মাদক মামলা বিশেষ ট্রাইব্যুনাল থেকে পুরনো পদ্ধতি দায়রা আদালতে ফিরছে। অথচ দ্রুত নিষ্পত্তির কথা বলে মাত্র ১৫ মাস আগে সংশোধন করা হয়েছিল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন।
ঢাকঢোল পিটিয়ে আদালত বদলিয়ে ও শাস্তি বাড়িয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করার পর নগণ্যসংখ্যক মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংশোধিত আইন কার্যকর হওয়ার পর প্রায় দেড় লাখ মামলা হয়েছে। পুরনো মামলা আছে প্রায় তিন লাখ। সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে চার লাখ মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। বিচারের পথ রুদ্ধ থাকলেও এ সময় বহু মাদক আমলার আসামি পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন।
‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন, ২০২০’-এর খসড়া আইনের নীতিগত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভা বৈঠকে তোলা হবে। আজ সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়ে এ বৈঠক হবে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন ছাড়াও আজকের বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে ‘দ্য ক্রিমিনাল ল এমেন্ডমেন্ট (এমেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২০’, ‘দ্য পেনাল কোড (এমেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২০’, ‘দ্য কোড অব সিভিল প্রসিডিউর (এমেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২০’ এবং ‘বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন আইন, ২০২০’ এর খসড়া রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সিনিয়র মন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানান।
২০১৮ সালের ১৪ নভেম্বর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে নতুন আইনের অনুমোদন দেন রাষ্ট্রপতি। ওই আইন অনুযায়ী, মাদক অপরাধগুলোর বিচার হওয়ার কথা ছিল পৃথক ট্রাইব্যুনালে। তবে আইন হওয়ার পর এখন পর্যন্ত ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়নি।
নতুন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে বলা হয়েছে, মাদকদ্রব্য সংক্রান্ত অপরাধ দমনে সরকার প্রয়োজনীয় সংখ্যক ‘মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল’ স্থাপন করতে পারবে। অতিরিক্ত জেলা জজ পদমর্যাদার কর্মকর্তারা ট্রাইব্যুনালের বিচারক হবেন। ট্রাইব্যুনাল স্থাপিত না হওয়া পর্যন্ত সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে সংশ্লিষ্ট জেলার যেকোনো অতিরিক্ত জেলা জজ বা দায়রা জজকে তার নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত ট্রাইব্যুনালের দায়িত্ব দিতে পারবে।
তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, মাদক মামলার বিচারের জন্য জেলায় জেলায় ট্রাইব্যুনাল গঠন করা সম্ভব নয়। কারণ এ আইনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মাদক মামলার বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। মাদক মামলা বিচারের জন্য পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হলে এ আইনের প্রায়োগিক জটিলতা সৃষ্টি হবে। তাই আইনটি সংশোধন করে আইনের যেখানেই ‘ট্রাইব্যুনাল’ শব্দটি রয়েছে, সেখানে ‘আদালত’ শব্দটি বসানো হবে। প্রতিটি আদালতে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ বা সমপর্যায়ের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে বিচারক নিযুক্ত হবেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন) ড. এ এফ এম মাসুম রব্বানী গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনের কারণে মাদকের ভয়াবহতা হয়তো কিছুটা কমেছে। আইন হওয়ার পর অভিযান ও মামলা দুটোই বেড়েছে। মাদক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আমরা কিছু সুপারিশ করেছি। এর মধ্যে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল থেকে দায়রা আদালতে ফিরিয়ে নেওয়ার সুপারিশও রয়েছে।’
র্যাব-পুলিশ ও মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরে ঢাকাসহ সারা দেশে র্যাব-পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে প্রায় দুই লক্ষাধিক মাদক কারবারি। আর এ সময়ে মামলা হয়েছে দেড় লাখেরও বেশি। মাদকবিরোধী অভিযানে এ পর্যন্ত পুলিশ ও র্যাবের ‘ক্রসফায়ারে’ সারা দেশে ৪৮২ জন মাদক কারবারি নিহত হয়েছে। তার মধ্যে কক্সবাজার ও টেকনাফেই ‘ক্রসফায়ারের’ ঘটনা বেশি ঘটেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগের চেয়ে মাদকবিরোধী অভিযান কিছুটা শিথিলতা চলছে। আর এ সুযোগে মাদক কারবারিরা এলাকায় আসছে বলে আমাদের কাছে তথ্য এসেছে। এতে আমরা কিছুটা হলেও উদ্বিগ্ন। তবে অভিযান থেমে নেই। আগের চেয়ে আরও জোরালো অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেশে মাদকের বংশ বিস্তার হতে দেওয়া হবে না। গত এক বছরে দেড় লাখের বেশি মাদক মামলা হয়েছে। তার মধ্যে নগণ্যসংখ্যক মামলার রায় হয়েছে।’
সংশ্লিষ্টরা জানায়, সরকারের নির্দেশে পুলিশ-র্যাবসহ সবকটি গোয়েন্দা সংস্থা মাদক কারবারি ও গডফাদারদের তালিকা তৈরি করেছে। ওইসব তালিকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণিতে যুক্ত থাকা ‘হাইপ্রোফাইল’ লোকদের নাম রয়েছে। তালিকাটি নিয়ে পুলিশ ও র্যাব বিশেষ অভিযান শুরু করে। কিন্তু বেশিরভাগ জেলাতেই তালিকাভুক্তরা ছিলেন আত্মগোপনে। আবার পুলিশের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে মাদক কারবারিদের সব ধরনের সহযোগিতা করছে কতিপয় পুলিশ সদস্যরাই। সীমান্ত এলাকায় যেসব থানা আছে ওইসব থানার পুলিশ সদস্যরাই মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ছে বেশি। গত বছর ১৬ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজারের টেকনাফে ১০২ মাদক কারবারি আত্মসমর্পণ করে। আত্মসমর্পণের পর কিছুদিন মাদক কারবার প্রায় বন্ধ ছিল। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানও শিথিল করা হয়। আর এ সুযোগে তালিকাভুক্ত কারবারিরা এলাকায় ফিরে আসে। কক্সবাজার ও টেকনাফের মতোই সারা দেশে তালিকাভুক্ত কারবারিরা বীরদর্পে এলাকায় ফিরে এসেছে। অবশ্য এর মাঝে চলতি বছর ৩ ফেব্রুয়ারি টেকনাফে ২১ মাদক কারবারি আত্মসমর্পণ করেছে।
জানা গেছে, কিছুদিন আগে বিভিন্ন জেলা থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে এখনো মাদক কারবারিরা সক্রিয় আছে। যারা আত্মগোপনে ছিল তাদের মধ্যে কেউ কেউ এলাকায় ফিরেছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরে বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে আইজিপিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তা বলেন, বৈঠকে বেশকিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালাতে হবে, মাদকের আস্তানাগুলো গুঁড়িয়ে দিতে হবে, পুরনোদের পাশাপাশি নতুন কারবারিদের তালিকা করতে হবে, অভিযান কেন আগের মতো হচ্ছে না অনুসন্ধান করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, অভিযানগুলোর ফলোআপ পুলিশ ও র্যাব সদর দপ্তর মনিটরিং করবে। পাশাপাশি মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য মনিটরিংও করতে হবে। মামলার চার্জশিট এমনভাবে দিতে হবে যাতে প্রকৃত মাদক কারবারিরা পার পেয়ে যেতে না পারে।