আমির হোসেন। বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। আকামা ছাড়াই কাজ করেন সৌদি আরবে মদিনার একটি রেস্তোরাঁয়। বছরখানেক আগে শেষ হয়েছে তার আকামা বা কাজের অনুমতিপত্রের মেয়াদ। যে কোম্পানির মাধ্যমে তার নিয়োগ তারা জানিয়েছে, নিজের টাকা দিয়ে আকামা করলে করো, আর না হয় বাংলাদেশে চলে যাও। এ কথা শোনার পর আমিরের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। কী করবেন তা বুঝে উঠতে পারছেন না। কোনো উপায় না পেয়ে লুকিয়ে থেকে কাজ করতে হচ্ছে তাকে। আমিরের মতো মক্কায় কাজ করেন কুমিল্লার আবিদুর রহমান। তিনিও জানান, তার আকামার মেয়াদ শেষ। আকামা করতে ১২ হাজার রিয়াল (বাংলাদেশি ২ লাখ ৭৬ হাজার টাকা) ব্যয় হবে। যে কোম্পানির মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছি, তারা আকামা করতে কোনো সহায়তা করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। বেতনও তেমন না। পুলিশ অভিযান চালায়। এখন লুকিয়ে লুকিয়ে রাস্তায় কাপড় বিক্রি করছি। বাংলাদেশ দূতাবাস থেকেও খোঁজ নিচ্ছে না। আমরা যোগাযোগ করলে উল্টো তারা খারাপ ব্যবহার করে। শুধু আমির ও আবিদুর নন, তাদের মতো লাখো শ্রমিক
সৌদি আরবে আকামা-সংকটে পড়ে ভাগ্য নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছেন। গত কয়েক দিনে সৌদি আরবে সরেজমিনে এমন তথ্য পেয়েছেন এই প্রতিবেদক।
এ বিষয়ে সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসের এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, আকামা সমস্যা জটিল আকার ধারণ করেছে। ইতিমধ্যে হাজার হাজার শ্রমিক অবৈধ হয়ে পড়েছেন। তিনি জানান, যদি কোনো শ্রমিক স্পন্সরের বাইরে কাজ করেন বা পালিয়ে যান অথবা আকামা, বর্ডার ও শ্রম আইনের কোনো ধারা ভঙ্গ করেন তাহলে তাকে আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তাদের আটক করে সৌদি সরকারের অর্থায়নে ডিপোর্টেশন সেন্টারের মাধ্যমে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে পারে। সে ক্ষেত্রে তারা সেটাই করছে। বাংলাদেশ দূতাবাস এ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে। সৌদি আরবে সরকারি ব্যবস্থাপনায় অনেক বদল এসেছে। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় প্রবাসী শ্রমিকরা বেকায়দায় পড়েছেন। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আকামা ব্যয় নিয়োগকারী কোম্পানির দেওয়ার কথা। কিন্তু তারা তা করছে না। সব দায় চাপিয়ে দিচ্ছে শ্রমিকদের ওপর। আমরা চেষ্টা করছি সৌদি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টির সমাধান করতে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ থেকে ৭ লাখ ১ হাজার ১৫৯ জন শ্রমিক বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান। এর মধ্যে শুধু সৌদি আরবেই কাজ করতে গেছেন ৩ লাখ ৯৯ হাজার জন। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে বিভিন্ন দেশে ৬৯ হাজার ৯৮৮ জন শ্রমিক বিভিন্ন ভিসায় চাকরি করতে গেছেন। এর মধ্যে সৌদি আরবে গেছেন ৫১ হাজার ৭৮৬ জন। আবার এই সময়ে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরেছেন হাজারের বেশি শ্রমিক। বাংলাদেশের বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব। তবে বাংলাদেশিরাই বেশি আকামা জটিলতায় পড়েছেন। নিয়োগদাতা কোম্পানি থেকে তাদের আকামা করে দেওয়ার নিয়ম থাকলেও অধিকাংশ কোম্পানি সেটি করছে না। এতে বৈধভাবে যাওয়ার পরও আকামার মেয়াদ শেষে লুকিয়ে কাজ করতে হচ্ছে অনেককে। যারা পুলিশি অভিযানে ধরা পড়ছেন তাদের সৌদি সরকারের জাকাত ফান্ডের খরচে ১৫ দিনের মধ্যে বিমানের টিকিট দিয়ে দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের অনেকে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, সৌদি আরবের রিয়াদ, দাম্মাম, মক্কা ও মদিনাসহ আরও কয়েকটি স্থানে ১৫ থেকে ১৬ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করছেন। এর মধ্যে বেশির ভাগই খারাপ অবস্থায় রয়েছেন। অনেকে না খেয়েও দিন পার করছেন। নিয়োগদাতা কোম্পানির লোকজন বেশির ভাগ শ্রমিকের সঙ্গেই প্রতারণা করে আসছে। আর বাংলাদেশের দালালরা তো সক্রিয় আছেই। সৌদি আরবের বিভিন্ন কোম্পানির লোকজনের সঙ্গে তাদের সুসম্পর্ক গড়ে ওঠায় এসব হয়রানি বেশি হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বাংলাদেশের নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠানো শ্রমিকরা সৌদি আরবে নানা সমস্যায় পড়ছেন। এর মধ্যে বড় হলো আকামা-সংকট। আগে আকামার ফি ছিল মাত্র ১ হাজার রিয়াল। আর এখন হয়েছে ১২ হাজার রিয়াল। বছরান্তে সৌদি সরকার আকামার ফি বাড়াচ্ছে। যাদের আকামা নেই তারা দেশটিতে অবৈধভাবে অবস্থান করছে। এই হিসাবে বাংলাদেশি প্রায় লাখো শ্রমিকের আকামা নেই। আকামা করতে শ্রমিকরা নানা চেষ্টা চালিয়ে আসছেন। কিন্তু সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। আকামার পাশাপাশি আবাসন সমস্যাও প্রকট আকার ধারণ করেছে। কোম্পানিতে কাজ পাওয়া নিয়েও রয়েছে বৈষম্য। এসব সমস্যা সমাধানে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসে ভিড় করছেন অনেক শ্রমিক। সৌদি আরবের বাংলাদশি দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা টেলিফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমানে সৌদি আরবে বিদেশি শ্রমিকদের আকামাসহ নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে; বিশেষ করে বাংলাদেশি শ্রমিকরা বেশি বেকায়দায় পড়েছেন। এসব সমস্যা দূতাবাসের পক্ষে এককভাবে সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে না। আর অভিযোগের বিষয়টি ঢাকায় মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশি শ্রমিকদের এসব সমস্যার সমাধান সৌদি সরকারের সংশ্লিষ্ট শাখার হস্তক্ষেপ ছাড়া হবে না।
মক্কায় বাঙালিপাড়ায় (কবুতুর চত্বর হিসেবে পরিচিত) বাংলাদেশি শ্রমিকদের আনাগোনা সবচেয়ে বেশি। বেশির ভাগ শ্রমিকই কাজ করেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে। নোয়াখালীর রমজান, কক্সবাজারের সাব্বির, কুষ্টিয়ার বেলায়েত, রাজশাহীর আবদুর রহমান, কুমিল্লার আবদুর তুষারসহ অন্তত অর্ধশত প্রবাসী বাংলাদেশির সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়েছে। তারা জানান, সাত-আট লাখ টাকা খরচ করে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছেন তারা। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ পাননি তাদের অধিকাংশই। যারাই যাচ্ছেন আকামা করতে হচ্ছে। এ ছাড়া বেশি কাজের সুযোগ থাকা নির্মাণ খাতেও কাজের সুযোগ কমছে। যেগুলোতে সুযোগ আছে, সেখানে অন্য দেশ প্রধান্য পাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশি শ্রমিকরা বিপদে পড়ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিদিন ৫০-১০০ জন শ্রমিক আকামা-সংকটের সমাধানে সৌদি আরবে বাংলাদেশের দূতাবাসে ভিড় করছেন। তাদের অভিযোগ, ঢাকা থেকে রিক্রুটিং এজেন্সি ও তাদের দালালরা প্রতারণা করে এখানকার ফাইভ স্টার হোটেলের ছবি দেখিয়ে ৫-৬ লাখ টাকা নিয়ে সৌদি আরব পাঠিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু যাওয়ার পর তাদের অধিকাংশকেই দেওয়া হয়েছে পরিচ্ছন্নতার মতো কাজ। বেতন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ রিয়ালের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও দেওয়া হচ্ছে ৫০০ রিয়াল।
প্রবাসী শ্রমিকদের স্পন্সরশিপ বাতিলের পরিকল্পনা সৌদি সরকারের : সৌদি আরবে বিদেশি কর্মীদের বর্তমান কাফালাপদ্ধতি (স্পন্সরশিপ) বাতিলের পরিকল্পনা করছে দেশটির সরকার। গত বছরের আগস্টে কাতার এ পদ্ধতি বাতিল করার পর থেকে বিষয়টির প্রতি জোর দিচ্ছে সৌদি কর্র্তৃপক্ষ। গত শুক্রবার সৌদি সরকার নিয়ন্ত্রিত ইংরেজি দৈনিক সৌদি গেজেটের খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পদ্ধতি বাতিল হলে প্রবাসী কর্মীরা নিজের ইচ্ছানুযায়ী কফিল (নিয়োগকর্তা) পরিবর্তন ও দেশে আসা-যাওয়া করতে পারবেন। কর্মসংস্থান চুক্তিতে নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী চলাচলের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা পাবেন। এ ছাড়া এতে নিয়োগকর্তার নির্যাতন থেকে শ্রমিকদের মুক্তির পথ তৈরি হবে। পাশাপাশি আবাসিক ভিসাপ্রাপ্তি ও স্বজনদের ভিজিট ভিসায় সৌদি আরবে নিয়ে যাওয়ারও সুযোগ পাবেন তারা।
মধ্যপ্রাচ্যের আরেক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট মনিটরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ্রমিকদের মূলত নির্মাণ ও গৃহকর্মে নিযুক্ত করা হয়। কাজের সময় তাদের বড় ধরনের নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হয়। খবরে আরও বলা হয়েছে, মজুরি না পাওয়া, কম মজুরি প্রদানসহ শারীরিক নির্যাতনের মতো অভিযোগ নিয়মিত করছেন শ্রমিকরা। দুই বছর আগে কুয়েতে একটি ফ্রিজে ফিলিপাইনের এক শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। যদি কাফালাপদ্ধতি বাতিল হয় তাহলে সৌদি আরবের যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে এটি হবে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সংস্কার। যুবরাজের ভিশন ২০৩০ উদ্যোগে সৌদি অর্থনীতিতে তেলনির্ভরতা কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।