পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি

অক্টোবরের মধ্যে আসবে সরকারি চার ব্যাংক

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, পুঁজিবাজার চাঙ্গা করতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ দরকার। আমরা যেকোনো মূল্যে পুঁজিবাজার শক্তিশালী করতে চাই। তাই আগামী অক্টোবরের মধ্যে আরও চারটি রাষ্ট্রীয় ব্যাংক পুঁজিবাজারে আসছে। এ ছাড়া বাজারে তালিকাভুক্ত রূপালী ব্যাংকের আরও শেয়ার ছাড়া হবে। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোকে পুঁজিবাজারে আনার বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করতে গতকাল অর্থ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি এসব কথা বলেন।

রাষ্ট্রায়ত্ত যে চার ব্যাংক পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হবে, সেগুলো হলো সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড। এর বাইরে তালিকাভুক্ত রূপালী ব্যাংকের সরকারি অংশের আরও শেয়ার পুঁজিবাজারে ছাড়া হবে। বর্তমানে রূপালী ব্যাংকের ৯০ দশমিক ১৯ শতাংশ শেয়ার রয়েছে সরকারের হাতে।

গতকালের বৈঠকে অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব আসাদুল ইসলাম, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম খায়রুল হোসেন, অর্থসচিব আবদুর রউফ তালুকদার, আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, সরকারি যেসব ব্যাংক রয়েছে তার মধ্যে একটির শেয়ার বাড়ানোসহ পাঁচটি ব্যাংক আমরা পুঁজিবাজারে নিয়ে আসব। ইতিমধ্যে বাজারে তালিকাভুক্ত রূপালী ব্যাংকের মোট ২৫ শতাংশ শেয়ার ছাড়া হবে। পাশাপাশি আমরা নতুনভাবে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডকে (বিডিবিএল) পুঁজিবাজারে নিয়ে আসব। এরপর অগ্রণী, জনতা এবং সর্বশেষ আমরা সোনালী ব্যাংককে নিয়ে আসব। আমরা এ বিষয়ে একটি কমিটিও করে দিয়েছি। কমিটিতে পাঁচটি ব্যাংকের প্রতিনিধি থাকবেন এবং এটিকে দেখাশোনা করবে আইসিবি।’

কবে নাগাদ এসব ব্যাংক পুঁজিবাজারে আসবে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা অক্টোবরের পরে যাব না। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর মধ্যেই আমরা এগুলো করে ফেলব। এ বছরের মাঝেই আমরা ভালো কাজ যা আছে করে ফেলব।’

তিনি বলেন, ‘সোনালী ব্যাংককেও আমরা নিয়ে আসব। তবে এটাতে একটু সময় লাগবে। বাকি চারটি আমরা সেপ্টেম্বরের মধ্যে তালিকাভুক্ত করে ফেলব। এ কাজ হয়তো দুই পর্যায়ে হতে পারে। আমরা সেপ্টেম্বরের মাঝেই কাজগুলো করতে চাই।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো বর্তমানে লাভজনক অবস্থায় রয়েছে। তারাই সরকারকে টাকা দিচ্ছে। তাই এখন আর রিফাইন্যানন্সিংয়ের দরকার পড়ছে না বলেও জানান তিনি। প্রতিটি ব্যাংকই লাভজনক।’

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো পর্যালোচনায় দেখা যায়, খেলাপি ঋণে জর্জরিত হলেও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে যাওয়া প্রতিটি ব্যাংকই মুনাফায় রয়েছে। তবে খেলাপি ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি সংরক্ষণের কারণে নিট মুনাফার পরিমাণ কম। সর্বশেষ ২০১৮ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের (বিডিবিএল) মোট বিতরণ করা ঋণের ৪৬ শতাংশই খেলাপি। তারপরও ২০১৮ সালে ব্যাংকটির সমন্বিত নিট মুনাফা হয়েছে  ৭৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান সোনালী ব্যাংক। ২০১৮ সালে ব্যাংকটির মোট ঋণের ২৬ শতাংশ খেলাপি। এ সময় খেলাপি ঋণের সঞ্চিতি সংরক্ষণ ও কর পরিশোধের পর সোনালী ব্যাংকের নিট মুনাফা হয় ২৩২ কোটি টাকা।  

২০১৮ সালে জনতা ব্যাংকের মোট পরিচালন আয় ছিল ২ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা। সঞ্চিতি ও কর পরিশোধের আগে ব্যাংকটির মুনাফা দাঁড়ায় ৯৮১ কোটি টাকা। এ বছর খেলাপি ঋণসহ বিভিন্ন খাতে সঞ্চিতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৮৯৩ কোটি টাকা। কর পরিশোধের পর জনতা ব্যাংকের নিট মুনাফা দাঁড়ায় মাত্র ১৮ কোটি, যা আগের বছর ছিল ২৭৩ কোটি টাকা। ২০১৮ সাল পর্যন্ত অগ্রণী ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা। এ সময় ব্যাংকটির পরিচালন আয় দাঁড়ায় ২ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি ও কর পরিশোধের ২০১৮ সালে অগ্রণী ব্যাংকের নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১১০ কোটি, যা আগের বছর ছিল ৬৯৪ কোটি টাকা।  

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে পাওয়ার সেক্টর থেকে লাভজনক সাতটি প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এর মধ্যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান নতুনভাবে আনা হবে বাকি দুটি প্রতিষ্ঠানের সরকারি অংশের আরও শেয়ার ছাড়া হবে।’

কামাল বলেন, ‘বাজার শক্তিশালী করতে সরকার সহায়ক ভূমিকা রাখবে। তবে বাজার বাজারের মতো থাকবে। বাজার নিয়ন্ত্রণ সরকার করে না। আমরা যদি কোনো সহায়ক ভূমিকা রাখি এর উপকার পাবে জনগণ। বাজারে একটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে আসতে পারি এটা যাবে জনগণের কাছে। পাশাপশি সরকারি প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে এলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে আকৃষ্ট হবেন।’

গতকালের বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের মূল অর্থনীতির কোথাও কোনো খারাপ সংকেত দিচ্ছে না। তবে আমাদের একটি খাত এখনো নেগেটিভ আছে। তবে একটি খাত দিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতি বিবেচনা করা যাবে না। প্রতিটি দেশেই সব খাত যে সমভাবে চলবে এমনটি নয়। সারা বিশ্বের অর্থনীতির বিবেচনায় আমাদের অর্থনীতির অবস্থা ভালো।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘একটা জায়গা নিয়ে সব সময় আমরা চিন্তাগ্রস্ত, সেটি হচ্ছে পুঁজিবাজার। পুঁজিবাজার হচ্ছে অর্থনীতির রিফ্ল্যাকশন, অর্থনীতির যে ফান্ডামেন্টাল তার ওপর সব সময় অবস্থান করে পুঁজিবাজার। কিন্তু আমাদের দেশের পুঁজিবাজার কেন যেন অর্থনীতির সঙ্গে অ্যালায়েন নয়। অর্থনীতির যে গতিশীলতা তার সঙ্গে পুঁজিবাজার যায় না।’

তিনি বলেন, ‘পুঁজিবাজার এ রকম হওয়ার কারণগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করলাম। আমরা লক্ষ করলাম যে বাজারে কিছুটা মিসম্যাচ রয়েছে। বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের পরিমাণ কম। যারা বিনিয়োগ করে নিজস্ব উদ্যোগে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কম হলে কিছু সময় বাজারে ভলাটিলিটি (বিশৃঙ্খল) বেশি থাকে। এ কারণে বাজার কমে গেলে খারাপ ইঙ্গিত বহন করে।’

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা এ মুহূর্তে অবকাঠামো খাতে যে পরিমাণ বিনিয়োগ করেছি। আমরা এখন অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে চাই। অর্থনীতি যেখানে ওঠানামা করে সেগুলোতে আমরা হাত দেব। এ জন্য আমাদের ব্যাংক-বীমা খাত দেখতে হবে। এগুলো ঠিক করতে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক যে সমস্যা ছিল, সেগুলো দূর করা হচ্ছে। আইনি কাঠামোতে সমস্যাগুলো দূর করছি।’