এসিআর বিকৃতকারীরাই পদোন্নতি পাচ্ছে

বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) বিকৃতির ঘটনা তদন্ত শেষ না করেই অভিযুক্তদের পদোন্নতি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে শ্রম মন্ত্রণালয়। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর গত ৯ জানুয়ারি অভিযুক্ত সেই ৪৮ জন শ্রম পরিদর্শককেই সহকারী মহাপরিদর্শক পদে পদোন্নতির জন্য এ প্রস্তাব পাঠিয়েছে।

গত বছর ২৪ জুন এসব কর্মকর্তার পদোন্নতির প্রস্তাব পাবলিক সার্ভিস কমিশনে (পিএসসি) পাঠানো হয়। কিন্তু ঘষামাঝা করে এসিআর জালিয়াতি করায় এবং ফিডার পদধারীদের সমন্বিত জ্যেষ্ঠতার তালিকা না থাকায় এক মাস পর পিএসসি প্রস্তাবটি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠায়। এসিআর জালিয়াতির সঙ্গে যুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণসহ ত্রুটিপূর্ণ এসিআর সংশোধন করে পিএসসিকে অবহিত করার জন্য শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেয় পিএসসি। একই সঙ্গে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ সংক্রান্ত বিধিবিধান অনুসরণ করে জ্যেষ্ঠতা তালিকা প্রণয়ন করার কথাও বলা হয়। পিএসসি শ্রম মন্ত্রণালয়কে জানায় ৪৮ জন শ্রম পরিদর্শকের মধ্যে ১৯ জনের নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বাকিদের এসিআরেও ঘষামাঝা রয়েছে।

এদিকে পদোন্নতির তালিকা থেকে বাদপড়া কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। মামলার পর থেকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হয়রানিমূলক বদলি ও শোকজ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এসিআর ঘষামাঝার কাজে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগ রয়েছে তাদের প্রশিক্ষণের নামে বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছে।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসিআরের ভিত্তিতেই পদোন্নতি হবে। এখানে এসিআরই সব। সেই এসিআরে যদি ঘষামাঝা থাকে তাহলে সেই অভিযোগ নিষ্পত্তি হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ পদোন্নতি দেওয়া উচিত না।’

এসিআর ঘষামাঝার ঘটনা তদন্ত করার জন্য শ্রম মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। একই মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব এ কে এম রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত সেই কমিটি সংশ্লিষ্টদের খুঁজে বের করতে ব্যর্থ হয়। কমিটি এসিআর জালিয়াতির কাজে সংশ্লিষ্টদের খুঁজে বের করতে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠনের সুপারিশ করে। নতুন কমিটি গঠনের জন্য তদন্ত প্রতিবেদনসহ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল শ্রম মন্ত্রণালয়। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে গত ১৯ ডিসেম্বর শ্রম মন্ত্রণালয় নিজেরাই নতুন তদন্ত কমিটি গঠন করে। শ্রম মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে (আন্তর্জাতিক সংস্থা অনুবিভাগ) আহ্বায়ক করে গঠিত ওই কমিটিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও সরকারি কর্মকমিশন সচিবালয়ের একজন করে প্রতিনিধিকে সদস্য হিসেবে রাখা হয়। কমিটি গঠনের প্রজ্ঞাপনে জনপ্রশাসন ও পিএসসির কোন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে তা প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি কমিটি কতদিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে তারও কোনো সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। দায়সারাভাবে গঠিত এই তদন্ত কমিটি এখনো কাজ শুরু করেনি।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব কেএম আলী আজমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়গুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত সচিব সাকিউন নাহার বেগমের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। সাকিউন নাহার বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের শ্রম পরিদর্শক থেকে সহকারী মহাপরিদর্শক পদে পদোন্নতির প্রস্তাব এসেছে। বিষয়গুলো আমরা যাচাই-বাছাই করে দেখব।’

নতুন তদন্ত কমিটিকে পিএসসি সচিবালয় থেকে উত্থাপিত এসিআর সংক্রান্ত ত্রুটি পর্যালোচনা করার এখতিয়ার দেওয়া হলেও শ্রম মন্ত্রণালয় সেই প্রতিবেদন পাওয়ার আগেই অভিযুক্তদের পদোন্নতি দেওয়ার তোড়জোড় শুরু করেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারি কলকারখানা অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, পিএসসি জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ সংক্রান্ত সব বিধিবিধান অনুসরণ করে ফিডারপদধারী সব শ্রম পরিদর্শকদের সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা তালিকা তৈরি করতে বলেছে। কিন্তু সে নির্দেশনা না মেনে আগের জ্যেষ্ঠতা তালিকাই পদোন্নতির জন্য অধিদপ্তর থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। জ্যেষ্ঠতা তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন ফিডারপদধারী ৪৩ জন শ্রম পরিদর্শক। তারা ৩৩তম বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছেন। এছাড়া জ্যেষ্ঠতা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি ৩৪তম ও ৩৫তম বিসিএস হতে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদেরও। পিএসসির নির্দেশনা অনুযায়ী সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা তালিকা প্রস্তুত না করে পুরনো তালিকায় সেই ৪৮ জন কর্মকর্তার পদোন্নতি প্রস্তাব ফের মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করায় বাদপড়া শ্রম পরিদর্শকদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক শিবনাথ রায় গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পিএসসি এসিআর ঘষামাঝা নিয়ে যেসব বিষয় জানতে চেয়েছে আমরা সেসব বিষয়ের একটি জবাব শ্রম মন্ত্রণালয়ে দাখিল করেছি। এটা নতুন কোনো পদোন্নতির প্রস্তাব না। এসিআরে দুটি কপি থাকে। সেই কপি আমরা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। মন্ত্রণালয় যাচাই-বাছাই করে এক কপি নিজেরা রাখে অন্য কপি পিএসসিতে পাঠায়। মন্ত্রণালয়ের সংরক্ষিত কপিতে কাটাকাটি নেই। পিএসসির কপিতে ঘষামাঝা-কাটাকাটি আছে। এগুলোর কারণ ব্যাখ্যা করতে বলেছে এবং ফ্রেশ কপি পাঠাতে বলেছে। আমরা এসিআর ঘষামাজার সঙ্গে জড়িত না। আমরা ফ্রেশ দুটি কপি পাঠিয়েছি। মন্ত্রণালয় তাদের কাছে সংরক্ষিত কপির ভিত্তিতে পদোন্নতির বিষয়ে পিএসসিতে কথা বলেছে। আমাকে জবাব দিতে বলেছে। আমি মন্ত্রণালয়ে জবাব দাখিল করেছি।’

জ্যেষ্ঠতার তালিকা থেকে ৩৩, ৩৪ ও ৩৫ বিসিএসের কর্মকর্তারা বাদ পড়লেন কেন জানতে চাইলে শিবনাথ রায় বলেন, ‘ফিডার পদের পরিপূর্ণতা পেলে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এদের ফিডার পদ পূর্ণ তো হয়েছেই, কেউ কেউ অবসরেও চলে গেছেন। আরেকটি গ্রুপ আছে যাদের ফিডার পদ পূর্ণ হয়নি। তাদের কথা হলো আপনি আরও এক বছর অপেক্ষা করে জ্যেষ্ঠতার তালিকা তৈরি করেন। তাদের এ দাবি অযৌক্তিক।’

ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংস্থার সব কর্মকর্তার নামই জ্যেষ্ঠতার তালিকায় থাকবে। যারা সব শর্ত পূরণ করে উপযুক্ত হয়েছেন তারা পদোন্নতি পাবেন। আর যারা সব শর্ত পূরণ করেননি তারা পদোন্নতি পাবেন না।

এদিকে পদোন্নতির তালিকা থেকে বাদ পড়ায় ভুক্তভোগীরা প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন। গত ৫ ফেব্রুয়ারি প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব, পিএসসির সচিব, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং সরকারি কলকারখানা অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শককে শোকজ করেছে। এছাড়া কেন সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা তালিকা করা হবে না জানতে চেয়ে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে। ইতিমধ্যে বাদপড়া শ্রম পরিদর্শকরা পদোন্নতির প্রক্রিয়ার স্থগিতাদেশ পিএসসির চেয়ারম্যানের কাছেও আবেদন করেছেন।

প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে মামলা করার কারণে বিভিন্ন রকমের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টির অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইতিমধ্যে বাদীপক্ষের অনেক শ্রম পরিদর্শককে প্রত্যন্ত ও দুর্গম স্থানে বদলি করা হয়েছে। এছাড়া মামলায় বাদীপক্ষ হিসেবে নাম অন্তর্ভুক্ত থাকার কারণে তুচ্ছ ও সাজানো অভিযোগে শ্রম পরিদর্শক ফয়জুর রহমান ও তারিকুল ইসলামের নামে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের দুর্নীতির একটি ভিডিও প্রকাশ করার অভিযোগে শ্রম পরিদর্শক শেখ কামরুল হাসানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। অথচ তথ্য সুরক্ষা আইন, ২০১১ অনুযায়ী তার সুরক্ষাসহ পুরস্কার পাওয়ার কথা। অন্যদিকে তুচ্ছ ও বানানো অভিযোগে নাফিজ হারুন অমিকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

অন্যদিকে এসিআর জালিয়াতি ও নিয়ম বহির্ভূতভাবে পদোন্নতির প্রস্তাব প্রেরণের সঙ্গে যুক্তরা নিজ নিজ পদে ও নিজ শাখায় বহাল রয়েছেন এবং অভিযুক্তদের শাস্তির বদলে বিভিন্ন দেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণ দিয়ে পুরস্কৃত করেছে মন্ত্রণালয়। যে শাখায় থাকার সময় এসিআর জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে সেই শাখার উপসচিব দিল আফরোজ বেগমকে কোরিয়া ও মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয়েছে। কলখারখানা অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (চলতি দায়িত্ব) জোবেদা খাতুনকে ইতালিতে পাঠানো হয়েছে। সংস্থাপন শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. জসিমউদ্দিনকে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত প্রশিক্ষণে পাঠায় মন্ত্রণালয়।