একসময় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণকে ঘিরেই জমে উঠত অমর একুশে গ্রন্থমেলা। এখন বদলে গেছে দৃশ্যপট। মেলার মূল প্রাণ হয়ে উঠেছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অংশটি। প্রায় সব সৃজনশীল প্রকাশনার স্টলই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অংশে। তবে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্টলের পাশাপাশি রয়েছে কয়েকটি প্রকাশনী ও সাহিত্য পত্রিকার স্টল।
একাডেমির প্রবেশদ্বারের পাশেই চিত্তরঞ্জন সাহার ঐতিহ্যবাহী মুক্তধারা প্রকাশনীর স্টলটি। অপর পাশে শিশু একাডেমির স্টল। সেখানে মেয়ে ফাইজাকে নিয়ে বই কিনতে এসেছেন ব্যাংক কর্মকর্তা হারিসুল ইমাম। তিনি বলেন, ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্টলে গিয়েছি। শিশু চত্বর থেকেও বই কিনেছি। কিন্তু বাংলা একাডেমির দিকটায় না এলে যেন বইমেলায় আসার আনন্দটা পাওয়া যায় না।’
বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, নাট্য পত্রিকা ‘থিয়েটার’, পাক্ষিক পত্রিকা ‘অন্যদিন’, শিশু একাডেমি, মুক্তধারা, সাহিত্য পত্রিকা ‘কালি ও কলম’, জাতীয় জাদুঘর, বাংলা একাডেমি, বাংলানামা, আওয়ামী যুবলীগ, নজরুল ইনস্টিটিউট, এশিয়াটিক সোসাইটি, প্রেস ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন স্টল রয়েছে। এসব স্টলে নিজেদের প্রকাশনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে ধারণা দেওয়ার জন্য রয়েছে নানা পুস্তিকা। সৃজনশীল বই প্রকাশ করছে বাংলানামা। আগামী বছর মেলায় উদ্যানের অংশে স্টল পাওয়ার আশা করছে তারা।
অন্যদিকে ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে রামেন্দু মজুমদারের সম্পাদনায় প্রকাশ হচ্ছে ‘থিয়েটার’ পত্রিকাটি। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের নজরুল মঞ্চের ঠিক পেছনেই পত্রিকাটির স্টল। এ ছাড়া বাংলা একাডেমির পুকুরপাড়ে অগ্নিনির্বাপণযন্ত্র বিক্রির জন্য একটি স্টলকেও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বহেড়াতলার যে জায়গাটিতে বসত লিটলম্যাগকর্মীদের আড্ডা সেখানেও রয়েছে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্টল। প্রেস ইনস্টিটিউটের স্টলে গিয়ে দেখা যায় সাংবাদিকতা বিষয়ের বিভিন্ন বই সাজানো। এশিয়াটিক সোসাইটির স্টলে রয়েছে প্রতœতত্ত্ব বিষয়ের নানা বই ও পুস্তিকা।
বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ভাষাশহীদদের নিয়ে নির্মিত ভাস্কর্যটিও রয়েছে স্বমহিমায়। এ ছাড়া মেলার মূল মঞ্চটি এখনো একাডেমি প্রাঙ্গণেই রয়েছে। সেখানে প্রতিদিনই আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থাকলেও লোকজনের উপস্থিতি কম দেখা গেছে। একাডেমি প্রাঙ্গণে বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের জন্য একটি মঞ্চ থাকলেও সেটি ফাঁকাই থাকে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একাডেমি প্রাঙ্গণ যেন প্রাণহীন। বইপ্রেমীদের কেউ কেউ মনে করেন, পুরো মেলাটি যেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অংশে হলেই ভালো।
মূল মঞ্চ : গতকাল বিকেল ৪টায় বইমেলার মূল মঞ্চে হয় মোহাম্মদ আলী খান রচিত ‘ডাকটিকিট ও মুদ্রায় বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক আতাউর রহমান। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন সাবেক সচিব শ্যামসুন্দর সিকদার ও নজরুল ইনস্টিটিউটের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ইকরাম আহমেদ। গ্রন্থের লেখকের বক্তব্য প্রদান করেন মোহাম্মদ আলী খান।
আলোচনা পর্বের পর কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন কবি সোহরাব পাশা, রহিমা আখতার কল্পনা, শিহাব শাহরিয়ার ও অনিকেত শামীম। আবৃত্তি পরিবেশন করেন মাহফুজুর রহমান, অনন্যা লাবনী পুতুল ও শহিদুল ইসলাম নাজু। সংগীত পরিবেশন করেন ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, রথীন্দ্রনাথ রায়, শফি মণ্ডল, সালমা চৌধুরী, মো. রেজাউল করিম ও শুভ্রা দেবনাথ। সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় ছিল সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সমস্বর’। যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন গৌতম মজুমদার (তবলা), মো. হাসান আলী (বাঁশি), মো. দেলোয়ার হোসেন (দোতারা), আনোয়ার সাহদাত রবিন (কিবোর্ড)।
এ ছাড়া ‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন সুহিতা সুলতানা, তাপস রায়, মাহবুব ময়ূখ রিশাদ ও সাঈদ আজাদ।
নতুন বই : বাংলা একাডেমির জনসংযোগ উপবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মেলার দশম দিনে এসেছে ১৫২টি নতুন বই। এর মধ্যে পার্ল পাবলিকেশন্স এনেছে রামেল ইয়ামীনের কাব্যগ্রন্থ ‘এখানে কেউ নেই’, খেয়া প্রকাশনী এনেছে কর্নেল মো. রাব্বি আহসানের ‘কসমিক লাইফ’, শিশু গ্রন্থকুটির এনেছে ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থের ‘হ্যালো মি. গাবলু’, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স এনেছে শাহরিয়ারের ‘বেসিক আলী-১২’, সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ‘উপন্যাস ত্রয়ী’, বদিউর রহমানের ‘ড্রীম গার্লস’, অবসর এনেছে নাবিল মুহতাসিমের ‘জীয়নবিদ্যা’, মহি মুহাম্মদের ‘ভাড়াবউ’, সাত ভাই চম্পা প্রকাশনী এনেছে খালেক বিন জয়েন উদ্দীনের ‘বঙ্গবন্ধু ও শেখ রাসেল’ প্রভৃতি।
আজ বুধবার মেলার আয়োজন : আজ ১১তম দিনে মেলা চলবে বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৪টায় মূল মঞ্চে হবে অনুপম হায়াৎ রচিত ‘বঙ্গবন্ধু ও চলচ্চিত্র’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন সাজেদুল আউয়াল। নাসির উদ্দীন ইউসুফের সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেবেন মোরশেদুল ইসলাম ও মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক। সন্ধ্যায় রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ ও আবৃত্তিসহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।