রাজধানীর খিলক্ষেত থেকে যাত্রাবাড়ী যাওয়ার উদ্দেশ্যে গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর সকালে ‘অনাবিল পরিবহনের’ একটি বাসে ওঠেন মাহামুদুল হাসান। শনিরআখড়া ফুটওভার ব্রিজের নিচে পৌঁছার পর ‘র্যাবের জ্যাকেট’ পরিহিত ৩-৪ জন বাসটিতে ওঠে। র্যাব সদস্য পরিচয়ে পিস্তল উঁচিয়ে তারা হাসানকে টেনেহিঁচড়ে নিচে নামায়। এরপর সঙ্গে থাকা তার আইফোন ও তিন লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয়। পরে মুখ চেপে ধরে মারতে মারতে তাকে একটি প্রাইভেটকারে তোলা হয়। তখন হাসানের ‘বাঁচাও বাঁচাও’ চিৎকার শুনে উবার চালক ও ট্রাফিক কনস্টেবলসহ পথচারীরা এগিয়ে এলে গাড়ি ও জ্যাকেট ফেলে পালিয়ে যায় তারা।
গত ৫ জানুয়ারি রাত ১টার দিকে অজ্ঞাত এক পথচারী হাতিরঝিল থানার ওসির অফিশিয়াল মোবাইলে ফোন করে জানায়, মগবাজার ফ্লাইওভারের ওপর সোনারগাঁও প্রান্তে রেলক্রসিং বরাবর এক তরুণের লাশ পড়ে আছে। তৎক্ষণাৎ সেখানে গিয়ে লাশটি উদ্ধার করে পুলিশ। ঠোঁটের কোণে রক্ত ছাড়া তার শরীরে আর কোনো আঘাতের চিহ্ন খুঁজে পায়নি তারা। ঘণ্টাখানেক পর রেইনবো ক্রসিং থেকে সোনারগাঁও প্রান্তের দিকে একটু সামনে ফ্লাইওভারের দেয়াল ঘেঁষে একটি মানিব্যাগ পাওয়া যায়। এতে থাকা জাতীয় পরিচয়পত্র ও জব আইডি থেকে লাশটির পরিচয় শনাক্ত হয়। মিজানুর রহমান (২৫) নামের ওই তরুণ লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ছবিলপুর গ্রামের মুদি দোকানি আমির হোসেনের ছেলে।
এরপর ঘটনায় জড়িতদের ধরতে অনুসন্ধানে নামে পুলিশ। গত ২৩ জানুয়ারি রাতে রাজধানীর উপকণ্ঠে টঙ্গী এলাকা থেকে নুরুল ইসলাম এবং ২৫ জানুয়ারি গাজীপুর ও তুরাগ এলাকা থেকে আবদুল্লাহ বাবু ও জালালকে গ্রেপ্তার করে তারা। পুলিশ বলছে, নুরুল ইসলাম সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক হলেও মূল পেশা ছিনতাই। সেসহ আরও আটজন মিলে গড়ে তুলেছে অটোরিকশাকেন্দ্রিক ছিনতাই ও কিলিং গ্রুপ। প্রতি রাত ৮টা থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত আশুলিয়া, আবদুল্লাহপুর, উত্তরা, গুলশান, ভাটারা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, মহাখালী, তেজগাঁও, মগবাজার, রামপুরা, ৩০০ ফিট, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, সাইনবোর্ড এলাকায় চলে তাদের অপকর্ম। জিজ্ঞাসাবাদে নুরুল জানিয়েছে, গত ৫-৬ মাসে সে প্রায় ৬০০ ছিনতাই করেছে। তার সহযোগীদের মধ্যে ৫-৬ জন ৩-৪ বছর ধরে ছিনতাইয়ে জড়িত। অনেকেই ২০০০-২৫০০টি ছিনতাই করেছে। এক রাতে সর্বোচ্চ ছয়টি পর্যন্ত ছিনতাইয়ের রেকর্ড আছে। বেশ কয়েকজনকে হত্যা
ও অজ্ঞান বা অর্ধমৃত অবস্থায় ৩০-৪০ যাত্রীকে ফ্লাইওভার বা নির্জন অন্ধকারাচ্ছন্ন স্থানে অটোরিকশা থেকে ফেলে দেওয়ার কথাও স্বীকার করেছে সে।
গত ২৪ জানুয়ারি রাতে রাজধানীর খিলগাঁও ও নারায়ণগঞ্জ এলাকা থেকে আগ্নেয়াস্ত্রসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপির) গোয়েন্দা (পূর্ব) বিভাগের একটি দল। তারা হলো মো. সুজন শেখ, মো. মোস্তাফিজুর রহমান ওরফে মানিক, মো. ইমন, মো. লিটন সরদার ও মো. রমজান হোসেন। ডিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছন, তাদের কাছ থেকে পিস্তল, চাপাতি ও সাতটি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। ওই পাঁচজনের বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় একাধিক ডাকাতির মামলা রয়েছে। মানিকের বিরুদ্ধেই রয়েছে ১৯টি মামলা। সে এর আগেও গ্রেপ্তার হয়ে জেল খেটেছে। জামিনে বের হয়ে ফের একই কাজ করছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রাজধানীতে ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণে জড়িতরা কখনো নিজেদের ডিবি আবার কখনো র্যাব পরিচয় দিয়ে থাকে। আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে তারা বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শোরুমে ডাকাতি করে। এছাড়া সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারে চলাচলকারী ব্যক্তিরাও তাদের টার্গেট। নির্জন স্থানে আটকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তাদের সঙ্গে থাকা মূল্যবান জিনিসপত্র ও টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নিয়ে সটকে পড়ে তারা। বাধা দিয়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে জখমও হচ্ছে অনেকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছিনতাই ও ডাকাতিকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার ও অনেকে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হচ্ছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার ঢাকার তুরাগে র্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ শহীদ হোসেন (৪৫) নিহত হন। র্যাবের ভাষ্য, সে ‘কুখ্যাত ডাকাত’। অনেকে তাকে ‘কানা শহীদ’ নামে চেনে। রাজধানীর বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে দুটি হত্যা, ১৬টি ডাকাতি ও দুটি মাদকের মামলা রয়েছে।
ডিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সম্প্রতি রাজধানীতে অভিনব পন্থায় মোটরসাইকেল ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। প্রথমে বিভিন্ন শপিংমলের সামনে পার্কিংয়ে থাকা মোটরসাইকেল টার্গেট করা হয়। কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত চক্রটির এক গ্রুপ পার্কিংয়ে রেখে যাওয়া চালককে নজরদারি করে। আরেক গ্রুপ ওই মোটরসাইকেলের পাশে আরেকটি মোটরসাইকেল এনে রাখে। পরে ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে টার্গেট করা মোটরসাইকেলের তালা খোলে তারা। কখনো তালা খুলতে না পারলে এমন ভাব দেখায় যে চাবি হারিয়ে গেছে। পরে সেখানকার নিরাপত্তাকর্মীদের সহায়তায় ভ্যানে তুলে মোটরসাইকেলটি নিয়ে যায় তারা। এরপর চ্যাসিস নম্বর পরিবর্তন বা রেজিস্ট্রেশনের ভুয়া কাগজ তৈরি করে মোটরসাইকেলটি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিক্রি করা হয়।
তারা আরও জানান, এসব চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতিতে জড়িতদের বেশিরভাগই চিহ্নিত। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। গ্রেপ্তারও হয়েছে, কিন্তু জামিনে মুক্তি পেয়ে ফের তারা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
ডিবির যুগ্ম কমিশনার মো. মাহবুব আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চুরি ছিনতাই ডাকাতি এগুলো একই ধরনের অপরাধ। বড় অপরাধগুলো সবসময় আমাদের নজরে থাকে। বিশেষ করে ডাকাতি, বড় ধরনের ছিনতাইগুলো নজরদারিতে আছে। ঢাকা শহরে বিগত সময়ে যে গ্যাংগুলো কাজ করেছে এদের সব আমাদের নজরদারিতে আছে। কেউ হয়তো জেল থেকে বের হয়ে একটা অঘটন করে ফেলছে। তাদের বের করতে আমাদের একটু সময় লাগছে। তবে নজরদারিতে আছে। কারা জেল থেকে বের হলো তার তাৎক্ষণিক একটা মনিটরিংও আমাদের থাকে।’
অপরাধীদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় ও পোশাক ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের পরিচয় দিলে তাদের অপরাধের কাজটা সহজ হয়। বহু আগে থেকেই অপরাধীরা এ কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ করে সাদা পোশাকের পুলিশ, ডিবি, র্যাব এ ধরনের পরিচয় দিতে অপরাধীরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তারা মানুষকে সহজেই তুলে নিতে পারে, কেউ বাধা দেয় না। আমরা বিষয়গুলো আমলে নিয়ে থাকি।’