স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়া কারও দেশে প্রবেশ নয়

করোনাভাইরাস ঠেকাতে দেশের চারপাশ কড়া নজরদারিতে রেখেছে সরকার। এখন থেকে যেকোনো দেশ থেকে যেকোনো স্থান দিয়ে দেশে প্রবেশ করা সবার শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করা হবে। এজন্য দেশের প্রধান তিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ২৮টি স্থলবন্দর ও দুই সমুদ্রবন্দরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একজন ব্যক্তিও যেন পরীক্ষা ছাড়া দেশে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য গত শনিবার নতুন করে নির্দেশ জারি করেছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)।

এমনকি চারটি হাসপাতালকে আক্রান্ত  ব্যক্তির চিকিৎসার জন্য নতুন করে প্রস্তুত করা হয়েছে। এর বাইরে সন্দেহজনকদের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নতুন আইসোলেশন ইউনিট খোলা হয়েছে। ঢাকার বাইরে সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সদর হাসপাতালকে পৃথক আইসোলেশন ব্যবস্থা রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও দপ্তর একযোগে সম্মিলিতভাবে কাজ করছে। দেশের চারপাশে সর্বোচ্চ সতর্কব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কোনোভাবেই পরীক্ষা ছাড়া কেউ যেন দেশে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে দেশব্যাপী করোনাভাইরাস প্রতিরোধ ব্যবস্থা মনিটরিং করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোর রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের চারপাশে সব স্থল ও সমুদ্রবন্দর এবং তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সব যাত্রীর প্রবেশ নজদারিতে রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়া কেউ যাতে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইইডিসিআরের খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের ২৮টি স্থলবন্দরের মধ্যে সাতটি বন্দরে এখনো স্বাস্থ্য পরীক্ষা চালু হয়নি। বন্দরগুলো হলো খাগড়াছড়ি রামগড় স্থলবন্দর, রাঙ্গামাটি বরকল তেগামুখ, চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের দৌলতগঞ্জ স্থলবন্দর, রংপুরের ডোমার চিলাহটি, সিলেটের ভোলাগঞ্জ এবং ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট গোবরাকুড়া ও বকশীগঞ্জ ধানুয়া কামালপুর।

এসব বন্দরের ব্যাপারে ডা. আয়েশা আক্তার বলেন, এসব বন্দর দিয়ে লোকজন আসা-যাওয়া করছে না। সেজন্য এসব বন্দরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা চালু হয়নি। প্রস্তুতি রয়েছে। যদি কখনো কেউ আসে, তাহলে পরীক্ষা করা হবে। বাকি ২১টি বন্দরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ব্যবস্থা চালু আছে ও যারাই আসছেন তাদের পরীক্ষা করা হচ্ছে। এসব বন্দরে যাত্রী স্ক্রিনিংয়ের জন্য হ্যান্ডহেল্ড ইনফ্রারেড থার্মোমিটার পাঠানো হয়েছে।

এই কর্মকর্তা জানান, দুই সমুদ্রবন্দরের মধ্যে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে যেকোনো দেশ থেকে আসা যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। গত কয়েক দিনে এ বন্দর দিয়ে ফিলিপাইন, রাশিয়া, দুবাই, ভারত, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, ব্রাজিল, ইংল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন, আর্জেন্টিনা ও রোমানিয়া থেকে আসা নাগরিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। আর বাগেরহাটের মোংলা সমুদ্রবন্দর দিয়ে আসছে পানামা ও হংকংয়ের নাগরিকরা।

অন্যদিকে স্থলবন্দরগুলো দিয়ে সাধারণত ভারত থেকেই নাগরিকরা আসছেন। দিনাজপুরের হাকিমপুর হিলি স্থলবন্দর দিয়ে এর মধ্যে আমেরিকা থেকেও নাগরিক এসেছে বলে জানিয়েছেন ডা. আয়েশা আক্তার।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ জানুয়ারি থেকে গতকাল রবিবার পর্যন্ত দেশের সব স্থল, নৌ ও বিমানবন্দরে মোট ৭৪ হাজার ৯১১ জন যাত্রীকে স্ক্রিনিং করা হয়েছে। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় করা হয়েছে ১৬ হাজার ২৩ জনের। একই সময়ে তিন বিমানবন্দরে স্ক্রিনিং করা হয়েছে ৯ হাজার ১৩২ জনের, দুই সমুদ্রবন্দরে ১০৮ জনের ও অন্যান্য স্থলবন্দরে ৬ হাজার ৮৯১ জনের।

১২টি থার্মাল স্ক্যানার কেনা হচ্ছে : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, শুধু ঢাকার বিমানবন্দরে থার্মাল স্ক্যানার দিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। সিলেট ও চট্টগ্রামে থার্মাল স্ক্যানার মেশিন থাকলেও সেটি চলছে না। শিগগির সেগুলো ঠিক করা হবে। তবে সেখানে হ্যান্ডহেল্ড ইনফ্রারেড থার্মোমিটার রয়েছে।

ডা. আয়েশা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ সব বন্দরে হ্যান্ডহেল্ড থার্মোমিটার পাঠিয়েছে। মেডিকেল টিম রয়েছে। প্রতিদিন সব বন্দর থেকে আমাদের কাছে তথ্য আসছে। আমরা প্রতিদিন টেলিফোন করে তথ্য নিচ্ছি। একটি বন্দরও আমাদের মনিটরিংয়ের বাইরে নেই।

এদিকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে অধিকতর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ১২টি থার্মাল স্ক্যানার (জ্বর পরিমাপের মেশিন) কেনার উদ্যোগ নিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বাজেট থেকে সেন্ট্রাল মেডিসিন স্টোর ডিপোর্টমেন্টের (সিএমএসডি) মাধ্যমে দুটি থার্মাল স্ক্যানার কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ অর্থ বরাদ্দ থেকে আরও ১০টি থার্মাল স্ক্যানার কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রতিটি মেশিনের দাম পড়বে ৩৫ লাখ টাকা।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, নোভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে অধিকতর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সব বিমান, নৌ, সমুদ্র ও স্থলবন্দর দিয়ে আসা সব যাত্রীর স্ক্রিনিং শুরু হয়েছে। বর্তমানে শুধু শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিনটি থার্মাল স্ক্যানার রয়েছে। দ্রুততম সময়ে যেন দেশের বিভিন্ন প্রবেশপথে বেশিসংখ্যক মানুষকে স্ক্রিনিং করা যায়, সেজন্য থার্মাল স্ক্যানার কেনার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

মহাপরিচালক বলেন, জ্বরের রোগী চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে থার্মাল স্ক্যানারের চেয়ে হ্যান্ডহেল্ড ইনফ্রারেড থার্মোমিটারের মাধ্যমে চিহ্নিত করার কার্যকারিতা কোনো অংশেই কম নয়। তবে থার্মাল স্ক্যানারের সুবিধা হলো একসঙ্গে অনেক যাত্রীকে স্ক্রিনিং করা যায়। আর হ্যান্ডহেল্ড ইনফ্রারেড থার্মোমিটারের মাধ্যমে একজন যাত্রীর কপালের কাছে ধরলেই তার জ্বর আছে কি না তা ধরা পড়ে।

চিকিৎসা চার হাসপাতালে : আইইডিসিআর ল্যাবরেটরিতে গত ১৮ দিনে অর্ধশতাধিক চীনফেরত যাত্রীর লালার নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এখনো পর্যন্ত নতুন ধরনের এ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়নি। তবে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে আক্রান্তের চিকিৎসার জন্য চারটি হাসপাতালকে প্রস্তুত করা হয়েছে। হাসপাতালগুলো হলো সরকারি কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, উত্তরার কুয়েতমৈত্রী হাসপাতাল ও সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল, ঢাকা। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি হলে অন্যান্য হাসপাতালে ভর্তি রেখে সেবা দেওয়া হবে। এছাড়া রাজধানীসহ সারা দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেলা সদর হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ড প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

এ ব্যাপারে আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, রোগী শনাক্ত হলে প্রথমত রাজধানীর চারটি হাসপাতালে রোগী ভর্তি করা হবে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণরোধে আগাম বেশকিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকায় প্রথমে শুধু চীনফেরত যাত্রীদের থার্মাল স্ক্যানার ও হ্যান্ডহেল্ড ইনফ্রারেড থার্মোমিটারে যাত্রীদের (জ্বরমাপা) স্ক্রিনিং করা হলেও বর্তমানে দেশের সব আকাশ, নৌ, স্থল ও সমুদ্রবন্দর দিয়ে প্রবেশকারী সব দেশের সব যাত্রীর স্ক্রিনিং শুরু হয়েছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বাংলাদেশ বিমানের বিশেষ ফ্লাইটে ৩১২ জন বাংলাদেশিকে চীনের উহান থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে বর্তমানে ১১ জন সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ও অবশিষ্ট ৩০১ জন রাজধানীর আশকোনা হাজীক্যাম্পে কোয়ারান্টাইনে। কয়েকজনের নমুনা পরীক্ষা করা হলেও তাদের কেউ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত নন। এছাড়া চীনফেরত চীনা নাগরিকদের কাছ থেকে বাড়িতে ১৪ দিন আত্মবন্দি রাখার অঙ্গীকারনামা রাখা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাস সংক্রমণরোধে গৃহীত ব্যবস্থা সন্তোষজনক। এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে।

সন্দেহজনকদের গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হচ্ছে : বিভিন্ন দেশ থেকে আসা সন্দেহজনক যাত্রীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইইডিসিআর। গতকাল অনুষ্ঠিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে আইইডিসিআর পরিচালক বলেছেন, সন্দেহজনক, পরীক্ষাধীন বা নিশ্চিত রোগী এমন সব ব্যক্তির গোপনীয়তা বজায় রাখা জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে, গোপনীয়তা রক্ষা করতে না পারলে এমন ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।

রংপুরে শিক্ষার্থীর করোনাভাইরাসের লক্ষণ নেই : চীন থেকে ফেরার কিছুদিন পর অসুস্থতা নিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি যুবকের শরীরে নভেল করোনাভাইরাসের কোনো লক্ষণ নেই বলে জানিয়েছেন আইইডিসিআর পরিচালক। তিনি বলেন, তার জ্বর কাশি কিছুই ছিল না। একধরনের শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। তাকে পর্যবেক্ষণে নিয়ে এবং তার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হচ্ছে। ফলাফল এখনো পাওয়া যায়নি। তবে তার অবস্থা এখন ভালো।

গত ২৯ জানুয়ারি রাতে নীলফামারীর ডোমারের বাসিন্দা ওই শিক্ষার্থী চীন থেকে ফেরেন। গত শুক্রবার রাতে অসুস্থ বোধ করলে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে তাকে নীলফামারীর ডোমার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসকরা তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন।

আমাদের রংপুর প্রতিনিধি জানান, ওই শিক্ষার্থীর চিকিৎসায় ১২ চিকিৎসকের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান রংপুর মেডিকেলের ডা. দেবেন্দ্র নাথ বলেছেন, চীনফেরত শিক্ষার্থীর শরীরে করোনাভাইরাসের কোনো লক্ষণ নেই। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অন্য রোগীদের আতঙ্কিত না হওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।