চাল রপ্তানির ক্ষেত্রে খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পারস্পরিক বিপরীতমুখী মর্মার্থের পত্রালাপ; চালের দাম একটু বেড়ে যাবে এই অজুহাতে চাল রপ্তানিতে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের আপত্তি, আবার উৎপাদন খরচ উশুল না হলে কৃষক উৎপাদনে উৎসাহ হারাবে; তাদের জন্য প্রণোদনা প্রয়োজন, এই যুক্তিতে চাল রপ্তানিতে প্রণোদনা দিতে
কৃষি মন্ত্রণালয়ের উৎসাহ। আশার কথা যে, কাজ হোক বা না হোক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অন্তত সাহসিকতা প্রদর্শন করে অল্প সময়ের মধ্যেই একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পেরেছে; অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই জাতীয় সাংঘর্ষিক বিষয়ে আমলারা বিতর্ক এড়াতে স্যার নাজিম উদ্দিনের মতো উপযোগিতা শেষ না হওয়া পর্যন্ত নথি আলমারিতে উঠিয়ে রাখেন।
এবার কর্মকর্তাদের হালনাগাদ জ্ঞানের বহরের একটি নমুনা দিতে চাই। বিডিএফের সম্মেলন উপলক্ষে প্রধান দৈনিকগুলো ২৯ জানুয়ারি ক্রোড়পত্র বের করে, যাতে মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও অন্যদের বাণী ছিল। সেখানে মাঝখানে লম্বালম্বিভাবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের এক যুগ্মসচিবের একটি প্রবন্ধ ছাপা হয়। সেখানে তিনি অন্যান্য তথ্যের মধ্যে দারিদ্র্য ও অতিদারিদ্র্যের হার ২০১৮ সালে যথাক্রমে ২১ দশমিক ৮ ও ১১ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে বলে দাবি করেন। অথচ যারা মোটামুটিভাবে পত্রপত্রিকা নাড়াচাড়া করেন, তারা সবাই জানেন যে, এই দুটি উপাত্তের প্রকৃত মূল্যমান হলো যথাক্রমে ২০ দশমিক ৫ ও ১০ দশমিক ৫। এমনকি ওই একই দিন প্রকাশিত পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য শামছুল আলমের নিবন্ধেও তার প্রমাণ পাওয়া যায়।
বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সুদের হার কমানো শুরু হয়েছে। এখন শুনতে পাচ্ছি যে, বৃহৎ ঋণ গ্রহীতাদের জন্য এই সাশ্রয়ী হার প্রযোজ্য হবে; ক্ষুদ্র ও মাঝারিশিল্প মালিকরা সেখানে কল্কে পাবেন না। এটা যদি হয়, এর চেয়ে বড় আত্মঘাতী পদক্ষেপ আর কী-বা হতে পারে? অথচ হওয়া উচিত উল্টোটা। আমরা বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঠ্যাং ছেড়ে দিয়ে লাঠি ধরার যে কৌশল এত দিন চর্চা করে এসেছি, তা শুধু ব্যাংকব্যবস্থাকেই দুর্বল করেনি, পুরো জাতির ঘাড়ে বোঝাও চাপিয়েছে। অথচ শুধু স্বচ্ছতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে এর চেয়েও অনেক কম খরচে পুঁজিবাজার থেকে উন্নয়ন-চাহিদার সিংহভাগ রসদ স্থানীয়ভাবেই সংগ্রহ করা যায়। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এ ক্ষেত্রে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বাইরে শুধু সরবরাহ-প্রান্ত ও চাহিদা-প্রান্তের মধ্যে সমন্বয়ের উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে; স্পষ্ট কিছু নেই। এখানে ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে বিনিয়োগ বেশি ফলদায়ী হতে পারে।
শামছুল আলম একজন প্রাজ্ঞ ও ঋদ্ধ মানুষ। তিনি এ বিষয়গুলো যে বোঝেন না, এমন নয়। তাই তো এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তিনি অপরিহার্য দুটি অঙ্গের কথাই উল্লেখ করেছেন প্রথমটি হলো কঠিনাঙ্গ; অর্থাৎ দারিদ্র্যবিমোচন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামোতে বিনিয়োগ। দ্বিতীয়টি হচ্ছে কোমলাঙ্গ; এটি মূলত হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গঠন ও সংস্কারে বিনিয়োগ। প্রথমোক্তটি ব্যয়বহুল, কিন্তু অপেক্ষাকৃত সহজ; শেষোক্তটি স্বল্প ব্যয়সাপেক্ষ, কিন্তু কঠিন। আমরা সব সময় দৃশ্যমান প্রথম অঙ্গের ওপর অযাচিত গুরুত্ব আরোপ করতে অভ্যস্ত। ভবন নির্মাণে আর কদিন লাগে, কিন্তু চিন্তা-চেতনা, মূল্যবোধ-দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে অনেক সময় প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলে যায়। প্রথমটি দেহ, দ্বিতীয়টি প্রাণ। প্রাণই দেহকে চালিত করে, চঞ্চল করে, সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এই প্রাণের স্ফুরণ ঘটিয়ে কীভাবে দেহের রূপান্তর করা যায়, সে পরিকল্পনায় আমলাদের মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের প্রচেষ্টাই হওয়া উচিত আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার।
লেখক
সাবেক মহাপরিচালক, খাদ্য অধিদপ্তর