অনুপ্রেরণা দেবে যুব ক্রিকেটে বিশ্বজয়

ক্রিকেট বাংলাদেশকে যে ভালোবাসা আর বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস দিয়েছে তার তুলনা যেন আর কিছুতেই মেলে না। এবারের উচ্ছ্বাস সর্বোচ্চ শিখরের, আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয়ের। সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি বাঙালির মনের কথা যেন আজ একটাই বিশ্বকাপ তো বিশ্বকাপই, হোক না তা উনিশের, বিশ্বসেরার শিরোপা এখন বাংলাদেশের।  ক্রিকেটে বিশ্বজয়ের এই সম্ভাবনার কথা এক-দেড় দশক আগেও কেউ ভাবতে পারেনি। কিন্তু বাংলার দামাল ছেলেরা তা করেই দেখাল। আসলে বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের গর্জন শোনা যাচ্ছে সবদিক থেকেই। ২০১৮ সালে মেয়েদের হাত দিয়ে এসেছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাংলাদেশের প্রথম শিরোপা। টানা ছয়বারের চ্যাম্পিয়ন ভারতকে হারিয়ে সপ্তম এশিয়া কাপ জিতে নিয়েছিল বাংলাদেশের রুমানা-সানজিদা-আয়েশারা। এবারও চারবারের চ্যাম্পিয়ন ভারতকে হারিয়েই যুব বিশ্বকাপের শিরোপা জিতে নিল বাংলাদেশের আকবররা।

২০২০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি দিনটি বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। এই ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুম ক্রিকেট গ্রাউন্ডের নামটিও।  স্মরণীয় হয়ে থাকবে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দলের অধিনায়ক আকবর আলীর নাম।  দেশের মানুষের মনে ইতিমধ্যেই তিনি ‘অধিনায়ক’-এর আসনটিও যেন জিতে নিয়েছেন।  অধিনায়ককে তো এমনই হতে হয়। প্রশস্ত কাঁধে তিনি দায়িত্বের ভার বইবেন। বিপদে ধৈর্য ধরে তিনি সুযোগের অপেক্ষা করবেন। এর সবকিছু করেছেন আকবর। ৭৭ বলে ৪৩ রান করে অপরাজিত ছিলেন তিনি। এই ইনিংস দিয়েই মূলত বাংলাদেশের জন্য বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন সার্থক করেছেন আকবর।  মেরেছেন চারটি বাউন্ডারি আর একটি ওভার বাউন্ডারি। রানের চেয়েও বড় কথা এই দলটার বুকে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন বুনে দিতে পেরেছিলেন তিনি। ক্রিকেট যে একটা টিমওয়ার্ক তার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এই শিরোপা। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, টুর্নামেন্টের সেরা বোলার, সেরা ব্যাটসম্যান কেউই বাংলাদেশের নয়; তবু শিরোপাটা বাংলাদেশই জিতেছে। অধিনায়ক আকবর আলীর পরিণত-নেতৃত্বগুণ আর সমবেত প্রচেষ্টার ফলেই তা সম্ভব হয়েছে।

বাংলাদেশ যুব ক্রিকেট দলের এই বিশ্বজয় মোটেও আকস্মিক নয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় আইসিসির এই আসর শুরুর আগে নানা পরিসংখ্যানে আভাস মিলেছিল বাংলাদেশের জয়ের। বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার আগে ৩০টি যুব ওয়ানডে ম্যাচে অধিনায়ক আকবর আলীর নেতৃত্বে ১৮টি ম্যাচ জিতেছিল বাংলাদেশ। হারিয়েছিল ইংল্যান্ডকে। নিজেদের মাটিতে নয়, প্রতিপক্ষের মাঠে।  শ্রীলঙ্কাকেও হারিয়েছিল আকবর আলীর দল। কঠিন গ্রুপ থেকে অপরাজিত হয়ে উঠেছিল কোয়ার্টার ফাইনালে। দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠে। আর নিউজিল্যান্ডকে উড়িয়ে যুব বিশ্বকাপ জয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়। সামনে ছিল একমাত্র ভারত। ২০১৮ বিশ্বকাপ থেকে অপরাজিত।  চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। ভয় ধরিয়ে দেওয়ার মতো অনেক নাম ছিল ভারত দলে। কিন্তু আকবর বাহিনী ভয় পায়নি। ধৈর্য, বিচক্ষণতা আর দলগত প্রচেষ্টার পুরস্কার হিসেবেই সাহস জাগানিয়া যুব ক্রিকেটাররা এই শিরোপা জিতেছেন।  যুব বিশ্বকাপের শিরোপা জয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের দায়িত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিল। ভবিষ্যৎ লড়াইয়ের জন্য নবীন এই ক্রিকেটারদের আরও যোগ্য করে তুলতে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে বিসিবিকে। নিয়মিত অনুশীলন, প্রশিক্ষণ আর মাঠের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের পাশাপাশি এই ক্রিকেটারদের গড়ে তুলতে হবে মানসিকভাবে শক্তিশালী করে। খেয়াল রাখতে হবে, যুব বিশ্বকাপের শিরোপা জয় যেন তাদের অহংকারী করে না তোলে। সম্ভাবনাময় এই নবীনরা যাতে তারকাখ্যাতির মোহে পড়ে না যান। মাঠের শৃঙ্খলার পাশাপাশি গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের মোকাবিলা করার কায়দাকানুনের প্রশিক্ষণও চাই এই যুগে। খেলোয়াড়দের মধ্যে সততা ও নৈতিকতার চর্চা এবং দেশপ্রেম আর খেলোয়াড়ি মনোবৃত্তির বিকাশও সমভাবে জরুরি।

নবীনদের এই শিরোপা জয় আমাদের এ কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, সারা দেশ থেকে প্রশিক্ষণ আর প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে নতুন ক্রিকেটার তৈরির কাজটা আমাদের আরও গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিতে হবে। পাশাপাশি নজর দিতে হবে সারা দেশে মাঠ আর যুগোপযোগী ক্রিকেট-অবকাঠামো নির্মাণের তৎপরতা আরও জোরদার করার। সংশ্লিষ্টরা দৃঢ়প্রত্যয়ী হলে আশা-জাগানিয়া ক্রিকেটের মাঠে একদিন আমাদের স্বপ্ন পূরণ হবেই। দেশের মানুষ পরম ভালোবাসা আর মমতায় নিজেদের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, সফলতা-ব্যর্থতার সব হিসেবনিকেশের ঊর্ধ্বে উঠে আজ একটা মাঠেই এসে একসঙ্গে মেশে; সেই মাঠ বাংলাদেশের ক্রিকেটের মাঠ। মহামিলনের এই মাঠে বাংলাদেশের ক্রিকেট আরও এগিয়ে যাবে, বিশ্বজয় করবে এটাই প্রত্যাশা। জয়তু বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দল, জয়তু বাংলাদেশের ক্রিকেট।