সাংবাদিক নির্যাতন বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিন

পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিক নির্যাতনের এসব ঘটনা ঘটছে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাকের ডগায়। সাংবাদিকরা যে শুধু সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ঘটনাস্থলে প্রকাশ্যে এমন হামলার শিকার হচ্ছেন তা নয়; দেশের বিভিন্ন স্থানে পূর্বপরিকল্পিতভাবে সাংবাদিকদের ওপর চোরাগোপ্তা হামলা চালানোর বহু ঘটনা ঘটেছে। ঢাকাসহ সারা দেশে বিগত বছরগুলোতে এ ধরনের নানা হামলায় বহু সাংবাদিক নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন বিপুল সংখ্যক সাংবাদিক। আরও উদ্বেগজনক হলো সাংবাদিকদের ওপর হামলা-নির্যাতনের বেশিরভাগ ঘটনারই সুষ্ঠু বিচার হচ্ছে না।  সাংবাদিক নির্যাতন ও সাংবাদিক হত্যার যথাযথ বিচার না হওয়া স্পষ্টতই অপরাধীদের দায়মুক্তি দিচ্ছে। একে সাংবাদিকদের ওপর হয়রানি, নির্যাতন ও হামলার ঘটনা বাড়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সাংবাদিক নেতারা। 

সাংবাদিকদের ওপর যে কতটা বেপরোয়া ও বর্বর হামলা চালানো হচ্ছে তার সর্বশেষ বড় দৃষ্টান্ত মঙ্গলবার পুরান ঢাকার নয়াবাজারে বন্ড চোরাচালানের বিরুদ্ধে অভিযানের সংবাদ সংগ্রহ করার সময় সাংবাদিকদের ওপর হামলা।  বুধবার দেশ রূপান্তরে ‘বন্ড সন্ত্রাসীদের তাণ্ডব’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দুই সাংবাদিকের ওপর ভয়াবহ হামলা এবং ক্যামেরা ও সরাসরি সম্প্রচারের যন্ত্রপাতি ছিনতাই ও ভাঙচুরের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। হামলায় আহত বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল নিউজটোয়েন্টিফোরের প্রতিবেদক ফখরুল ইসলাম ও ক্যামেরাপারসন শেখ জালালকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে জানা যায়, কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কর্মকর্তারা সেখানে অভিযান চালাতে গেলে বন্ড চোরাকারবারিরা অভিযান পরিচালনাকারীদের কয়েক ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা তাদের মুক্ত করেন। দুপুরে ওই হামলার সময় বন্ড সন্ত্রাসীদের একটি সংঘবদ্ধ দল সাংবাদিকদের ক্যামেরা ও ব্যাকপ্যাক ছিনতাই করে নিয়ে যায়। ভাঙচুর করে তাদের বহনকারী গাড়িও। এ ঘটনায় সাংবাদিক ফখরুল ইসলাম বাদী হয়ে বংশাল থানায় মামলা করেছেন। মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে টেলিভিশন চ্যানেলটির গাড়িতে থাকা সরাসরি সম্প্রচারের ডিভাইস, মেমোরিকার্ড ও ক্যামেরাসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ছিনতাই ও ভাঙচুর করায় প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ২৭ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। মঙ্গলবারই ভিডিও ফুটেজ দেখে সাংবাদিকদের ওপর হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে অভিযানে নামে পুলিশ। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী বংশাল থানা পুলিশ এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ৪ জনকে আটক করেছে।

সাংবাদিকরা যে কতটা অনিরাপদ পরিবেশে কাজ করছেন তার একটা দৃষ্টান্ত বলা যেতে পারে পুরান ঢাকার নয়াবাজারে এ হামলার ঘটনাকে।  বন্ড চোরাচালানে জড়িত সন্ত্রাসীদের অভিযান চালাতে গিয়ে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কর্মকর্তাদের কয়েক ঘণ্টা আটকে রাখার ঘটনা একইসঙ্গে দুর্বৃত্তদের দৌরাত্ম্যেরও পরিচায়ক। নয়াবাজারে সাংবাদিকদের ওপর এই হামলার কদিন আগেই ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে বড় ধরনের হামলা ও মারধরের শিকার হন বেশ কয়েকজন সাংবাদিক। এসব হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন আর্টিকেল নাইনটিনসহ অন্যান্য সাংবাদিক সংগঠন।  এদিকে নির্বাচনকালে কেবল হামলারই শিকার হননি, উপরন্তু মিথ্যা মামলারও শিকার হন কয়েকজন সাংবাদিক। যৌথ বিবৃতি দিয়ে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও মিথ্যা মামলার প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে। এর আগে ২০১৮ সালের আগস্টে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলার সময় তিন দিনে অন্তত ৪০ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যম কর্মী আহত হন। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ১৯৯৬ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ২২ বছরে বাংলাদেশে ৩৫ জন সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এদিকে, বহুল আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার-মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডে ৮ বছরে ৭১ বার পেছানোর পরও জমা পড়েনি তদন্ত প্রতিবেদন। এই পরিস্থিতি নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। 

মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, সংবাদমাধ্যমসহ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে সাম্প্রতিক ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’। একদিকে, এমন আইন ও নানারকম ভয়ভীতি-হুমকির কারণে সাংবাদিকতার পরিসর সংকুচিত হয়ে উঠছে; আরেকদিকে, শারীরিকভাবে হামলা ও হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে সাংবাদিকদের। এসব হামলা-নির্যাতন সাংবাদিকতা পেশাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে এবং তথ্যপ্রকাশে বাধা দেওয়ার মধ্য দিয়ে তা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকেও খর্ব করছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সাংবাদিক নেতারা অভিযোগ করে আসছেন যে, সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনায় সরকারের ভূমিকা অনেকটাই নীরব।  কিন্তু গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন জরুরি।  এ অবস্থায় অবিলম্বে সাংবাদিকদের ওপর সংঘটিত সব হামলা-নির্যাতনের যথাযথ বিচার নিশ্চিত করতে কঠোর পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে।