আপাতত চীন থেকে আর কোনো বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে না বলে জানিয়েছে সরকার। গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এর পক্ষে যুক্তি তুলে বলা হয়েছে।
এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, সংক্রমণের হাত থেকে মুক্ত থাকতে সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে চীনে এসব বাংলাদেশি যেন ভালো থাকে, সেজন্য খাবার, পানি ও দেখভালসহ সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গতকাল মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় এমনটাই জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব (সমন্বয় ও সংস্কার) শেখ মুজিবুর রহমান। তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠক শেষে সচিবালয়ে ব্রিফিংয়ে সচিব বলেন, চীনে যেসব বাংলাদেশি আছেন, পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের ফিরিয়ে আনার দাবি উঠেছে। এজন্য তারা যেসব যুক্তি দেখাচ্ছেন তা হলো তারা খাবারের অভাব রয়েছে, সাপোর্ট পাচ্ছেন না। কিন্তু তাদের এসবের কোনো অভাব
নেই। সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। তাই এ মুহূর্তে তাদের আনার কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
সচিব আরও বলেন, চীন থেকে যে ৩১২ জন বাংলাদেশিকে যে বিমানে ফিরিয়ে আনা হয়েছে, সেই বিমান ও বিমানের ক্রু-পাইলটদের অন্য দেশ গ্রহণ করছে না। পর্যবেক্ষণের জন্য নিজ বাড়িতে তাদের কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। কোনো বিমান সেখানে পাঠানো যাচ্ছে না। আবার চীনের কোনো বিমান ভাড়া করে আনার ক্ষেত্রেও চীনের অনুমতি মিলছে না। তাই তাদের ফিরিয়ে আনা যাচ্ছে না।
ঝুঁকি আছে তবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই : বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের ঝুঁকি থাকলেও আতঙ্কের কিছু নেই বলে জানিয়েছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। গতকাল আইইডিসিআর সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এখনো দেশে করোনাভাইরাস রোগী পাওয়া যায়নি। সুতরাং ভয় না পেয়ে সতর্ক থাকতে হবে যাতে দেশে এর সংক্রমণ না হয়।
গত রবিবার সিঙ্গাপুরে এক বাংলাদেশি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং সেখানে তার চিকিৎসা চলছে বলে জানিয়েছেন ডা. মীরজাদী। তিনি বলেন, সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশের হাইকমিশন আক্রান্ত বাংলাদেশির খোঁজখবর রাখছেন। ওই শ্রমিক সেখানে দেড় বছর ধরে কাজ করছেন। অন্য অসুস্থতার কারণে তিনি হাসপাতালে যাওয়ার পর পরীক্ষাতে তার শরীরে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়। যেহেতু বাইরের দেশে রোগীর গোপনীয়তা খুব কঠিনভাবে মেনে চলা হয়, তাই তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি।
বাংলাদেশি আক্রান্ত হওয়ার কারণে সিঙ্গাপুরের ফ্লাইট বন্ধ হবে কি নাÑ জানতে চাইলে পরিচালক বলেন, শুধু সিঙ্গাপুর নয়, যেসব দেশে লোকাল ট্রান্সমিশন রয়েছে তাদের সঙ্গেও আমাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে। সিঙ্গাপুরে প্রতিদিন আমাদের অনেক ফ্লাইট যায়। সেদিক থেকে আমাদের ঝুঁকি রয়েছে বলেই আমরা প্রস্তুতি নিয়েছি।
আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ জানুয়ারি থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত রাজধানীর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২৬ হাজার ৫২২ জন যাত্রীর স্ক্রিনিং করা হয়েছে। তবে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কাউকে পাওয়া যায়নি। আর আইইডিসিআরের হটলাইনে কল এসেছে ১২০টি। এর মধ্যে ৮৪টি কল করোনাভাইরাস সম্পর্কিত। এছাড়া নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ৫৫ জনের। তবে কারও মধ্যে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। তাই বলা যায়, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসের উপস্থিতি নেই।
আশকোনা হজক্যাম্প এবং সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে কোয়ারেন্টাইনে থাকা উহানফেরতদের বিষয়ে ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা জানান, তারা ১ ফেব্রুয়ারি এসেছেন। ১৪ দিনের ‘ইনকিউবিশন পিরিয়ড’ হিসেবে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কোয়ারেন্টাইনে রাখা হবে। ১৬ ফেব্রুয়ারি তারা বাড়ি ফিরবেন বলে প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এরপরও যদি তারা কোনো অসুবিধা বোধ করেন, তাহলে তারা আইইডিসিআরের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।
৯০ হাজারের বেশি স্ক্রিনিং : গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে স্বাস্থ্য সচেতনতা সংক্রান্ত এক বৈঠক হয়। বৈঠকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানান, এ বছর ২১ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত দেশের সব বন্দরে ৯০ হাজার ২৪৫ জন বিদেশফেরত যাত্রীর স্ক্রিনিং করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় স্ক্রিনিং করা হয়েছে ১২ হাজার ৬৩০ জনের। এর মধ্যে ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে ৬ হাজার ১৬২ জন, নৌবন্দরে ২৪০ জন এবং সমুদ্রবন্দরগুলোতে ৬ হাজার ২২৪ জন বিদেশফেরত যাত্রীর স্ক্রিনিং করা হয়েছে।
প্রাণী আমদানিতেও সতর্ক সরকার : করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছে, এমন দেশ থেকে প্রাণিসম্পদ আমদানি করলে সেগুলো কমপক্ষে ১৫ দিন কোয়ারেন্টাইনে রেখে পর্যবেক্ষণ করে তবেই ছাড়পত্র দেবে সরকার। গতকাল সচিবালয়ে এক কর্মশালায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মো. আশরাফ আলী খান খসরু এ তথ্য জানান। প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, বিদেশ থেকে ডিম আমদানির অনুমতি দেওয়া হবে না। দেশে চাহিদানুযায়ী ডিমের পর্যাপ্ত উৎপাদন রয়েছে। এই মুহূর্তে বিদেশ থেকে ডিম আমদানির কোনো প্রয়োজন নেই। বিদেশ থেকে ডিম আমদানি করলে দেশের পোলট্রি শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়বে।
রংপুরের চীনফেরত শিক্ষার্থী এখন ঢাকায় : করোনাভাইরাস সন্দেহে চীনফেরত এক শিক্ষার্থীকে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতাল থেকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে বলে আইইডিসিআর জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, রংপুরে দুজন করোনাভাইরাস সন্দেহে ছিলেন। এর মধ্যে একজনের শরীরে করোনাভাইরাস পাওয়া যায়নি। অন্যজনের শরীরেও করোনাভাইরাসের কোনো লক্ষণ নেই। তার কিডনিতে কিছু সমস্যা ছিল আগে থেকেই। রংপুর মেডিকেল কর্র্তৃপক্ষ অনুরোধ করায় তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তবে গতকাল রাত ১০টা পর্যন্ত তিনি ঢাকায় পৌঁছাননি। পৌঁছানোর পর তাকে কোন হাসপাতালে ভর্তি করা হবে তা ওই কর্মকর্তা জানাননি। তিনি বলেন, সরকার যে চারটি হাসপাতাল নির্ধারণ করেছে, সেটার একটায় তাকে রাখা হবে। তার নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। পরীক্ষা চলছে।