এবার কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে সরকারকে বাধ্য করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ সময় তার মুক্তির দাবিতে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচিও ঘোষণা করেন তিনি। খালেদা জিয়ার কারাবাসের দুই বছর পূর্ণ ও তার মুক্তি দাবিতে গতকাল শনিবার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত সমাবেশে এসব কথা বলেন দলটির মহাসচিব।
খোলা ট্রাকের ওপর তৈরি অস্থায়ী মঞ্চে দাঁড়িয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বিগত দুই বছর আমরা আন্দোলন করেছি, নির্বাচন করেছি। এবার কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে সরকারকে বাধ্য করব। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে জনগণের সমস্ত অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এটাই হচ্ছে এখন আমাদের একমাত্র কাজ।’ এ সময় সদ্য অনুষ্ঠিত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফল বাতিল করে পুনর্নির্বাচনও দাবি করেন তিনি।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বকশীবাজারে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালত ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়। একই দিন তাকে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয়। অসুস্থ হয়ে পড়লে গত বছর ১ এপ্রিল খালেদা জিয়া কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল (বিএসএমএমইউ) বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এখনো সেখানে চিকিৎসাধীন সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী।
গতকাল দুপুর ২টায় খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে সমাবেশ শুরু হয়। এর আগে ১২টা থেকে বিএনপি ও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থলে জড়ো হতে থাকেন। চেয়ারপারসনের মুক্তির দাবিতে তারা স্লোগানে স্লোগানে নয়াপল্টন এলাকা মুখরিত করে তোলেন। সমাবেশের জন্য কার্যালয়ের সামনের সড়কে যানচলাচল বন্ধ করে দেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ সময় নাইটিঙ্গেল মোড়, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স মোড়সহ পল্টন থানা ও আশপাশ এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হলেও সমাবেশস্থলে তাদের দেখা যায়নি।
এদিকে পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে বগুড়া, নোয়াখালী, বরিশালসহ দেশের সব জেলায় গতকাল সমাবেশ আয়োজন করা হয় বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা।
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘মাত্র ১৫ শতাংশ ভোট নিয়ে মেয়র হওয়া যায়। কিন্তু জনগণের প্রতিনিধি হওয়া যায় না। তাই নির্বাচনের ফলাফলকে বাতিল করে পুনরায় জনগণের ভোটে মেয়র নির্বাচিত করতে হবে।’
সরকারের উদ্দেশে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আজকে আমাদের কথা পরিষ্কার, আপনারা ব্যর্থ হয়েছেন, এ দেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করেছেন, অধিকার হরণ করেছেন এবং গণতন্ত্রকে কেড়ে নিয়েছেন। তাই অবিলম্বে পদত্যাগ করুন এবং নিরপেক্ষ সরকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন। না হলে জনগণের উত্তাল তরঙ্গের মধ্যে আপনারা ভেসে যাবেন।’ গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ‘এই ভয়াবহ দানবকে’ পরাজিত করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আপনারা সবাই জানেন, সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে মিথ্যা মামলা সাজিয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে শুধু তাকে (খালেদা জিয়া) আটক করে রাখা হয়েছে। তিনি অত্যন্ত অসুস্থ। এত অসুস্থ যে তিনি এখন ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না। তাকে সাহায্য করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিতে হয়। তার ডায়াবেটিস কন্ট্রোলে নেই, তার আর্থ্রাইটিস বেড়ে গেছে। তিনি ঠিকমতো খেতে পারেন না। কমপক্ষে ৭ পাউন্ড ওজন কমে গেছে।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারছি, রাজনৈতিক কারণে বেগম জিয়া মুক্তি পাচ্ছেন না। তাই আজকে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সরকার পতনের আন্দোলন একসঙ্গে করতে হবে।’
দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘লজ্জা করে বলতে যে, আমি বাংলাদেশের নাগরিক। বাইরে (বিদেশে) যখন আলোচনা হয় তখন তারা বলে, তোমার দেশে কি আইনের শাসন নাই। খালেদা জিয়া জামিন পাবেন না কেন? তখন তাদের বলি, রাজনৈতিক কারণে জামিন পান না।’ তিনি আরও বলেন, ‘নেত্রীকে মুক্ত করতে আমাদের আইনি প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হবে। কিন্তু রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমেই খালেদা জিয়া মুক্তি পাবেন।’
দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আমাদের আজকে অনেকে বলেন, বিএনপি আন্দোলন করছে না বা করতে পারে না। কিন্তু আজকের সভা কি আন্দোলনের অংশ না? তবে আমাদের যার যার এলাকার কোন্দল আছে তা ভুলে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তাহলেই খালেদা জিয়া মুক্ত হবেন।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা যারা বিএনপি নেতা তারা আজ লজ্জিত অবস্থায় আপনাদের সামনে দণ্ডায়মান। কারণ যাকে আমরা “মা” ভেবেছি তিনি আজ দুই বছর ধরে কারাগারে। কিন্তু আমরা এত হাজার হাজার নেতাকর্মী আছি, এরপরও আমরা তাকে মুক্ত করতে পারি নাই।’ গলার সমস্যার কারণে বক্তব্য দিতে পারেননি স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।
দলের প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী ও সহপ্রচার সম্পাদক আমীরুল ইসলাম খান আলীমের পরিচালনায় সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লাহ, মো. শাহজাহান, শামসুজ্জামান দুদু, আবদুল আউয়াল মিন্টু, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রমুখ।