এপ্রিলে চেন্নাই জুনে টোকিও যাচ্ছে বিমান

ড্রিমলাইনারসহ অত্যাধুনিক উড়োজাহাজ বহরে যোগ হওয়ার পর রুট সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এ আকাশপরিবহন সংস্থাটি আগামী এপ্রিলেই ভারতের চেন্নাইয়ের উদ্দেশে ডানা মেলবে। তার দুই মাস পর জুনে যাবে জাপানের টোকিওর নারিতা বিমানবন্দরে। সব গন্তব্যেই সপ্তাহে কমপক্ষে তিনটি করে ফ্লাইট চালাবে বিমান।

বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. মোকাব্বির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিভিন্ন রুটে বিমানের লোকসানের অন্যতম কারণ হচ্ছে সপ্তাহে এক দিন ফ্লাইট চালানো। এক দিন ফ্লাইট নিয়ে গিয়ে পরের সপ্তাহে ফিরে আসতে হয়। এক সেট ক্রু পুরো সপ্তাহ হোটেলে বসে থাকেন। তাদের হোটেল ভাড়া, ওভারটাইম এগুলো দিয়ে লাভ করার কোনো কারণ নেই। এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার জন্য আমরা তিনটার নিচে কোনো ফ্লাইট চালু করব না। কারণ তিনটার নিচে কোনো ফ্লাইট থাকলে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হয় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘শিগগিরই আমরা জাপানে ফ্লাইট চালু করব। সেখানেও শুরুতেই সপ্তাহে তিনটি ফ্লাইট থাকবে। ঢাকা থেকে ব্যাংকক হয়ে আমরা নারিতা যাব। জাপানে বিমান চালানোর বিষয়ে দুই দেশের সরকারের মধ্যে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন সরকার বিমানকে অথরাইজ করবে ফ্লাইট চালানোর জন্য। আরও কিছু আনুষ্ঠানিকতা আছে। সেখানে স্টেশন খুলতে হবে। জিএসএ নিয়োগ শেষ করতে হবে। আশা করছি জুনের মধ্যে ফ্লাইট চালু করতে পারব। জাপানের আগেই আমরা ভারতের চেন্নাই যাব। আশা করি আগামী এপ্রিলেই চেন্নাই ফ্লাইট পরিচালনা করা যাবে। সিঙ্গাপুরে রাতে ফ্লাইট নেই। সেখানে রাতেও ফ্লাইটের সøটের জন্য লিখেছি।’

বিমানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে ভারতের রাজধানী দিল্লি ও কলকাতায় বিমান ফ্লাইট পরিচালনা করছে। কলকাতায় সপ্তাহে প্রতিদিন ফ্লাইট থাকলেও দিল্লিতে সপ্তাহে তিন দিন যাচ্ছে বিমান। শিগগিরই এ সংখ্যা বাড়বে। ভারতের তৃতীয় নগরী হিসেবে চেন্নাইতে ফ্লাইট পরিচালনা করবে বিমান। বর্তমানে ঢাকা-চেন্নাই রুটে ইউএস-বাংলা ও মালদেভিয়ানস এয়ারলাইনস ফ্লাইট পরিচালনা করছে। তামিলনাড়– রাজ্যের রাজধানী চেন্নাই স্বাস্থ্যসেবার জন্য খ্যাতি অর্জন করেছে। বাংলাদেশ থেকে প্রচুর রোগী নিয়মিত চেন্নাই যাচ্ছেন। ঢাকা-চেন্নাই রুটে সরাসরি চলাচলকারী ইউএস-বাংলা ও মালদেভিয়ানস এয়ারলাইনস একচেটিয়া যাত্রী পরিবহন করছে। এসব এয়ারলাইনসে টিকিট না পেয়ে অসংখ্য যাত্রী সড়ক বা ট্রেনে ভারতের কলকাতা গিয়ে সেখান থেকে আবার ট্রেনে চেন্নাই যাচ্ছেন। বিমান ঢাকা-চেন্নাই রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করলে ভাড়ার হারও কম হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

একসময় বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগ ছিল। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ বিমানের ঢাকা-টোকিও ফ্লাইট চালু হয়েছিল। ১৯৮১ সালে সাময়িক বিরতির পর তা আবার চালু হয়। তখন ঢাকা-নারিতা রুটে সেই ফ্লাইট চলত। ১৯৯২ সালে অবশ্য এ ফ্লাইট নাগোয়া পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয়েছিল। ২০০৬ সালে সরাসরি বিমান যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

বিমানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের এয়ারলাইনসগুলোর ঢাকা-টোকিওর মধ্যে সপ্তাহে মাত্র দুটি ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ ছিল। একই সঙ্গে ব্যাংকক হয়ে টোকিওতে ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে ঢাকা-ব্যাংকক রুটে বিমানের যাত্রী ধারণক্ষমতার ৩৫ শতাংশের বেশি যাত্রী পরিবহনের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা ছিল, যা বাংলাদেশি বিমান সংস্থা ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ঢাকা-ব্যাংকক-টোকিও রুটে ফ্লাইট পরিচালনায় বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছিল। সেই প্রতিবন্ধকতা দূর করতে দুই দেশের মধ্যে বিমান চলাচল চুক্তি সংশোধন করা হয়েছে। গত ২৯ জানুয়ারি জাপানের টোকিওতে বাংলাদেশ ও জাপানের অ্যারোনটিক্যাল অথরিটির মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় বিমান চলাচল চুক্তি হয়। এতে আগে জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যে সরাসরি কার্গো ফ্লাইট পরিচালনার কোনো সুযোগ না থাকলেও এখন বিমান সংস্থাগুলো দুই দেশের মধ্যে কার্গো ফ্লাইটও পরিচালনা করতে পারবে। ফলে বিমানের পাশাপাশি যেকোনো বাংলাদেশি এয়ারলাইনস জাপানে ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ নিতে পারবে। বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে এখন নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। এ চুক্তি বন্ধুপ্রতিম দুই দেশের মধ্যে শুধু যাত্রী, কার্গো পরিবহনকেই আরও সহজতর করবে না বরং পর্যটনসহ ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

জাপান ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে বাংলাদেশে জাপানি কোম্পানির সংখ্যা ছিল ৭০টি। এক দশক পর ২০১৮ সালে সংখ্যাটি ২৭৮-এ উন্নীত হয়েছে। জাপানের একটি ব্যবসায়ী সংস্থা মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্পপার্ক করার প্রস্তাব দিয়েছে। জাপান টোব্যাকো গত বছর বাংলাদেশের আকিজ গ্রুপের তামাক ব্যবসা কিনে নেয়। এতে জাপানের কোম্পানিটি বিনিয়োগ করছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, নতুন চুক্তির ফলে বাংলাদেশের যেকোনো এয়ারলাইনস জাপানের হানেদা ছাড়া যেকোনো বিমানবন্দরে যাত্রী ও কার্গো ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ পাবে। এখন বাংলাদেশি এয়ারলাইনসগুলো বাংলাদেশ থেকে চীন ছাড়া বিশ্বের যেকোনো বিমানবন্দরের যাত্রী নিয়ে জাপানে যেতে পারবে এবং একইভাবে জাপান থেকে যাত্রী বাংলাদেশে আনতেও পারবে।